মেঘলা
তাহমিনা জিনিয়া এলি, শুক্রবার, মার্চ ০৮, ২০১৩


হসপিটালের করিডোরে একাকী দাঁড়িয়ে আছে নীলা। মাহফুজ অনেকক্ষণ হল বাইরে গেছে অপারেশনের জন্য আরও কিছু টাকা দরকার, তা আনতে গেছে সাথে রাতের খাবারও নিয়ে আসবে। এত বড় একটা হসপিটাল, অথচ এই রাত নয়টাতেই কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে আছে। নীলার কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সে কোনোভাবেই কাঁদতে পারছেনা। সে কখনোই কাঁদতে পারে না। তার ভেতরটা ফেটে পড়ে দুঃখে, কিন্তু তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পরে না। তার হঠাৎ মনে হল কে যেন তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে পেছন ফিরে দেখল তার বয়সী একটি মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। সে ফিরতেই মিষ্টি করে হেসে বলল “আমি মোহনা, আপনাদের পাশের রুমেই আমার বোনের বাচ্চাকে এডমিট করিয়েছি। প্রায়ই আপনাকে দেখি তাই ভাবলাম একটু কথা বলি” মোহনার কথায় অল্প হাসল নীলা, তারপর বলল “আমি নীলা” মোহনা চেয়ার দেখিয়ে বলল “চলুন ওদিকটাই বসে কথা বলি” দুজন দুটো চেয়ারে পাশাপাশি বসলো। মোহনা জানতে চাইলো “আপনার সাথে কেউ নেই ?”
- আছে! আমার স্বামী। একটু বাইরে গেছে, কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে।
- আপনাকে অনেক ক্লান্ত দেখাচ্ছে। খেয়েছেন ?
- না খাইনি। পরে খাবো। আমার স্বামী খাবার নিয়ে আসবে।
- ওহ! আচ্ছা।
নীলা কথা খুব কম বলে, কিন্তু আজ তার খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে মনের সব বেদনা উপড়ে ফেলতে। মোহনা যেন তার মনের কথা বুঝে ফেলল, সে মুখে অল্প হাসির রেখা টেনে বলল “আমি প্রায় খেয়াল করি আপনি একা একা মন খারাপ করে এখানেই দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবেন। কিছু মনে না করলে আমায় বলতে পারেন। কি হয়েছে ? “নীলা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল “অনেক কিছুই তো হল, অনেক কিছুই চেপে আছি। কোথা থেকেই বা শুরু করবো, জানিনা কোথায় গিয়ে শেষ হবে” মোহনা নীলার কাঁধে আলতো করে হাত রাখল। তারপর বলল “ভরসা রাখতে পারেন। একটি নারী অন্য একটি নারীর মনের কথা আগেই বুঝতে পারে। আপন ভেবেই বলে ফেলুন। অন্তত হালকা হয়ে যাবে মন” নীলা শূন্য দৃষ্টি মেলে মোহনার দিকে তাকাল। তার মনে হল আসলেই মোহনা তার খুব কাছের। অনেক আপন! তবে শুনুন-
দুই
আমার মেয়েটা যেদিন আমাদের ঘর আলো করে আসলো, সেদিন ছিল পহেলা শ্রাবণ। মেঘলা দিন ছিল। আমি যখন তাকে প্রথম কোলে নিলাম। মনে হল পৃথিবীর স্বর্গসুখ পেয়ে গেলাম। মাহফুজ মানে আমার স্বামী আমায় বলল “কি নাম রাখবে এই ছোট্ট পরীটার ? “আমি না ভেবেই বললাম “মেঘলা” মাহফুজের অনেক পছন্দ হল নামটি। যদিও মেঘা বলেই ডাকে। মেঘলার আগমনে আমাদের জীবনটা বদলে গেল। রাতভর মাহফুজ জেগে থাকতো, যদি মেঘলা জেগে যায়, যদি ভয় পায়, অনেক সময় সে আমাকে ঘুমাতে দিয়ে নিজেই মেঘলাকে ঘুম পাড়াত। মাঝে মাঝে রাগ হতো তার উপর, কিন্তু মেয়ের প্রতি তার ভালবাসা দেখে খুশিও হতাম। ধীরে ধীরে আমাদের ছোট্ট মেঘলা বড় হতে শুরু করল। মেঘলা প্রথম তার বাবাকেই ডেকেছে “বাবান” এটা শুনে মাহফুজ পুরোদিন বার বার তাকে কোলে নিয়ে পুরোঘরময় ঘুরেছে, আর বলেছে “মা আমার। সোনামণি। আরেকবার বল! আরেকটিবার বাবা বল” সেদিন আর মেঘলা বলেনি। কিন্তু পরে সে তার বাবাকে বাবান-ই ডাকতো। আর আমাকে ডাকতো “মাম্মাই”। কিন্তু মেঘলা তার বাবাকেই বেশি পছন্দ করত। তার বাবাও মেয়েপাগল। তাকে যদি সৃষ্টিকর্তা কখনো বলে “তুমি কাকে চাও, তোমার কন্যা নাকি তোমার স্ত্রী ?” আমি জানি সে নির্দ্বিধাই তার কন্যাকেই চাইবে। এর মানে এই না যে, সে আমায় ভালবাসে না। সে জানে আমি চাইব সে তার কন্যাকেই বেছে নিক। তাই সে ওটাই চাইবে। আমি খুব চাপা স্বভাবের একটি মেয়ে। কখনোই নিজের মনের কথা বলতে পারি না। আদতে বলতে চাই না। আমি চাই আমার অনুভূতিগুলো বুঝে নিক। এই জিনিসটা আমি মাহফুজের সাথেই বেশি করি। আমার মেয়েটির সেবার অনেক জ্বর হল। তখন তার বয়স ছিল তিন বছর। মাহফুজ পুরোরাত মেঘলার মাথার পাশে বসে ছিল। আমিও ছিলাম। আমার একবার মনে হল মাহফুজ কাঁদছে। জানিনা! হয়তবা কাঁদছিল না। অন্ধকারের মাঝে ভুল দেখেছি। পরে যতদিন মেঘলা সুস্থ হয়ে ওঠেনি ততদিন সে ঘরে ছিল। অফিসে যায়নি, ব্যবসা বাণিজ্য সবকিছু থেকে কিছুদিন দূরেই ছিল। আমি জানি অনেকেই তার এই বাড়াবাড়ি রকমের ভালবাসাকে আদিখ্যেতা মনে হবে। যদি কেউ একটিবার তাদের কাছ থেকে দেখে তবেই বুঝবে। আসলেই তা অপরিসীম ভালবাসা। মেঘলার সব আবদার মাহফুজের কাছে গ্রহণযোগ্য। মেঘলা যখন যা চাইতো, তা এনে দিতো মাহফুজ। আমি কপট রাগ দেখিয়ে বলতাম “অভ্যাস খারাপ করে ফেলো তোমার মেয়ের। দিন দিন তার জেদ বাড়ছে। তুমি অতি আদরে তাকে খারাপ করে ফেলছ” পারতপক্ষে আমার অনেক ভালোই লাগতো। মেঘলা আমার কাছে খুব কমই ঘেঁষত। আমি তাকে খুবএকটা আদর দেখাতাম না। সে যখন রাতে ঘুমাতে যেতো। আমার আদরের সময়টা আমি তখনি বরাদ্ধ রেখেছিলাম। ওর ঘুমন্ত চেহারায় আমার সব আদর ছড়িয়ে দিতাম। আমি হয়তো তাকে কখনো বোঝাতে পারবোনা। সে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। অনেক দুঃস্বপ্নের রাতে ঘুম ভেঙে গেছে। আমার দুঃস্বপ্নগুলোও তাকে ঘিরেই আসতো। ঘুম ভাঙাতেই আমি পুরোরাত তাকে আগলে ধরে জেগে থাকতাম। জানিনা কেন। মনে হতো কেউ যেন ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমার কাছ থেকে আমার মেঘলাকে।
তিন
আমার মনে আছে, মেঘলা যেদিন প্রথম স্কুলে গেল সেদিনের কথা। মাত্র ৫ বছরের ফুটফুটে মেয়েটা আমার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে, গলায় ফ্লাক্স ঝুলিয়ে ক্লাসরুমে গেল। জানালার বাইরে আমি আর মাহফুজ দাঁড়িয়ে ছিলাম, যতক্ষণ না টিচার আসেন। টিচার আসতেই আমি মাহফুজকে টেনে নিয়ে আসলাম। দূর থেকে আমরা দুজনই শুনছিলাম মেঘলা কাঁদছে তার বাবার নাম ধরে “বাবান.....বাবান..........” আমি শক্ত করে মাহফুজের হাত ধরে ছিলাম। গাড়িতে আমি চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে ছিলাম মন খারাপ করে। হঠাৎ মাহফুজ গাড়ি থামিয়ে ফেলল। ঝাঁকুনিতে আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম, দেখি সে বাচ্চাদের মত কাঁদছে। আমি ভাবলাম হয়ত মেঘলার কান্না তার খারাপ লাগার কারণ। তবুও তার কাছে জানতে চাইলাম “কি হয়েছে ? তুমি এভাবে কাঁদছ কেন ?” সে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল “একটা কথা মনে পড়ে গেল, তাই অযথায় কান্না চলে আসলো”
- কি এমন কথা মনে পড়ে গেল তোমার ?
- নীলা, আমাদের মেয়েটা বড় হচ্ছে।
- বড় তো হবেই। আজীবন তো ছোট থেকে যাবে না । কিন্তু তাতে কি ?
- না মানে। আমাদের মেয়েটাকে তো একদিন বিয়ে দিতে হবে, সেদিনও এভাবেই কাঁদবে।
কথা শেষ করে মাহফুজ করুণ চোখে আমার দিকে তাকাল। আমার তার কথায় খুব হাসি পেয়েছিলো। কিন্তু তার চোখে আমি এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করেছি, তাই আমার খুব মায়া হল তার জন্য। এরপর আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম “মেয়েদের পিতা-মাতার ঘরটা আসল ঘর না। তাদের একদিন নিজের ঘরে যেতেই হয়”। মেঘলার স্কুলজীবন একসময় খুব প্রিয় হয়ে গেল। প্রতিদিন মাহফুজ বাড়ি ফিরলে আগে তার মেঘলার স্কুলের কাহিনী শুনতে হতো। মাঝে মাঝে দুজনকেই আমি খুব বকতাম। কিন্তু তারা নাছোড়বান্দা। তাদের সেই রুটিনের পরিবর্তন হত না। একদিন মেঘলা এসে মাহফুজকে জিজ্ঞেস করলো “বাবান অ ফমশণ হমল মানে কি ?” আমি চা নিয়ে তখন স্টাডিরুমে ঢুকছিলাম, তার কথা শুনে থমকে দাঁড়ালাম। মাহফুজ অবাক হয়ে বলল “এর মানে আমি তোমায় ভালবাসি”। আমি মাহফুজের হাতে চায়ের পেয়ালা দিয়ে দেখলাম, মেঘলা কি যেন ভাবছে। আমি দরজার বাইরে এসে দাঁড়ালাম, কারণ আমি জানি আমি থাকলে মেঘলা কিছু বলবেনা। আমি আসতেই মেঘলা বলল “বাবান ভালবাসা কি ? “মাহফুজ হেসে বলল” এই যে আমি না চাইতেই তোমার মাম্মাই চা দিয়ে গেলো! তার নাম ভালবাসা “মেঘলা গাল ফুলিয়ে বলল” তাহলে মাম্মাই কি আমাকে ভালবাসে না!” মাহফুজ তাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল “কে বলল মাম্মাই তোমায় ভালবাসে না ! তোমার এমন মনে হল কেন মা ? “সে বলল” মাম্মাই আমাকে চা খেতে দেয় না। চাইলেও দেয় না! তার মানে মাম্মাই আমাকে ভালবাসে না” মাহফুজ তার ভালবাসার যুক্তি শুনে উচ্চস্বরে অনেকক্ষণ হেসেছিল সেদিন। আমিও নীরবে হেসেছি। সেদিন তাকে অনেক জিজ্ঞেস করেও জানাগেল না অ ফমশণ হমল কথাটা তাকে কে বলেছে। পরে জানলাম তার ক্লাসের এক ছেলেবন্ধু তাকে বলেছে। কিন্তু আমার সেদিন অনেক মন খারাপ হয়েছিল। মেঘলা আমায় তার আপন কেউ মনে করে না। আমাকে সে তার বন্ধু মনে করে না! সে ভাবে আমি তাকে ভালবাসিনা। আমাদের মধ্যে বিশাল একটা দেয়াল তৈরি হয়ে গেছে। আমি আজ অব্দি সে দেয়াল টপকাতে পারিনি। আমি আজো অনেক দূরের তার কাছে। একটি মায়ের কাছে এর থেকে বড় কষ্টের আর কি হতে পারে ?
চার
কথা শেষ করে নীলা তাকাল মোহনার দিকে, মোহনা তার দিকে তাকিয়ে আছে । সে বাইরের দিকে তাকাল। মোহনা তার কাঁধে হাত রেখে বলর “আপা মন খারাপ করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে। বাচ্চা মেয়ে, তাই বুঝতে পারছেনা। একদিন ঠিকই বুঝবে” নীলা মিষ্টি করে হাসল। তারপর বলল “আমিও তাই চাই” ঠিক সে সময় মাহফুজ এসে উপস্থিত হল। নীলা উঠে দাঁড়িয়ে মোহনাকে বলল “এই আমার স্বামী মাহফুজুর রহমান” মাহফুজ মোহনার দিকে তাকিয়ে হাসল। মোহনাও উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি মোহনা, আপনাদের পাশের রুমেই দু’দিন ধরে আমার ভাগ্নেকে নিয়ে আছি মাহফুজ একটু সৌজন্য দেখিয়ে মোহনাকে বলল ‘খেয়েছেন’?
- না এখনো খাওয়া হইনি। একটু পর খাবো।
- আসুন না। আমাদের সাথে খাবেন। নীলার চাইনিজ ফুড অনেক প্রিয়। ওটাই এনেছি।
- না। না। আমি খাবো না। আপনারা খেয়ে নিন।
মাহফুজ একটু হাসল। তারপর নীলার দিকে তাকিয়ে বলল ‘চল। ভেতরে যাই’। নীলা মোহনাকে বিদায় জানিয়ে রুমে ঢুকে গেল। বিছানায় বসে নীলা বলল ‘আজ আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। চল কিছুক্ষণ গল্প করি’ মাহফুজ নীলার হাত আলতো স্পর্শ করে বলল ‘না খেলে তো হবে না। তোমায় খেতে হবে। তাছাড়া রাতে তোমার একটা ওষুধ খাওয়ার আছে। তুমি না খেলে ওষুধ খাওয়া হবে না’।
- ওষুধ খেলে কি মানুষ অনেক দিন বাঁচতে পারে?
- হয়তবা পারে।
- কিন্তু আমি খাব না। তুমি জানো কেন?
- না! জানি না।
- কারণ আমি বাঁচতে চাই না।
মাহফুজ একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল, তারপর বলল ‘নীলা! অনেক তো হল, আর কত?’ নীলা উচ্চস্বরে হেসে উঠল। মাহফুজ আবার বলল ‘তুমি শুধু নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ না। আমাকেও কষ্ট দিচ্ছ। এটুকু কি তুমি বুঝতে পারছ না?’ নীলা মাথা নিচু করে বলল ‘আমি সবই বুঝতে পারি। আমি সব জানি। তুমি ইচ্ছে করে আমাকে কষ্ট দিয়েছ। তাই আজ আমি তোমায় কষ্ট দেব’। মাহফুজ আর কিছু বলল না। নীরবে সে বের হয়ে গেল রুম থেকে। তার কাছে সব কেমন অসহনীয় মনে হতে থাকলো। জীবনটা কি এমনটাই হওয়ার ছিল? একটি দুঃস্বপ্ন! আর সব বদলে গেল।
পাঁচ
গভীর রাত। মাহফুজ একা করিডোরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে। একবার বিরক্তি নিয়ে দেয়ালে লাগানো ‘ do not smoke ’ এর সাইনটা দেখল। তারপর আবার বাইরের দিকে তাকিয়ে সিগারেট টানতে লাগলো। হঠাৎ এক নারীকণ্ঠ বলল ‘কাজটা কি ঠিক হচ্ছে মাহফুজ সাহেব?’ মাহফুজ সিগারেটটা বাইরে ফেলে দিয়ে পেছন ফিরে দেখল মোহনা দাঁড়িয়ে আছে। সে বিব্রত স্বরে বলল ‘ঘুম আসছিল না! তাই একটু . . .’ মোহনা মৃদু হাসল, তারপর বলর ‘আমারও সেই। তো আপনার স্ত্রী কি ঘুম’?
- হ্যাঁ ঘুমুচ্ছে।
- আপনি ঘুমুবেন না?
- এই তো একটু পরেই যাবো আমি।
মোহনা চলে যেতে যেতে থেমে গেল, তারপর বলল ‘একটা কথা বলতে চাই, যদি কিছু মনে না করেন।’ মাহফুজ নম্রভাবে বলল ‘শিউর। শিউর! বলুন’ মোহনা ইতস্তত করে বলল ‘আমি জানি আমার বলার কোন অধিকার নেই, তবুও বলছি। আপনার স্ত্রীর মনে অনেক চাপা কষ্ট।
আপনি একটু চেষ্টা করুন তা মুছতে। আপনাদের মেয়েটিকে সে অনেক ভালবাসে, কিন্তু তা বোঝাতে পারে না। তার আপনার সাহায্যের খুব দরকার’ মাহফুজ মোহনার দিকে তাকিয়ে কোন ভনিতা ছাড়ায় বলল ‘তাহলে সে আপনাকে বলেছে সবকিছু’। মোহনা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। মাহফুজের ঠোঁটে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে মোহনাকে বলল ‘কি বলেছে সে আপনাকে’?
- আপনাদের সুখী পরিবারের কথা, আপনার মেয়ের কথা, তার প্রতি আপনার ভালোবাসা . . . এইত এসব।
- এর বাইরে আর কিছু বলেছে?
- আর কিছু বলতে?
- হুম! বুঝতে পেরেছি। আপনি আংশিক সত্যটাই জানেন।
- আমি বুঝতে পারছি না আপনি কি বলতে চাইছেন।
মাহফুজ আরেকটি সিগারেট জ্বালাল, তারপর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল ‘আমাদের বিয়ে হয়েছিল প্রেম করে। ভালোবাসার কমতি ছিল না। আমার অর্থবিত্তের অভাব নেই। কিন্তু কমতি ছিল একটি শিশুর, যার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আমায় দেন নি। আমাদের মধ্যে ঠিকই মমতা ভরে দিয়েছেন। শেষে আমরা মেঘলাকে দত্তক নিই মাহফুজ দেখল মোহনা তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
সে তাকে উপেক্ষা করে আবার বলল ‘হুম। মেঘলা আমাদের সন্তান না। তবুও মেঘলার প্রতি আমাদের ভালোবাসা অঢেল। তবে আমার চেয়ে আমার স্ত্রী তাকে ভীষণ ভালোবাসে। কিন্তু ছয় মাস আগে মেঘলা মারা গেছে রোড এক্সিডেন্টে মোহনার যেন কথাটা নিজের কানে বিশ্বাস হল না। মাহফুজ কথাটা বলে চলে যাচ্ছিলো, হঠাৎ থেমে পেছন ফিরে বলল
‘আমার স্ত্রী মানসিকভাবে অসুস্থ এবং শারীরিকভাবেও। কাল সকালে তার ব্রেন টিউমারের অপারেশন হবে। দোয়া করবেন’।
মাহফুজ সিগারেটের শেষ অংশটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে রুমে ঢুকে গেল।