আমার ভুবন
সত্যব্রত বড়ুয়া, শুক্রবার, মার্চ ০৮, ২০১৩




ছেলেবেলায় আমাকে পাড়ার ছেলেরা আমার শুকনো এবং দুর্বল শরীরের জন্যে মহাবীর দুর্বল সিং বলে ক্ষ্যাপাতো। আমি এতে ক্ষেপে গেলেও মনে মনে খুশি হতাম এই ভেবে যে দুর্বল কথাটির আগে মহাবীর ছিল বলে। এখন কেউ আর আমাকে এ ধরনের কথা বলে না, তবে কটাক্ষ করে বলে কৃপণতা করে আমি ভালো খাবার খাই না। আমার শুভানুধায়ীরা আমাকে শরীর ভালো রাখার বিচিত্র কায়দা কানুন শিখিয়ে দেন। কেউ কেউ আবার জ্ঞান দান করেন কোন খাবারে কি ধরনের এবং কি পরিমাণের ভিটামিন আছে সে সম্পর্কে। সেদিন একজন পরামর্শ দিলেন মেডিটেশন করবার জন্যে। অনেক কষ্টে ধৈর্য ধরে এসব শুনি। দিন ভর অনেক কিছুই শুনতে হয়। সকাল বেলা নাস্তা করবার সময় কলিংবেল বেজে উঠলো। বুয়া দরজা খুলে দিলে দেখলাম আমার অতি পরিচিত এক বিশিষ্ট ভদ্রলোক এসেছেন। তাঁকে বসতে বলার আগেই নাস্তার টেবিলে চেয়ার টেনে তিনি আমার পাশে বসে পড়লেন। আমাকে রুটি আর আলুর দম দিয়ে খেতে দেখে বললেন তিনি প্রতিদিন সকালে কলা, ডিম, কমলার রস দিয়ে নাস্তা করেন। এর সাথে পাউরুটিও থাকে। আমি তাঁর হাড়ির খবর জানি। তিনি যে তাঁর সকালের নাস্তাটা শুধুমাত্র মুড়ি আর এক কাপ চা খেয়ে সারেন তা আমার ভালো করেই জানা আছে। অনেকদিন স্ত্রীকে সহ বেড়াতে বের হই না। মনে পড়লো ছাত্র জীবনের বন্ধুর কথা। বেশ কিছু দিন হয়ে গেলো তার সাথে দেখা হয় না। ওর বাসাতেই দু’জনে গেলাম। আমাকে দেখে ও জাপটে ধরে ড্রইং রুমে নিয়ে বসালো। দু’জনেরই অনেক কথা জমা হয়েছিল। আমাদের আসর জমে উঠতে দেরী হলো না। আমার স্ত্রীর শাড়িটার দিকে তাকিয়ে বন্ধুর স্ত্রী শাড়িটির দাম জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম এটা আমি ওকে পাঁচশ টাকা দিয়ে কিনে দিয়েছিল। তিনি একটু বাঁকা হাসি দিয়ে বললেন তার ঘরে পড়বার শাড়িটার দামই হলো দু’হাজার টাকা বুঝতে পারলাম আরও অনেক কিছুর ফিরিস্তি দেবেন। বাসায় একজন দেখা করতে আসবেন এ কথা বলে কোন রকমে বিদায় নিলাম। আমার এক ব্যবসায়ী বন্ধু সেদিন আমার বাসায় বেড়াতে এসে আমার আলমারীর বইগুলো দেখে বললো তার বই কেনার কথা একেবারেই মনে থাকে না। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বন্ধুটি বললেন এক সময় তিনি তার গাড়ির ড্রাইভারকে বইয়ের বাজারে পাঠিয়ে লাখখানেক টাকার বই কিনে ঘর সাজিয়ে রাখবেন। এ ধরনের কথা প্রায়ই আমার হজম করতে হয়। হজম না করে উপায় নেই কারণ এরা আমার চেয়েও বেশি ভদ্রলোক। আগে আমি ঘুষ দিতে জানতাম না। ঘুষ দিতে লজ্জা হতো। এখন ঠেকে আর ঠকে ঘুষ দেওয়া শিখেছি। ঘুষ খাওয়া এবং ঘুষ দেওয়াকে আমি মনে করি একটা আর্ট। এই আর্ট জানা থাকলে আপনি আমৃত্যু দুঃশ্চিন্তাহীন থাকতে পারবেন। যেদিন আমি জীবনে প্রথম এক ঘুষখোরকে ঘুষ দিতে যাচ্ছিলাম তখন কিভাবে ঘুষের টাকাটা দেবো বুঝতে পারছিলাম না। ঘুষখোর কর্মকর্তাটি আমার দিকে তাকিয়ে অবস্থাটি আঁচ করে নিলেন। তিনি বললেন, আপনার ছোট ভাইকে আমি ভালো করেই চিনি। ওনাকে পাঠিয়ে দিলেই পারতেন। আপনাকে আর কষ্ট করে আসতে হতো না। এ কথা বলেই হাত বাড়িয়ে আমার হাত হতে টাকা ভরা খামটি নিয়ে নিলেন। খামে পাঁচশ টাকার একটি কড়কড়ে নোট ছিল। খামটা একটু ফাঁক করে একনজরে দেখে নিলেন। আমার ধারণা ছিল ঘুষ যারা নেন তারা ভদ্র হন না। কিন্তু এই কর্মকর্তাটি তার পকেট হতে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট বের করে আমার হাতে গুজে দিয়ে বললেন যে আপনি বেশি টাকা দিয়ে ফেলেছেন, তাই কিছু ফেরৎ দিলাম। বাসায় এসে আমার ছোট ভাইকে বললাম, ঘুষ নিলেও কর্মকর্তাটি খুবই ভদ্র। আমাকে পঞ্চাশ টাকা ফিরিয়ে দিয়েছে। আমি পাঁচশ টাকা ঘুষ দিয়েছি শুনে অবাক হয়ে বললো এই সামান্য কাজের জন্যে ও কখনও তিন’শ টাকার বেশি দিতো না। আমাকে আনাড়ি দেখেই পাঁচশ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পাঁচশ টাকা আমি দিয়েছি বলেই ভদ্রতা দেখিয়ে পঞ্চাশ টাকা ফেরৎ দিয়েছে। এটা ভদ্রতার অভিনয়। আমার মতো বোকা ঘুষ দাতাকে সে হারাতে চায় না। এ জন্যেই এতো ভদ্রতা। আমি বললাম, ঘুষ খোর হলেও ভদ্রভাবেই তো ঘুষ নিয়েছে। আমি আমার ছোট ভাইকে বললাম, পরের বারও আমি প্রয়োজনে এই ঘুষখোরটির কাছে যাবো। ছোট ভাই হেসে বললো, বুঝতে পেরেছি তুমি ফাঁদে পড়ে গেছ। যাবার সময় আস্তে করে বললো, একেই বোকা বলে। বোকা কথাটি ছেলেবেলা হতে আমি এতো শুনেছি যে এটা বললে আর মনে লাগে না। মাও বলতেন। বাবা বোকা না বলে বলতেন ইডিয়েট। মনে করেছিলাম স্ত্রীর হাত হতে রেহাই পাবো। বাজার হতে পচা মাছ আনলে সে আমাকে বেকুবের রাজা বলে। আমার এক পুরানো বন্ধু এখন দেদার টাকা কামাচ্ছে শুনে কৌতুহলী হয়ে ওর সাথে দেখা করতে গেলাম। ও আমি লেখালেখি করি শুনে বললো, তুই চিরকাল বোকাই রয়ে গেলি। মনে পড়লো ক্লাসের পড়া পারতো না বলে টিচাররা সব সময় ওকে বোকা বলতো। লক্ষ্য করেছি ইদানিং কেউ আর আমাকে বোকা ডাকে না। মনে হচ্ছে বোকা হওয়ার স্তর আমি পার হয়ে এসেছি। বয়সী মানুষেরা বোধ হয় এই স্তরেই অবস্থান করেন। এর মানেই হলো হিসেব হতে বাদ পড়ে যাওয়া। কান পেতে থাকি কেউ বোকা ডাকে কিনা। কিন্তু ভুলেও কেউ বোকা ডাকে না। এখন শুধু নাতনী বোকা দাদু বলে। এতে স্বস্তি পাই।