ঋতু বদলে মন বদল
- মেহেরুন নেছা রুমা -, শুক্রবার, এপ্রিল ১২, ২০১৩


বর্ষার পর শরৎ গেল কিছুটা সেরকমই-মধুচন্দ্রিমার মত । হেমন্তে এসে দিপার মনটা প্রায়ই উদাস হয়ে আসে দিগন্তের ওপাড়ে শেষ বিকেলের কুয়াশার মত। সময় যেন তার আর কাটে না। শীতে এসে দিপার মনেও কুয়াশার ঘনত্ব বেড়ে যাচ্ছিল রাতারতি। এর পরই বসন্ত এসে দিপাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল বসন্তের বাতাসে, আমার কাছ থেকে অনেক দূরে। ঋতুচক্রের আবর্তনে ফিরে এল আর একটি ফাল্গুন। আকাশ ভরা পূর্নিমার চাঁদ। বারান্দার লোহার গেটটি খুলে ফুলের বাগানে একা আমি পায়চারী করি,আকাশ থেকে উপচে পড়া নীল জোছনা আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ছে তবু আমি জোছনায় সিক্ত হতে পারছিনা।

শেষ বিকেলের ভ্যাপসা গরমে কেমন অস্থির হয়ে উঠেছিল দিপিকা। গণগনে আগুনের পাশে বসে রান্নাটাও সারতে হল। এই পাহাড়ি এলাকায় সন্ধ্যার পরেই বিদ্যুৎ চলে যায়। ফিরে আসে রাত দশটা নাগাদ। আর যদি বৃষ্টি হয় তো বিদ্যুৎ মশাই আগে ভাগেই ছুটি নেন । তাই বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে ভেবে দিপিকা রান্নাঘরের কাজটা শেষ করে নিল।

পাহাড়ের ওপারে সূর্য দেবতা যখন ঢলে পড়বে পড়বে ভাব , কোত্থেকে এক দানবীয় কালো মেঘ এসে সূর্য দেবতাকে আড়াল করে ফেলে। যেন আকাশের বুকেও বিচরণ করছে এক মস্ত পাহাড়। মেঘের পাহাড় ।

এখানে আসার পর প্রথম প্রথম দিপিকা সূর্যাস্তের সময়টা সকল কাজ তুলে রেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড়ের কোলে ঢলে পড়া সূর্যের অস্ত যাওয়া দেখত। সে সময়ে শুভও অফিস থেকে যেন একটু আগে ভাগেই চলে আসতো। নির্জন বাংলো,সন্ধ্যেবেলা ফিরে না এলে নতুন বৌ টি ভয়ে চুপসে যাবে ,ছোট্ট বালিকাটির মত ভয়ার্ত মুখখানি শুভর বুকের সাথে লেপ্টে রেখে নিরাপদে নিশ্বাস নিবে । সেটা শুভ অনুভব করত বলে দিপিকার নিজেকে কেমন সুখী সুখী মনে হত ।

চাকরীর পরেই বিয়ে ,বিয়ের পরেই নতুন বদলি এই পাহাড়ি এলাকায়। দু’জনেই খুশি হয়েছিল। আলাদা করে আর মধুচন্দ্রিমায় যাবার দরকার হয়নি। কারন জায়গাটা ওদের ভীষন ভাল লেগে গেল। বিকেলের চায়ের কাপ দু’টো তখন বারান্দাতেই দু’জনের হাতে শোভা পেত।

রান্নাটা শেষ হতে না হতেই ওপাশের ঘরের জানালার কপাটগুলি বাড়ি খেতে লাগল। দিপিকা দৌঁড়ে গিয়ে দরজা জানালা বন্ধ করে দিতেই এক কালো ঘন অন্ধকারে ছেঁয়ে গেল পুরো বাংলো। আর তখনি ঝুমঝুম বৃষ্টি। দূরের পাহাড়গুলো দানবের মত এক একটা গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । পাহাড়ের গা বেয়ে বৃষ্টির ধারা নিচের দিকে বয়ে যাচ্ছে। শব্দটা দারুন উপভোগ করে দিপিকা । অভ্যস্ত হাতে চার্জ লাইট জ্বেলে পশ্চিম পাশের ঘরে এলো। ঘড়িতে সময়টা দেখে নিল। শুভর এতক্ষণে চলে আসার কথা। কিন্তু আসছে না কেন ?

এমন নির্জন পরিবেশে বিদ্যুৎ না থাকলে দিপিকার কেমন ভয় ভয় লাগে। গা ছমছম করে। চার্জ লাইট জ্বেলে বসার ঘরে চুপটি করে বসে থাকে। বাকী ঘরগুলো অন্ধকারে ঢেকে থাকে। দিপিকা ঘরের মধ্যে চলাফেরাও বন্ধ করে দেয় তখন। এখানের সব কিছুই ওর ভাল লাগে । শুধু এই বিদ্যুৎ এর লুকোচুরিটা কোথায় যেন নিয়ে যায় । শুভ থাকলে আবার এই অন্ধকারটাকেও উপভোগ করে। লোডশেডিং এর আশির্বাদে ওরা তখন জ্যোৎøায় øান করে,বাগানে হাসনাহেনার সৌরভ গায়ে মেখে সুবাসিত হয় ।

বাংলোর পূর্ব পাশের বড় কৃষ্ণচুড়া গাছটি ফুলে ফুলে রক্তিম হয়ে আছে । বৃষ্টি হলেই কামিনির গন্ধটা তীব্র হয়ে ঘরে চলে আসে। মাঝে মাঝে দিপিকার ভয় হয় । পাহাড়ে নাকি বড় বড় সাপ থাকে। পিছনের ঝোপ থেকে যদি কোন সাপ আসে ! তার উপর ফুলের সুবাস ! শুভ কে একদিন বলতেই শুভ বলে ,সাপ থাকলেও এই বাংলোর মধ্যে আসবে না । এখানে কেউ কোনদিন সাপ দেখছে তো শুনিনি।

বৃষ্টির সাথে শো শো শব্দ। এখানের বৃষ্টির রকমটাই যেন অন্যরকম। যখন পড়বে তো পড়ার মত পড়বে। অকৃপন ধারায় বর্ষন এসে মাটিকে খুচিয়ে খুচিয়ে সিক্ত করে দিবে আর মাটি তা চুইয়ে চুইয়ে গ্রহন করবে । যেন আকাশ আর মাটির ভালোবাসার আদান প্রদান। গাছের পাতা ফুল লতাপাতা সবকিছুকে একেবারে মাতোয়ারা করে দিয়ে তবেই ছাড়বে । বর্ষা যেন উম্মত্ত প্রেমিক।

ঝুমঝুম কলরবে সারা বাংলোয় ঝংকার তুলে দিল। বৃষ্টির সুর ছন্দ মনের মধ্যে কেমন এক শিহরণ তুলে দিপিকার। তখন কোন কিছুতে মন বসে না।ু বারান্দায় বসে এক দৃষ্টিতে বৃষ্টির অবিরাম ঝরে যাওয়া দেখে,বৃষ্টির গান শুনে,কখনো কখনো দ’ুহাত বাড়িয়ে দিয়ে বৃষ্টির আদর নেয়। এখানে বসলে শুভর আগমন টের পাওয়া যায় । শুভ সাথে থাকলে দু’জনে সামনের বাগানটাতে নেমে পড়ে। ইচ্ছে মত ভিজে ,কামিনির ভেজা গন্ধ মনটাকে তখন আরো চনমনে করে তোলে।

বেল বাজতেই ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিল দিপিকা। প্রায় ভিজে গেছে শুভ।

-এ কি ! তুমি এমন ভিজলে যে ?

-রাস্তায় কাঁদার মধ্যে গাড়ির চাকা দেবে গিয়েছিল। ড্রাইভার অনেক চেষ্টা করেও তুলতে পারছিল না। এটুকু রাস্তা তাই হেঁটে আসতে হল।

-তুমি ভিজতে গেলে কেন ? ড্রাইভারকে পাঠাতে ছাতা দিয়ে দিতাম। না হয় আমাকেই ফোন করতে এগিয়ে যেতাম ছাতা নিয়ে ।

-তুমি ? সন্ধ্যার পর গাছের পাতা ঝরার শব্দ শুনে যে ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে, সে যাবে এই জঙ্গলের রাস্তা ধরে আমাকে এগিয়ে আনতে ? আর আমি কি তা যেতে দিতাম বলো ?

-হুম,ভয় পাই বলে মজা পাও তাই না ?

-তা তো একটু পাই ই। ওই ভয়টা ই তো তোমাকে আমার আরো কাছে নিয়ে আসে ।

-কেন ,এছাড়া কি আমি কাছে আসি না ?

-তা আসো ,তবে সেটার অনুভূতি অন্যরকম । সে তুমি বুঝবে নাগো , বলেই দিপার হাতটি ধরে টান মেরে কাছে নিয়ে এল শুভ ।

কথা বলতে বলতে দিপিকা শুভ কে শুকনো কাপড়, তোয়ালে এগিয়ে দিল। চুলায় চা বসালো। চা খেতে খেতে দিপিকা বলল ,তুমি আজ এত দেরী করলে ,বৃষ্টি শুরু হল ,অমনি বিদ্যুৎ চলে গেল।

-খুব ভয় পাচ্ছিলে তাই না ?

তা তো একটু ..। নির্জন জায়গা। সন্ধ্যার পর মনে হয় একটা ভুতের আস্তানায় আমি একা। আর কিসব ভাবনা আসে মনে। মনে হয় বাড়িটার পাশে কেউ যেন হাঁটছে । ফিসফিস কথা বলছে ।

ওটা তোমার মনের ভ্রম । এসবে মন দিও না। হ্যা ,তবে সাবধানে থেকো । দরজা ভাল করে বন্ধ করে ভিতরের ঘরে থাকবে । আমি না আসা পর্যন্ত দরজা খুলেবে না কিছুতেই ।

-হুম। তারপরেও তুমি এমন দেরি করো না প্লিজ।

আমিতো ঐ গাড়ির জন্য আসতে পারছিলাম না। শুভ বলল,চলো বারান্দায় গিয়ে বৃষ্টি দেখি। আজ সত্যি গরমে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। একটু বৃষ্টি যে কী আশা করেছিলাম জানো ?

-হু,আমিও। আর মনে মনে তোমাকেও আশা করেছিলাম ।

-আর কি আশা করেছিলে বলো না ?

-না তো । আর কিছু আশা করিনি।

-বললেই হল ? বৃষ্টি আশা করেছিলে বৃষ্টি হল। তখন আমাকে আশা করলে ,তার সাথে নিশ্চয় আমার আদর পেতে আশা করেছিলে ? তারপর..

বলেছে তোমাকে । তোমার মত আমি যখন তখন ওসব আশা করি না ।

-আচছা যখন তখন নাই বা করলে ,এখন একটু করো না আমার নতুন বৌ। এখনতো আমিও আছি বৃষ্টিও আছে। বলেই দিপিকার হাত ধরে বারান্দার দিকে যেতে যেতে বলল , চলো এখন বৃষ্টি দেখি ।

দ’ুজনে গিয়ে বসল বেতের চেয়ার দুটোয়। বাইরের গাছগুলো বৃষ্টির ফোটায় ফোটায় নেচে নেচে উঠছে। অন্ধকারের মধ্যে বৃষ্টিগুলোকে রূপালী ঝকমকে আলোর কনা বলে মনে হচেছ । শুভ বলে,এই দিপা ভিজবে নাকি ? একটু জোরেই বলতে হল। কারন বৃষ্টির শব্দে ওদের গলার স্বরটা স্বভাবতই বেড়ে গিয়েছিল। নইলে যে অন্য জনের কথা শুনতে পাওয়া যায় না।

দিপিকা বলল, ভিজতে তো মন চায় । এই রাতে ভিজবো যদি জ্বর আসে ?

-জ্বর ? না আসবে না। আর আসলে তুমি তোমার উষ্ণতা আমাকে দিয়ে দিও ।

-জ্বর তো তোমারও আসতে পারে । তখন ?

-তখন তুমি আমারটা নিও । এসব পরে ভাবা যাবে । এখন এসো তো নেমে পড়ি ।

লোহার গেট খুলে ঘরের সামনের খোলা জায়গাটাতে দ’ুজনে নেমে পড়ল। কোথাও কোন শব্দ নেই,জনমানব নেই। শুধু ওরা দুজন,আর বৃষ্টি ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাতাল করে দিচ্ছে। অন্ধকার একটু পাতলা হয়ে এসেছে যেন। হয়তো বা ওরা অন্ধকারটাকে জয় করে ফেলেছে । তাই দ’ুজনই দু’জনকে বেশ দেখতে পাচ্ছে ।

ভেজা চুল ভেজা শাড়িতে দিপিকাকে দেখে শুভর মনে যেন নেশা ধরেছে । ফর্সা ঠান্ডা শরীর দুটো চুম্বকের মত আকর্ষিত হচ্ছে ধীরে ধীরে।

দিপিকা বলল,এই তুমি আমার হাত ছাড়বে না । তাহলে আমি অন্ধকারে ভয় পাবো ।

-কি যে বলে আমার বৌ । আমিকি এই রাতে বৃষ্টিতে নেমেছি তোমার হাত ছাড়ার জন্য ? তোমাকে তো আরো হাতের মধ্যে পাবার জন্য । বলেই এক টানে দিপিকাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। ।

বৃষ্টি আরো দ্বিগুন ধারায় ঝরে পড়তে থাকলো । সেই বর্ষনে দুজন সত্যি সিক্ত মাতাল হয়ে উঠল। সময় কখন পেরিয়ে গেল কেউ টের পেল না। যখন বুঝতে পারল তখন মনে হচ্ছে বৃষ্টি আরো আগেই থেমে গেছে। সুখের পরশটা রয়ে গেল আরো কিছুক্ষণ।

সেই বর্ষায় দিপার সাথে আমার প্রতিটি দিনই ভালোবাসা দিবস,আর প্রতি রাতই মধুচন্দ্রিমার রাত । বসে বসে ভাবছে শুভ।

বিয়েটা ঠিক করেছিলেন অভিভাবক,তারপর ঠিক হয়ে থাকা সম্পর্কটাকে আরো ঠিকঠাক ভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আমরা ছয় মাস সময় চেয়ে নিয়েছিলাম অভিভাবকদের কাছ থেকে। দু’জন দু’জনকে চিনব বলে। অত:পর ফাল্গুনের কোন এক ভরা পূর্নিমার রাতে ধুমধাম করে আমাদের বিয়ে হল।

অফিসে কাজের চাপ একটু বেড়ে গিয়েছিল আমার ;ঠিক ততটা নয়,যতটা দিপার মনটা বদলাতে শুরু করছিল। একই জেলায় আমার দু’বছর আগে পোষ্টিং নিয়ে এসেছিল দিপার কাজিন হিল্লোল। চাকরীর সুত্রে একই এলাকায় পোষ্টিং হওয়াতে তার সাথে যোগাযোগটা ছিল প্রথম থেকেই। আমার অবর্তমানে দিপার একাকীত্ব দূর করতে শরতের বিকেল,হেমন্তের দুপুর গুলোতে হিল্লোল দিপার সাথে ল্যান্ডফোনে বা কখনো কখনো সশরীরে এসে সঙ্গ দিত। নতুন চাকরীর সুবাদে আমার ছুটির দিনগুলো ছাড়া খুব একটা সময় ছিলনা নতুন বৌকে দেয়ার জন্য। হিল্লোলই দিপাকে এই পাহাড়ি সুন্দর ছবির মত জায়গাটা ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছে। প্রায় দিনই দিপা আমাকে বলত ,কোন্ পাহাড়ের উপর থেকে কলকল করে গড়িয়ে পড়ে অবারিত ঝরনাধারা। ক্নো পাহাড়ে দাঁড়িয়ে মেঘ স্পর্শ করা যায় । কোন্ বনের গহীনে পাখির কিচিরমিচির শব্দ মনে ঝংকার তুলে। হিল্লোল আরো কত কি অজানা অদেখা দৃশ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে দিপাকে। সেই পরিচয় হতে হতে আমার পরিচিত দিপা ,আমার বৃষ্টি ভেজার সঙ্গী,আমার বুকের সাথে ভয়ে গুটিয়ে থাকা নব পল্লবে প্রস্ফুটিত হওয়া পুষ্প,আমার নতুন বৌ ; ফাল্গুনের হিমেল বাতাসে আমি এখন একা বসে জানালার ফাঁকে আকাশের বুকে লেপ্টে থাকা চাঁদের আলোতে দিপার মুখ খুঁজে বেড়াই। একই পাহাড়ি আঁকা বাকা পথের শেষে অন্য কোন এক নির্জন বাংলোতে দিপা এখন পাতা ঝরার শব্দ শুনে অন্য কারো বুকে মাথা রেখে নিশ্বাসে প্রশ্বাস মেখে জড়িয়ে আছে । আর আমার মনের বাংলোয় এখন কেবলি নিসঙ্গতার শব্দচয়ন রচনা করে বেড়ায় এক অনবদ্য কাব্যগাঁথা।