যশোর রোডের রাত্রি
আকাশ মামুন, শনিবার, এপ্রিল ২০, ২০১৩


যশোর নিউ মার্কেটের সামনে চাকা পাংচার হয়ে সাতক্ষীরা টু ঢাকাগামী একটি বাস এক ঘন্টা ধরে থেমে আছে। এইতো হচ্ছে- হলো বলে কাউন্টারের লোকজন যাত্রীদের এতক্ষণ শান্ত রেখেছে। এখন আর কোন ভাবেই যাত্রীদের শান্ত রাখা যাচ্ছে না। টিকিট মাস্টার ফোনে তাড়া দিতে দিতে হয়রাণ। গোয়ার প্রকৃতির একজন যাত্রী তেড়ে গিয়েছিল তার উপর। অনেক চেষ্টায় তাকে কোন রকম সংযত করা গেলেও রাগে হিসহিস করছে। যারা এদিক সেদিক হাঁটা-হাঁটি করে ঝাল চানাচুর, শসা খাচ্ছিল তারাও এতক্ষণে জড়ো হয়েছে। বিরোধীদল কাল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে। সবার মধ্যাই চাপা উৎকণ্ঠা কাজ করছে। সন্ধ্যার আগে ঢাকায় পৌঁছা যাবে তো? সন্ধ্যা থেকেই যে বাসে অগ্নিসংযোগ শুরু হবে। এখন হরতাল মানেই আগের দিন গাড়িতে অগ্নি সংযোগে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। পরের দিন হরতালে আর মাঠে থাকতে হয় না। পুলিশই হরতাল সফল করে দেয়। বৈশাখের চোখ ধাঁধাঁনো রোদ। খালি চোখে তাকানো যায় না। রোদ চশমাটা চোখে দিয়ে অরিন্দম জানালা দিয়ে এসবে দৃষ্টি রাখছিল। নিচে নামেনি। সাতক্ষীরা থেকে যশোর আসতেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। নামটা শুনে রক্ষণশীলরা ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করেন পুরো নাম? অরিন্দম খান শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ও পাশে সামনের দিকের সিটে দুজন কপোত-কপোতি বেশ জমিয়ে গল্প করে যাচ্ছে। বাইরে কী হচ্ছে তাতে তাদের খুব বেশি কিছু যায় আসে না। মার্কেটের সামনের খেজুর গাছটায় ধুলা জমে বিবর্ণ হয়ে আছে। চারপাশের কোলাহল আর ধূলার প্রাচুর্যে সে যে ত্যাক্ত-বিরক্ত তা তার আড়ষ্ট দাঁড়ানোর ভাঙ্গিতেই বোঝা যায়। খেজুর গাছটা মনে মনে প্রর্থনা করছে, সামনে বর্ষায় তার উপর ধূলিত্যাচারের উপযুক্ত জবাব দিবে। আয়েশ করে বসা ধূলিকে ঝেমটা দিয়ে ঝেড়ে ফেলে নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসবে তখন। অরিন্দমের পাশে বসেছে এক চৈত্র কণ্যা। চেহারায় চৈত্রের রোদের মতই ঝাঁঝালো একটা ভাব আছে। বার কয়েক রোদ চশমার আড়াল করা চোখে তাকিয়েও ছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ নয়। চোখ জ্বালা করা রূপের তিরতির জ্বলুনিটা শেষ আব্দি না বুকে প্রবাহিত হয়। চোখকে নিবারণ করলেও মন অবাধ্য। চৈত্রকণ্যা নেমে গেল বাস থেকে। কিছুক্ষণ পর আবার চলে এলো। সিটে বসতেই বললো এখানে ওয়াশ রুম নেই নাকি? এবার সুযোগ পেয়ে মুখ খুলল আরিন্দম। হ্যাঁ আছে তো, চলুন আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। আমি তখনই ভেবেছিলাম আপনি ওয়াশ রুম খোঁজচ্ছেন। কিন্তু আপনি যে দিকটায় গিয়েছিলেন ওদিকে তো ওয়াশ রুম নয়। নামতে নামতে বলল অরিন্দম। নামটাও জানা হয়ে গেছে ততক্ষণে। রাত্রি। নামটা মিলাতে পারছে না অরিন্দম। রূপের যে দ্যুতি তাতে নাম হওয়া উচিত ছিল বিজলি, শিখা নয়তো শম্পা। ঝটিকা হলেও খারাপ হতো না। তা না, নাম রেখেছে রাত্রি। কে রেখেছে নামটা আপনার? আমার খালামনি। কেন আপনার পছন্দ হয়নি? না না ঠিক আছে, অনেক সুন্দর নাম। আপনার নামটা তো জানা হল না? আমি অরিন্দম। ও অনেক সুন্দর নাম। অরিন্দম মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিল পুরো নাম এবার বলতে হবে। অরিন্দমটা যে কি, প্রথমেই খান বলে দিলেই লেঠা চুকে যায়। কিন্তু সে বলেনা। দ্বিতীয় বার কথা বাড়ানোর জন্যই বোধ হয় ইচ্ছে করেই করে। কিন্তু না পুরো নাম জিজ্ঞেসই করলো না। বরং অরিন্দমকে অবাক করে দিয়ে বলল নামটায় একটা সাহিত্যিক সাহিত্যিক ভাব আছে। অবাক হওয়ার মতই বটে। আগে কেউ কোন দিন এ কথা বলেনি। আর সাহিত্যের স ও বোঝে না অরিন্দম। অবসরে টুকটাক হুমায়ুন পড়ে বটে। কি বলছেন, সাহিত্য-টাহিত্যর ধারে কাছের মানুষও তো নই আমি। ও সব আমার দ্বারা হয় না। তাহলে কিন্তু এরকম একটা সাহিত্যিক নাম জবরদখল করে বসে থাকা আপনার একদমই ঠিক হয়নি। বলেই চোখ বাঁকিয়ে হেঁসে কুটিকুটি হচ্ছিল রাত্রি। কি বলবে বুঝে উঠতে না পেরে অপ্রস্তুত একটা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে রোদ চসমাটা চোখ থেকে খুলল।পরক্ষণেই আবার চোখে লাগাল। ভেবাচেকা খেতে দেখে রাত্রির রিনরিন হাসি আরও বেড়ে গেল। হাসির দমক ঠেলতে ঠেলতে বলে উঠলেন দেখলেন তো কেমন জব্দ করে দিলাম? আরিন্দম বলল না সাহিত্যিকের সাথে নামের কি সম্পর্ক? সাহিত্যিক হতে নাম লাগে না কিন্তু সাহিত্যিক নাম দখল করে সাহিত্যের অনুরাগী না হওয়া অন্যায়। এখন একা দাঁড়িয়ে আছে অরিন্দম। ঠোঁটের কোনায় এক চিলতে হাসি খেলা করে গেল আপনা-আপনিই। যাক যাত্রা তবে শুভ হবে। নাক-মুখ কুচকে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে রাত্রি বেরিয়ে এসে বলল, আপনাকে দাঁড় করিয়ে রাখলাম। ওকে চলেন এবার বাসে যাই। অস্থির রোদ। চশমাটা চোখে উঠাতে-উঠাতে অরিন্দম বলল হু একদম গলাটা শুকিয়ে গেছে। আইসক্রিম খাবেন? হু চলতে পারে। অবশেষে ঘন্টা দেড়েক পরে বাস ঠিক করতে না পেরে নতুন একটা বাসে সবাইকে তুলে দেয়া হলো। দুপুর আড়াইটা নাগাদ বাস চলতে শুরু করলো। কথা বলতে পারে রাত্রি। বাসে উঠলেই যে অরিন্দম হা করে ঘুমিয়ে পড়ে সেই অরিন্দম আজ সারা দিনে এক বারও চোখের পাতা এক করল না। রাত্রি একবার ঘুমিয়ে নিয়েছে। তখনও অরিন্দম জেগেছিল। অরিন্দমের মনে হচ্ছিল গাছ-গাছালি আর ঘর-বাড়িকে পেছনে ফেলে রাত্রিকে নিয়ে চলে যাচ্ছে অজানায়। ঘুমের মাঝে একবার হেলে অরিন্দমের কাঁধে মাথা রেখেছিল রাত্রি। বার কয়েক কুনুইয়ে, হাতে-পায়ে ছোঁয়া লেগেছে। চকিত চোখে বিদ্যুৎ পিষ্ঠ অবশ শরীরে দেখেছে রাত্রির নির্লিপ্ততা। যেন কিছুই হয়নি আথচ ওটুকু ছোঁয়াতেই আরিন্দম জলের তলায় ডুবতে শুরু করেছে। সুযোগ বুঝে ফোন নম্বরটাও নিয়ে নিয়েছে অরিন্দম। ঢাকায় ফিরে ফোন করতে বলেছে। ফেরিতে উঠতেই সন্ধ্যা নেমে এল। আকাশে চাঁদ উঠেছে। রূপালী জোৎসনায় পদ্মার বালু আর জলে লুটোপুটি খাচ্ছে। ছোট ছোট ঢেউয়ে জোৎসনা পড়ে খলখলিয়ে হেঁসে উঠছে পদ্মার জল। সারাদিনের গরমে সিদ্ধ হওয়া শরীরে জোৎসনার আবির আর শীতল বাতাস লেগে শরীর মন দুটোই চনমনে হয়ে উঠল। রাত্রি ফেরির রেলিং এ দাঁড়িয়ে পরপর দুটি রবীন্দ্র সংগীত শুনালো। অরিন্দম গানের আগা-গোড়া কিছু না বুঝলেও হাততালি দিয়ে কন্ঠের প্রশংসায় উচ্চকিত হয়ে উঠল। অরিন্দমের মাথায়ই ঢুকে না কেন মানুষ কন্ঠকে চেপে জোর জবরদস্তি করে এই ধরণের বেরসিক গান গায়। অরিন্দমের তো মিলাকে হেব্বি পছন্দ। রাত্রি জিজ্ঞেস করল, আপনি বই পড়েন? অরিন্দমের তো বই পড়তে গেলেই ঘুম পায়। হুমায়ুনের আসলাম, বসলাম, চা খেলাম….. টাইপের কয়েকটা বই শেষ করেছিল অনেক চেষ্টায়। কিন্তু সেসব কি আর রাত্রিকে বলা যাবে? তাই বলল হ্যাঁ পড়িতো। শেষের কবিতা পড়েছেন? হ্যাঁ কয়েক বারই পড়েছি। কবিতাটা অনেক সুন্দর। চোখ বিষ্ফারিত করে রাত্রি বলল, আমি রবি ঠাকুরে শেষের কবিতা উপন্যাসের কথা বলছি। অরিন্দম বুঝতে পারল বেশি চাপা দিতে গিয়ে ধরা খেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দমলে চলবে কেন, তাই বলল, হ্যাঁ ওই উপন্যাসটাই। কেন যে কবিতা নাম দিতে গেল আর নাম পেল না বুড়ো লোকটা। ও তাই বলুন। আচ্ছা আপনার অমিতকে কেমন লাগে? হু ভালতো বেশ ভাল ছেলে আমার কাজিন। আমি শেষের কবিতা আমিতের কথা বলছি। ওওও আচ্ছা আচ্ছা,ভাল খুব ভাল, ভাল ছেলেই তো। রাত্রি অন্যমনস্ক হয়ে বলল কেমন অস্থির চরিত্রের তাই না। ছেলে মানুষ তো এক আধটু অস্থির না হলে কি আর ছেলে হলো। হু আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, আপনিও ছেলে। অমিতের পক্ষেই তো বলবেন। চলেন এবার বাসে যাওয়া যাক, ফেরি ভিড়ল। ঢাকায় পৌঁছতে রাত সাড়ে আটটা বেজে গেল। রাস্তায় গাড়ি কমে এসেছে। এদিক সেদিক মিছিলের শ্লোগান শুনা যাচ্ছে। ফকিরের পুল, যাত্রাবাড়িতে হরতাল সমর্থকেরা পাঁচটা গাড়িতে নাকি আগুন দিয়েছে। এই মাত্র এফএম রেড়িওতে খবর শুনে কে একজন বলে উঠল। রাত্রির ফোন বন্ধ হয়ে গেছে। গাবতলী নেমে দোকান থেকে ফোন করতে যাচ্ছিল। অরিন্দম বলল তার ফোনেই ফোন করতে। রাত্রির চোখে মুখে উৎকণ্ঠা দেখে অরিন্দম বলল, ভয় নেই? আমি নামিয়ে বাসায় যাব। এর মধ্যেই পেছন থেকে একজন বলে উঠল মা তোমার ফোনে সেই বিকেল থেকে ট্রাই করছি। আমরা বাসায় কত্ত চিন্তায় আছি। তোমার ফোন বন্ধ কেন? রাত্রি হেঁসে বলল আমার ছেলে চলে এসেছে। সাবধানে যাবেন। ছেলের দিকে ফিরে বলল চার্জ নেই মাহি। সেই ফেরির আগ থেকে বন্ধ হয়ে আছে। একটা রিক্সা ধরে রাত্রি চলে গেল। তার ফিরে যাওয়া পথের দিকে বিষ্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল অরিন্দম। পিছন থেকে সাঁ করে একটা সিএনজি এসে জিজ্ঞেস করল কোথায় যাবেন? চমকে পিছন ফিরে দাঁত খিচিয়ে অরিন্দম বলল, জাহান্নামে, জাবা? সিএনজি চালক মাথা নেড়ে না বলে যে ভাবে এসেছিল সে ভাবেই চলে গেল। পিছনে তাকিয়ে দেখে লাঠি-সোটা হাতে একদল জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বাল, হরতাল-হরতাল বলে শ্লোগান দিতে দিতে আসছে। সামনে থেকে একদল হরতাল মানি না বলে এগিয়ে আসছে। আরিন্দম চিৎকার করে বলে উঠল এই সিএনজি দাঁড়াও জাহান্নামে নয় মহাখালী যাব, নিয়ে যাও। ততক্ষণে সিএনজি গলির ভিতর ঢুকে পড়েছে। সাইরেন বাজাতে বাজাতে পুলিশ আসছে। ব্যাগ গুছিয়ে আরিন্দমও পাশের গলিতে ঢুকে পড়ল। দৌড়াতে দৌড়াতে গুলির শব্দ কানে আসতে লাগল।