আকাশচারী
ফরিদ মাহমুদ, শুক্রবার, মার্চ ০৮, ২০১৩


ন’তলা এই অ্যাপার্টমেন্টটিতে ফ্ল্যাটের সংখ্যা ষাট। মোট আটান্নটি পরিবারের বসবাস। দুটি করে ফ্ল্যাট একত্রে করেছে দুটি পরিবার। এই অ্যাপার্টমেন্টে এক মাসে সাতজন মারা গেছে। তিনজন স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে। তারা বার্ধক্যজনিত কারণে নানা রোগে ভুগছিল। বাকি চারজনের মৃত্যু নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন, সংশয়, সন্দেহ। দোতলায় একটা কাজের বুয়া আত্মহত্যা করেছে। পাঁচতলায় মধ্যবয়স্ক এক লোক ঘুমের মধ্যে মারা গেছে। ছয়তলায় একটা যুবক ভাইরাস আক্রমণে, তিনতলায় কলেজ পড়ুয়া একটা সুস্থ তরুণী মারা গেছে। এখনও দুজনকে নিয়ে যমে টানাটানি করছে।

দোতলায় ‘এফ’ টাইপ ফ্ল্যাটে কাজের যে মেয়েটি আত্মহত্যা করলো তার নাম রোকসানা। স্বামী পরিত্যক্তা এই মেয়েটির গ্রামের বাড়ী বরিশাল। ঢাকায় তার এক ভাই থাকে। সে ট্রাক চালায়। মেয়েটির এক ছেলে এক মেয়ে গ্রামে নিকটাত্মীয়ের কাছে থাকে। বলতে গেলে এই শহরে সে একা, নিঃসঙ্গ। ভাইয়ের সাথে তার বনিবনা নেই, যোগাযোগও নেই। ফ্ল্যাটটির মালিক সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা। অফিসের কাজে প্রায়শ তিনি চট্টগ্রামে থাকে। তার স্ত্রী পুত্র-কন্যাকে নিয়ে বাসায় একা থাকেন। মাঝে মাঝে তার সাথে কাজের মেয়েটার কথা কাটাকাটি হতো। ভদ্রমহিলা ফ্ল্যাটের দু’একটি পরিবার ছাড়া অন্য কারো সাথে মিশতো না। যাদের সাথে কথা হতো তাদেরকে তিনি বলতো, কাজের মেয়েটা অপ্রকৃতিস্থ। কাজের মেয়েটা যখন কাপড় শুকাতে ছাদে যেতো তখন অন্য ফ্ল্যাটের কাজের মেয়েগুলোর সাথে দেখা হলেই তাদের কাছে সে নানা অভিযোগ তুলে ধরতো। আমাকে বাসায় আটকে রাখে। বাইরে চলে গেলে আমাকে ভেতরে রেখে তালা মেরে দেয়। আসে দুই তিন দিন পর। আমাকে বাড়িতে যেতে দেয় না। আপার মেজাজটা তিরিক্ষি। সারাক্ষণ বক বক করে। মাথাটা একদম খারাপ হয়ে গেছে।

তাদের এ ফ্ল্যাটটি বিল্ডিংয়ের পেছনের দিকে একটি মস্তবড় নালার সাথে লাগানো। সেখানে আছে শত বছরের পুরানো তেঁতুল ও তুলা গাছ। গাছ দুটির শাখায় শাখায় সব সময় ছেড়া কাপড়, পলিথিন, ছালা, অসংখ্য আবর্জনা ঝুলে থাকে। গাছ দুটিতে বসে রাতভর কাক ডাকে। গাছের কিছু কিছু ময়লা মাঝে মাঝে তাদের ব্যালকনিতে এসে পড়ে। রোকসানা আত্মহত্যা করেছিল মধ্যরাতে। ভোরে ভোরে যখন ঘটনাটা জানাজানি হলো তখন বাইরের লোকদের মধ্যে প্রথম লাশটি দেখেছিল অ্যাপার্টমেন্ট এসোসিয়েশনের ম্যানেজার রফিক। গলায় ওড়না পেছানো লাশটি ঝুলেছিলো জানালার গ্রিলের মাঝখানে। লাশটির নিথর দেহের পা দুটি ছিল ফ্লোরের সাথে প্রায় লাগানো। জিবটা ভালো করে বের হয়নি। গলায় একটা কালচে দাগ। সে বুঝতে পারলো না এটা কি হত্যা, নাকি আত্মহত্যা?

সকাল বেলা নিকটস্থ থানার পুলিশ এসে লাশটি নামিয়ে মর্গে পাঠালো। পত্রিকার রিপোর্টার এলো, টিভি ক্যামেরাম্যান এলো। এলো ডিফেন্সের আন্তঃ তদন্তকারী দল। ঘটনার দু’দিন পর রোকসানার ভাইয়ের সাথে পরিবারটির মিটমাট হয়ে গেল। ক’দিন পর বাসাটা ভাড়া দিয়ে তারা অন্যত্র চলে গেলো।

পাঁচতলায় ‘ডি’ টাইপ ফ্ল্যাটে থাকতো ব্যাংকার নাসিরুদ্দিন। তার বয়স আনুমানিক সাঁইত্রিশ। তার ফ্যামিলি থাকে রাজশাহী। তার সাথে একজন কেয়ারটেকার থাকতো। সম্পূর্ণ সুস্থ একটা মানুষ। রাতে ঘুমিয়েছিল। আর জেগে উঠলো না। সকাল সাড়ে দশটায় ক্লিনিকে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করলো। লাশ অ্যাপার্টমেন্টে আনা হলো না। দাফনের জন্য গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হলো। কি কারণে তার মৃত্যু হল, কেউ জানতে পারলো না।

ছয়তলার ‘এ’ টাইপ ফ্ল্যাটে বসবাস করতো ছোট একটি পরিবার। ভাই-বোন দুজন আর বৃদ্ধ মা। পরিবারের আরও একজন সদস্য আছে। সে কানাডায় থাকে। তানভীরের বয়স বত্রিশ। তার জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিলো। একমাত্র সক্ষম এ যুবকটি দুহাতে সামলাতো পরিবারের সবদিক। কাঁচাবাজার করতে গিয়ে বাজার থেকে তার শরীরে প্রবেশ করেছিল মরণঘাতি এক ভাইরাস। ভাইরাসটি তার নাক দিয়ে ঢুকেছিলো। এই ভাইরাসটি সব মানুষকে আক্রমণ করে না। কয়েক লক্ষ মানুষের মধ্যে থেকে একজনকে আক্রমণ করে। তার সারা শরীরের রক্ত

জমাট বেঁধে গেল। তার শরীর অসাড়, নির্জিব হয়ে গেল। লাইফ সাপোর্ট দিয়ে পনেরো দিন পর্যন্ত মৃত্যু ঠেকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষাটা হলো না। তানভীরের মৃত্যুর পর তার মা, বোন কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মতো হয়ে গেল। তার ছোট ভাই কানাডা থেকে একবার এসেছিল। পাশ্চাত্যের উন্নত পরিবেশে বসবাস করে যে অভ্যস্ত, সে কি দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চায়? পরিবারটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলো।

তিনতলার ‘বি’ টাইপ ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে আলমগীর কবির। তার দুটি মেয়ে। বড় মেয়ে রিমি আইডিয়াল কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। ছোট মেয়ে পড়ে ক্লাস সেভেনে। বড় মেয়েটা ছিল শান্ত প্রকৃতির। সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে প্রথমে নিয়ে গিয়েছিল ল্যাব এইড হাসপাতালে। সেখান থেকে মাদ্রাজ। তার একটা কিডনি ফেল। ফুসফুসে পানি জমে গিয়েছিল। অপারেশন করার পর মেয়েটা মারা গেল। আলমগীর সাহেব মাদ্রাজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে চিকিৎসকের অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর অভিযোগ করেছিলো। বিদেশ-বিভূঁই। কে, কার কথা শোনে।

কলাবাগান সেন্ট্রাল রোডের এ অ্যাপার্টমেন্টে দীপ দু’দফায় দু’টি ফ্ল্যাট কিনেছিল। চারবছর আগে প্রথমটি কিনেছিলো। পরেরটা কিনলো দু’বছর হলো। দুটি ফ্ল্যাট কেনার কারণ, ফ্ল্যাট দুটি পাশাপাশি। ভেঙে ফেললে দু’টি ফ্ল্যাট এক করা যাবে। ফ্ল্যাটের সামনের দিকটা দক্ষিণমুখী। আছে চার চারটা ব্যালকনি। দক্ষিণা বারান্দায় বসে বসে তারা দক্ষিণা হাওয়া খাবে। ছোটকাল থেকে সে খোলামেলা বাসা পছন্দ করে। খোপ খোপ কামরায় থাকতে তার দম বন্ধ হয়ে যায়। মাপা মাপা ড্রইং রুম, ডাইনিং রুম, কিচেন রুম, বেড রুম, বাথরুম তার একদম অসহ্য লাগে। দীপের মনে স্বপ্নের একটি বাড়ি আঁকা আছে। একটি বিশাল ড্রইং রুম, একটি খোলামেলা লিভিং রুম, একটি বিশাল ডাইনিং রুম, একটি স্টাডি রুম, একটা নামাজের রুম, একটা মিউজিক রুম, একটি লাইব্রেরী, একটি ড্রেসিং রুম, এটাচ বাথ দুটি বড় বেডরুম, দুটি মাঝারি বেডরুম, একটি বড় কিচেন। দুটি ফ্ল্যাট এক হলে শতভাগ ‘স্বপ্নের বাড়ী’ হয়তো পাওয়া যাবে না। তবে আশি ভাগ আশা পূর্ণ হবে।কলাবাগান এরিয়াটিতে বসবাসের বাড়তি কিছু সুবিধা আছে। এখান থেকে স্কুল কলেজ খুব কাছে। ওয়াকিং ডিসটেন্সে মার্কেট, কাঁচা বাজার। খুব কাছেই কয়েকটি উন্নতমানের হাসপাতাল। পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা বেশ ভালো। বৃষ্টি হলে পানি জমে থাকে না। যাতায়াত সুবিধাটাও বেশ ভালো।

দীপ একজন আধুনিক মন-মানসিকতার শিক্ষিত মানুষ। বিজ্ঞানের এযুগে চাক্ষুস সাক্ষী, তথ্য-উপাত্ত, যুক্তি ছাড়া আজগুবি কোন বিষয় মানুষ বিশ্বাস করে না।ঠিক রাত যখন সাড়ে বারোটা বাজবে তখন ফ্লোরে কয়েকটা শব্দ হয়। মনে হয় দশ পনেরো ফুট উপর থেকে কেউ লাফিয়ে পড়ছে। তারপর শুরু হয় ফার্নিচার টানার শব্দ। ফ্লোরে অনেকগুলো পায়ের শব্দ। কারা যেন পায়চারি করে। দীপ অ্যাপার্টমেন্টের কমন স্পেসে গভীর রাতে ঘুরে ঘুরে দেখেছে। নাহ:, কেউ নেই। পরে যে ফ্ল্যাটটি সে কিনেছিলো সেটা দুই বছর তালা মারা ছিল। দীর্ঘদিন বাসা খালি থাকলে খারাপ কিছু এসে আশ্রয় নেয়। মাঝে মাঝে খালি ফ্ল্যাটটিতে দুম দুম শব্দ হয়। এ অবস্থা চলতে থাকে রাত দু’টা পর্যন্ত। দুটি ফ্ল্যাট এক করতে যখন ভাঙাগড়ার কাজ শুরু হল তখন উৎপাতটা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। পুনঃ সংস্কারের কাজ করতে গিয়ে দুটি ফ্ল্যাটের ডাইনিং রুমে, ব্যালকনি পার্টিশন ভেঙে খালি ফ্ল্যাটটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হলো। একটা বড় ড্রইং রুম বানাতে ভাঙতে হলো কিচেন, সারভেন্ট বেড ও একটি বাথরুম। ভাঙার পর বিশ বাই ত্রিশ ফুট সাইজের প্রকান্ড রুমটি রাতের বেলায় থাকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দরজা, জানালা সব ভেঙে ফেলার কারণে শোঁ শোঁ করে বাতাস ঢুকে। রাতে রুমটার দিকে তাকালে মনে হয়, কারা যেনো দাঁড়িয়ে কথা বলছে।

সংস্কার কাজ চলাকালীন সময়টাতে একটি বেডরুমে দীপ শিখা দু’ছেলে নিয়ে ঘুমাতো। রাত এগারোটা বাজলে তারা রুমে ঢুকে যেতো। একটি রুমে কাজের মেয়ে অন্য রুমটা গেস্টদের জন্য ব্যবহৃত হতো।নাতিদের দেখতে বছরে তিন চারবার দীপের শাশুড়ি ঢাকায় আসেন। তখন এ বাসায় তিনি কিছুদিন থাকেন। মাশুক ও রুম্মানের মামা রিয়াজ একটা বেসরকারী ফুড প্রোডাক্ট কোম্পানীর ন্যাশনাল সেলস্ ম্যানেজার। তাকে সারাদেশ চষে বেড়াতে হয়। ঢাকায় এলে সেও এখানে এসে ওঠে। তখন গেস্ট রুমটা ব্যবহৃত হয়। বস্তুত বাসায় কোন গেস্ট না থাকলে রাতের বেলা সারা ঘর সুনশান নিরব হয়ে যায়। এ সময়টাতে বেডরুম থেকে ডাইনিং রুমে এলে শরীরটা ভারী হয়ে যায়। তখন ডাইনিং রুম থেকে ভগ্ন এ ফ্ল্যাটটা একদম ফাঁকা লাগে। তখন শরীরটা কাঁটা দিয়ে ওঠে। মনে হয় ঠিক পেছন দিকে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। শোবার সময় তারা বেডরুমের দরজাটা লক করে দেয়। তখন দীপের মনে হয় দরজার ঠিক ওপ্রান্তে কে যেনো দাঁড়িয়ে আছে। দরজাটা খুললেই তার সাথে দেখা হয়ে যাবে। গভীর রাতে কোন কাজে ডাইনিং কিম্বা কিচেনে যেতে ইচ্ছা করলে সে তখন ইচ্ছাটা দমন করে ফেলে।

সে কি কোন মানসিক সমস্যায় ভুগছে?
তার ফুফুরও এমন সমস্যা ছিল। সবাই বলতো জ্বীনে ধরেছে। ছেলেবেলার স্মৃতি তার আজো মনে আছে।ছেলেবেলা থেকে দীপ ধর্মভীরু। তার মধ্যে ধর্মান্ধতা বা ধর্ম উম্মাদনা নেই। নিজস্ব গন্ডির মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে সে ধর্ম-কর্ম পালন করে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। দান খয়রাত করে। রমজান মাসে রোজা রাখে। দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে জুমার নামাজ, ঈদের জামাতে অংশ নেয়। ধর্ম পালনে তার স্ত্রী শিখা আরো একধাপ এগিয়ে। সে নফল নামাজ, নফল রোজাও আদায় করে। ইসলাম ধর্মে জ্বীন ও ইনসানের অস্থিত্বের সত্যতা আছে। মানুষের অস্থিত্ব দৃশ্যমান, জ্বীন অদৃশ্য। পবিত্র কোরআন শরিফে বাহাত্তর নম্বর সুরা জ্বীনে এ প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। মানুষের মতো তারাও সবখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দৈনন্দিন কাজ-কর্ম সারছে। আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না। তারা আমাদের দেখতে পাচ্ছে। মানুষের মধ্যে ভালোমন্দ মানুষ আছে। জ্বীন সমাজেও ভালোমন্দ জ্বীন আছে।

ফ্ল্যাট দুটি এক করতে গিয়ে তাদেরকে অনেক ঝুট-ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। আর্কিটেকচার, ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা, কনস্ট্রাকশন কাজ, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংযোগ অপসারণ ও পুণঃ সংযোগ করা। মার্বেল, টাইলস্ বাথরুম ফিটিংস। বিল্ডকম জিপসান ডিজাইন, রঙের কাজ। ইলেকট্রিক ফিটিংস, ফ্যান, এসি, গিজার লাগানো। ওয়াল ফিটিংস্ ফার্নিচার বানানো। ফ্ল্যাটে কাজ করার সময় মিস্ত্রিদের আনাগোনা, ভাঙাগড়ার বিকট শব্দ, মালামাল উঠানামা, উপর, নিচ, পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীদের বিরক্তি। ওনার্স এসোসিয়েশনের নানা শর্ত, কর্মচারীদের ঘ্যান ঘ্যান। একটা নতুন বাড়ি করলে এতটা ভোগান্তি হতো না। যতোটা পুরাতন ফ্ল্যাট দুটি এক করতে হলো। এতকিছুর পর ভালোই ভালোই সবকিছু শেষ হয়েছে। এটাই প্রশান্তি।এখন চারদিকটা আলো আর আলো।

সেদিন রাতে বাইরে দমকা হাওয়া বইছিল। রাত তখন এগারোটা বাজে। হঠাৎ একটা সাদা পাঞ্জাবীওয়ালা অবয়ব খুব দ্রুত রিডিং রুমের ভিতরে ঢুকে গেল। তারপর দড়াম করে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। দীপ দৃশ্যটা দেখেছিল। রিয়াজ তখন পাশের রুমটায় শুয়েছিল। দীপ রিয়াজকে বললো, দেখোতো ঐ রুমটাতে কে! রিয়াজ দরজার লকটা অনেকবার ঘুরিয়ে পেছিয়ে চেষ্টা করলো দরজাটা খুলতে। নাহ, দরজাটা খুললো না। তারপর দীপও চেষ্টা করলো। দরজাটা সেও খুলতে পারলো না। লক হয়ে গেছে ভেবে এবার চাবি খোঁজাখুঁজি চলছে। ফ্ল্যাট ঠিকঠাক করার পর কোন্ জিনিস কোথায় আছে হদিস নেই। কতক্ষণ পরে শিখা এসে লক ঘুরাতেই দরজাটা খুলে গেল। অতি আশ্চর্য।ইদানিং বাসায় এলে রিয়াজ একা ঘুমাতে পারে না। গভীর রাতে রুমের বাইরে ডাইনিং স্পেসে হাঁটার শব্দ পায়। তার মনে হয় কেউ দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। সে মাশুক ও রুম্মানের রুমে ঘুমায়।

দীপের শাশুড়ি ধর্মপ্রাণ মহিলা। তিনি ওয়াক্তের নামাজ ওয়াক্তে আদায় করেন। দিনরাত এবাদত বন্দেগি করেন। কোরআন তেলওয়াত করেন। হাদিস পড়েন। নিয়মিত দোয়া দরূদ পড়েন। একদিন মধ্যরাতে তিনি দেখলেন, শোবার ঘরে ওভারড্রয়ারের পাশে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। উনি চোখ বন্ধ করে আয়তুল কুরসি পড়া শুরু করলেন। তিনবার আয়তুল কুরসি পড়ে হাত তালি দিয়ে নিজের গায়ে ফু দিলেন। তারপর চোখ খুলে দেখলেন কিছুই নেই। মধ্যরাতে তিনি তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন। তখন বাসার ভেতর পায়চারির শব্দ পান।মাশুক এ ঘরের বড় ছেলে। বয়স চৌদ্দ। তার শরীরটা মাংসল, নাদুস-নুদুস। মাঝে মাঝে তার শরীরে পিং পং বলের মতো বৃত্তাকার লাল লাল দাগ দেখা যায়। সকালে যখন সে ঘুম থেকে উঠে তখন দাগগুলো শিখার চোখে পড়ে। মাশুকের শরীরে এলার্জির ভাব আছে।

দীপ ব্যবসার কাজে মাঝে মাঝে দেশের বাইরে যায়। তার আমদানি-রফতানি ব্যবসা। ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতেও যেতে হয়। তখন শিখা একা ঘুমায়। সারাদিন খাটাখাটুনির পর সে খুব ক্লান্ত থাকে। দীপ যখন বাসায় থাকে ঘুমাতে যাবার আগে শিখা বাচ্চাদের স্কুলের ব্যাগ রেডি করে। সব ঠিকটাক আছে কিনা রুটিন চেক করে। তারপর সকালের বাসি পত্রিকা পড়ে। কখনো লিটল ম্যাগাজিনে চোখ বোলায়। দীপ আজ বাসায় নেই। ব্যবসার কাজে চিটাগাং গেছে। শিখা একটা আশ্চার্য ব্যাপার লক্ষ্য করলো। দীপ বাসায় না থাকলে শোবার ঘরে ঢুকলে অন্য রকম একটা তন্দ্রায় সে আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। খাটে শরীরটা ছোঁয়ানোর মিনিট পাঁচেকের মধ্যে তার ঘুম চলে আসে। একদিন গভীর রাতে তার ঘুম ভেঙে গেলো। তার মনে হলো তার গা’র সাথে গা লাগিয়ে একজন শুয়ে আছে। কিন্তু সে কাউকে দেখতে পেলো না। তখন তার শরীরের পশমগুলো সব দাঁড়িয়ে গেল। দীপ রাতে বাসায় না থাকলে তার এ রকম অনুভূতি হয়। সে শুয়ে পড়ার খানিক পর হঠাৎ খাটটা নড়েচড়ে ওঠে। মনে হয় আরো একজন খাটে উঠলো। বক্স খাটটা এতটা ভারী যে এটা নড়েচড়ে ওঠার কথা না।

ঢাকার বাইরে থেকে দীপ ফিরে এলেই তার শিখার সান্নিধ্য চাই। সময়টা যাই হোক। সকাল, দুপুর, বিকেল, রাত যখনই হোক। সে একেবারে উদগ্রীব, ব্যাকুল হয়ে থাকে। তখন শিখার বাহু, বুকের নিচে, হাঁটুর উপর সে কালচে গোল দাগ দেখতে পেলো। চুম্বন যখন দীর্ঘ ও গভীর হয় তখন এরকম দাগ পড়ে। দীপ শিখাকে প্রশ্ন করেছিল, এগুলো কিসের দাগ?

শিখা বললো, বুঝতে পারছি না। শিখার জবাবে সে সন্তুষ্ট হতে পারলো না। সে তার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো। এ ধরনের দাগ সে মাশুকের গায়েও দেখেছে।মাওলানা আবদুর রহমান এ পরিবারের ঘনিষ্ঠ মৌলভী। পরিবারের যে কোন শুভ কাজে তার ডাক পড়ে। রোগে-শোকে বাসায় এসে সে দোয়া কালাম পড়ে। প্রথম ফ্ল্যাটটিও সে বন্ধ করেছিল। দু’এক মাস পর পর মাওলানা আবদুর রহমান, মোয়াজ্জিন মোঃ হামিদসহ দশ-বারোজন হুজুর বাসায় এসে গাউসিয়া খতম দিয়ে যায়। ঘর বন্ধ করার সময় মোয়াজ্জিন মোঃ হামিদকে অদৃশ্য একজন ধাক্কা মেরেছিল। সে প্রচন্ড ভয় পেয়েছিল।

ফ্ল্যাটের কাজ শেষ হওয়ার পর মাওলানা আবদুর রহমান আবারও ঘর বন্ধ করলো। প্রতি দরজা জানালার উপর লেমিনেটেড করা দোয়া সাঁটিয়ে দিলো। তারপর সারাঘরে সে সরিষা দানা, কালি জিরা ছিটিয়ে দিলো। সরিষার দানা ও কালি জিরা সারারাত থাকার পর সকালবেলা ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দিতে হবে। দীপ মাওলানা আবদুর রহমানের কাছে প্রশ্ন করলো, দোয়াতে কি লেখা? এতসব ব্যবস্থা কেন? মাওলানা রহমান বললো, এখানে দুইটি সুরার আয়াত, সাতটা মানুষ ও একটা কুকুরের নাম লেখা। এটা দিয়ে একটা বন্ধনি করে দেওয়া হয়েছে। যাতে ত্রিসীমানা

র মধ্যে কেউ থাকতে না পারে। সরিষা দানা ও কালি জিরাগুলো ছিঁটানো হয়েছে যাতে অদৃশ্য কেউ হাঁটতে না পারে।
ঘর বন্ধ করার পর ফ্লোরে লাফালাফি, দাপাদাপির শব্দ কিছুদিনের জন্য বন্ধ হলো।
দীপ তিনদিনের জন্য সিঙ্গাপুর গিয়েছিল। সে সিঙ্গাপুর থেকে ফেরার পর শিখার শরীরে কালচে দাগগুলো আবারও দেখতে পেলো। শিখা তাকে বললো, বড় ড্রইং রুমটাতে দাঁড়িওয়ালা ফর্সা একটা লোক রাতে বসে থাকে। লোকটার মনটা খুব খারাপ। লোকটা চলে যেতে চাইছে।

ক’দিন পর স্বামী-স্ত্রী বেডরুম বদল করে পূর্বপাশে চলে এলো। লোকটাকে দেখার জন্য দীপ প্রতি রাতে অপেক্ষা করে। দুই মাস ধরে সে চেষ্টা করছে। এখনো লোকটার সাক্ষাৎ মেলেনি।
দীপের ছোট ছেলে রুম্মান। তার এলিয়ন দেখার খুব সখ।
ভীনজগতবাসী তুমি কোথায়? এলিয়ন তুমি কোথায়? আকাশচারী তুমি কোথায়?
প্লিজ, তুমি দেখা দাও।