রক্তের দাগ মুছে যায় চোখের জলে
-সজল বড়ুয়া-, শুক্রবার, মার্চ ০১, ২০১৩


তারপর আমি চুপিসারে চলে যাই
হৃদ-কম্পনের তোলপাড়ে, স্বপ্নের শিনকানসেনে চড়ে
পিলে-চমকানো ঢাকার পিলখানায়।
টোকিওতে সবাই রাজ্যির ক্লান্তির পর, সুখ-নিদ্রায় তখন বিভোর।

বিষন্নতার কালো চাদর গায়ে জড়িয়ে
বি.ডি্.আর্. সদর দপ্তরে নিঃশব্দে পা রাখতেই
আমার হাত দু'টো চেপে ধরে, দীর্ঘদেহী রক্তাক্ত এক সৈনিক
কানের কাছে মুখ নামিয়ে, অতি সন্তর্পনে, ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে-
'বড় দেরী করে ফেলেছো তুমি। তোমাদের ওখানে তো
দ্রুতগামী ট্রেন শিনকানসেন আছে। তারপরও এতো দেরী তোমার!
তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকে কাঁদছে সারা মাতৃভূমি।
রক্তের স্রোত আর চোখের জলের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে
প্রিয় স্বদেশ। ছোট্ট সবুজ সবার এ'বাংলাদেশ।

শুনেছি, জাপানেও শোকের বৈঠকে বসেছো তোমরা।
ঘোড়ার পায়ের মতো প্রবাসের ব্যস্ত জীবনেও
অঝোরে কেঁদেছো অনেকেই। কাজের ফাঁকে কথা বলেছো
দেশে, বারবার।

তোমাদের শোকাহত কান্নার করুণ শব্দ
এতো দূরেও, রাতের পাখির কান্নার মতো
ঠিকই শুনেছি এখানে আমি, নিজ কানে।
জাপানের সবাইকে তাই স্যালুট জানাই
অসময়ে নিহতদের তরফ থেকে।
ধন্যবাদ। অজস্র কৃতজ্ঞতা তোমাদের
হে আমার পরবাসী বাঙালি জীবন-যোদ্ধারা।

এতোক্ষণ পর ভূত দেখার মতো এবার আমি
চমকে উঠি ঠিকই। মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেই
ম্লান হেসে ক্ষত-বিক্ষত সৈনিক আবারও ফিরে যায়
আপন কষ্টের গল্পে-

'চিনতে পেরেছো আমাকে?
আমিই সেই মেজর জেনারেল শাকিল। বি.ডি.আর. প্রধান।
সিপাহি আবদুল মুহিত দিনের আলোয় দরবার হলের
পেছনের সিঁড়ির নীচে আমাকে গুলি করার পর
বেয়োনেট দিয়ে খোঁচাতে থাকে আমার সমস্ত শরীর।
মৃত্যুর পরেও আমার নিথর শরীর নিয়ে ওদের সেই
বর্বর আনন্দ উৎসব দেখে, সত্যিই আমি আশ্চর্য হয়ে যাই।
আর ওরা আমার সেই বিস্মিত চোখ দু'টো খোলা রেখেই
ঘৃণার আগুনে নিক্ষেপ করে আমাকে, তাদেরই তৈরী গণ-কবরে।
কিছু পরে, সিপাহি ওবায়দুল মুরগি জবাইয়ের মতো
আমার স্ত্রীকে হত্যা করে, আমারই সেই
সাদা বাস-ভবনের দো-তলায়।

ঘাতকের কলুষিত থাবা থেকে রেহাই পায়নি সেদিন
আমার অন্তঃসত্বা বন্ধু-পত্নী, নিরাপরাধ কাজের ছেলে-মেয়ে।
বলতে পারো, আমাদের সেই শোভিত সংসারের বিধ্বস্ত বাগানে,
এখন জীবন্মৃত বেঁচে আছে, শুধু -আমার আদরের মেয়ে 'নিকিতা'
স্কুল-পড়ুয়া ছেলে 'রাকিব'। ওরা কী সত্যিই বেঁচে আছে?
মানুষের করুণায়, মায়া-মমতাহীন পৃথিবীতে
'মা-বাবা ছাড়া জীবনযাপন কী, আসল বেঁচে থাকা?'

অতঃপর নিরুত্তর আমি ভাঙা-বুকে পিলখানার আরেকটু
ভেতরে পা রাখতেই,
দীপ্ত পায়ে আমারই সামনে এসে দাঁড়ায়, সুদর্শন কর্ণেল গুলজার।
'তুমি বিদেশে থাকলেও, নাম আমার নিশ্চয় পড়েছো পত্রিকায়।
জে.এম.বি. ও জঙ্গীরা মৃত্যু ভয়ে আঁতকে উঠতো আমার দৃঢ়তায়।
আমারই বলিষ্ঠ বলয় থেকে রেহাই পায়নি
জঙ্গী-প্রধান 'শায়খ আবদুর, আতঙ্কিত দক্ষিণাঞ্চলের 'বাংলা ভাই',
ইংরেজি নামের 'সানী'সহ অযুত দেশদ্রোহী।
একবার আমি আমার মেয়ের আব্দারে, ওর কোমল হাত ধরে
প্রতিজ্ঞায় বলেছিলাম- 'তোমাকে আজ সিনেমায় নিয়ে যাবোনা মামনি,
তবে এমন একদিন আসছে, যেদিন শুধু সিনেমায় নিয়ে যাওয়া নয়
আমি তোমাকে বলবোও-
ইচ্ছে হলে মামনি তুমি এখন অভিনয়ও করতে পারো সিনেমায়।
আর সে-কারণেই অশ্লীল সিনেমা বন্ধের টাস্কফোর্স নিয়ে
তৎপর ছিলাম আমি, ঢাকার নানান গোপন স্থানে, এফ.ডি.সি.তেও।
একজন বেরসিক সৈনিক হয়েও, শিল্পের প্রতি আমার সেই মমতার কথা
একটুও কী তোমার জানা নেই, হে শিল্প-প্রেমিক?'
শান্তি ও সংগ্রাম'র দীপ্তিময় স্বপ্ন-পুরুষ কর্ণেল গুলজারের
অবিনাশি প্রশ্নের কোনো জবাব না রেখেই
অপরাধী আমি পালাতে থাকি
বি.ডি.আর. দপ্তরের জলভরা পুকুরের দিকে প্রবল তৃষ্ণায়।
চারপাশের বিদীর্ণ হাহাকারে কাঠ হয়ে ওঠে, ভয়ার্ত আমার কন্ঠনালী।

হঠাৎ এবার গভীর রাতের বিমূর্ত ভায়োলিনের করুণ সুরে
ভারী বাতাসে ভেসে আসে, অচেনা এক অতৃপ্ত কন্ঠস্বর-
'আমাকে তুমি চিনরে না ভাই। সৈনিক জীবনের শত ব্যস্ততায়ও
নিশিদিন আমি চেষ্টায় ছিলাম নামাজ পড়ায়।
সেই রোজা-নামাজে নিবেদিত প্রাণ আমাকে গুলি করার পরও
কিছুক্ষণ বেঁচে ছিলাম বলে, প্রচন্ড হিংস্রতায়
আগুন লাগিয়ে দেয় ঘাতকরা আমার সারা শরীরে।
এই পুকুর পাড়েই ওদের উল্লসিত অট্টহাসির শব্দে
এক সময় আমার শরীর পরিণত হয় ছাই-ভস্মে।
আমারও তো ভীষণ ইচ্ছে ছিল ভাই-
মৃত্যুর পরে শেষ গোসলে পবিত্র হয়ে
আতরের সুগন্ধ আর জানাজায় কোরানের অমর বাণী কানে নিয়ে
স্বজনদের মমতায়, সমাপ্তির মায়াবি ছোঁয়ায়
ধীর লয়ে আশ্রয় নেবো, আলো-বাতাসহীন সেই মাটির ঘরে।
কেন? কেন আমার সেই এতোটুকু ইচ্ছেটাও
পূরণ হলোনা, বলতে কী পারো, যুক্তিবাদি হে দেশ প্রেমিক'?

নিরুপায় আমি এবারে সত্যিই পথ খুঁজে মরি, পিলখানা থেকে পালানোর।
জনৈক তরুণ সেনা অফিসার দৌঁড়ে এসে আবারও জানতে চায়
তার মৃত্যুর পরে জন্ম নেয়া, নবজাতকের কুশল সংবাদ।

ছুটে আসছে ওরা সদলবলে। বিধ্বস্ত রক্তাক্ত শরীরে
অমীমাংসিত প্রশ্নমালার যুক্তির স্বচ্ছ জোয়ারে।
শুধু পালাতে থাকি আমি, রেসের ঘোড়ার মতো দ্রুততম পায়ে।
গেইটের ঠিক কাছাকাছি ধাবমান আমার
হাত দু'টো আবারও চেপে ধরে জীবিত দু'জন নারী।
পুলিশ-আই.জি. নূর মোহাম্মদের পরমা সুন্দরী
বিধবা কন্যা 'বাঁধন' কাঁদতে থাকে অঝোর ধারায়-
-'মাত্র তিন মাস আগে ঢাকাতেই আমার
বিয়ে হয়েছিলো ক্যাপ্টেন হায়দার'র সাথে।
বাকিটা জীবন একাকি আমি কিভাবে বেঁচে থাকবো, বলে যাও শুধু ভাই।'
ঠিক তারই পাশে সুখ্যাত কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন
আঁচলে মুখ ঢেকে ভেঙ্গে পড়ে কান্নায়-
'চোখের জলে কী বাঁধ দেয়া যায়?
সারাটা জীবন কোলে-পিঠে নিয়ে, মানুষ করেছি যাকে আমি
আমারই সেই ভাইয়ের ছেলে 'ক্যাপ্টেন গাজ্জালী'কে
ওরা সেদিন হত্যা করলো উন্মত্ততায়, পিলখানার এ'নরকে।'

দূর থেকে এবার দৌড়ে আসে আমারই দিকে
ফুটফুটে এক মেয়ে। তিন-চার বছর বয়স হয়তো তার।
'জানো আঙ্কেল, আমার এ'ছোট্ট হাতেই
মাটি দিয়েছি কবরে, সঙ্গে আরেক অবোধ ভাইকে নিয়ে।
এ'জীবনে আমরা দু'জন কাউকে তো আর ডাকতে পারবোনা -'আব্বু'।
আম্মু আমার চোখের জলের জোয়ারে, অন্ধেরই মতো এখন।
তোমারও তো ছোট্ট একটা মেয়ে আছে....
আম্মুকে নিয়ে আমরা দু'জন কী করবো এখন
শুধু একবার বলে যাও, আঙ্কেল।'

ক্রমাগত প্রশ্নের ধারালো অস্ত্রে আহত আমি
অসহায় হয়ে পড়ি, পিলখানার চারপাশে অভিশপ্ত সেদিন
ভয়ংকর সেই ১৮ ঘন্টা কাটিয়ে ওঠা, ঢাকারই অগণিত মানুষেরই মতো।

ভয়ার্ত চীৎকারে ঘুম ভেঙ্গে দেখি, শুয়ে আছি আমি টোকিওরই বিছানায়।
চোখের জলে ভিজে আছে প্রিয় বালিশ।
পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে
আমারই ছোট্ট মেয়ে, জড়িয়ে ধরে ওর মা'কে।

নিঃসঙ্গ আমি নির্ঘুম রাত কাটাতে থাকি
কোনো একদিন বনানীর সেই নিঃস্তব্ধ সেনা-কবরে
লাল গোলাপের মালা নিয়ে, মাথা নত করার ইচ্ছেয়।