গহীনে বন্ধু হও বুকের ভেতর
আকাশ আহমেদ, শুক্রবার, মার্চ ০১, ২০১৩


উতল হাওয়া
আচমকা একটু উতল হাওয়া। সর সর করে ঝরে পড়ে গাছের কয়েকটি বয়সী পাতা। বাড়ির উঠোনে একটি বেতের মোড়ায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন ফারুক সাহেব। উতল হাওয়ায় শাল সোয়েটার আর কানটুপি দিয়ে প্যাকেট করা নড়বড়ে শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উঠে। বিকেলের মিঠেকড়া রোদটাও হঠাৎ বিষাদ লাগে। খবরের কাগজটা ভাঁজ করে বাড়ির ভেতরে চলে যাওয়ার জন্যে হাঁটুতে হাত রেখে উঠে দাঁড়ান তিনি। শাওন এসে তার হাত ধরে। রুমে ঢুকে বিছানায় শুয়ে শাল সোয়েটার আর কানটুপির সাথে এবার কম্বলও জড়িয়ে নেন। ঠাণ্ডাটাকে যদি একটু বশে আনা যায়।
ফারুক সাহেবের গিন্নি তাহমিনা বেগম এসে পেটের কাছে গরম পানির ব্যাগটা গুঁজে দেন। সেটা পেয়ে কুঁজো হয়ে নিজেকে একেবারে কুণ্ডুলি পাকিয়ে নেন তিনি। তাহমিনা বেগম থির থির করে কাঁপতে কাঁপতে ভেতর রুমে চলে গেলেন। ক’দিন ধরে অদ্ভুত রকমের শীত পড়ছে। প্রতিদিন সকাল হলেই মসজিদের মাইকে বুড়ো মানুষ মরার খবর শুনতে হয়। গত এক সপ্তাহে পাঁচজন মরেছে। যেন অজ্ঞাত রোগের মড়ক লেগেছে গাঁয়ে।
এ মৃত্যু ফারুক সাহেবকে ভীতু করে তুলেছে। কথায় কথায় মুখে তুলে আনছেন মরণের কথা। তাহমিনা বেগমকে কাছে পেলেই বলে ওঠেন, বুঝেছো মাহতাবের মা, মরণের ডাক বোধ হয় শুনতে পেলাম। বেশি দিন আর নেই। এই শীতেই বুঝি চলে যেতে হবে। যত্ন-আত্তি একটু করে নাও। শেষে আফসোসেই বাকি জীবন পার করতে হবে তোমার।
তাহমিনা বেগম ফুঁসে ওঠেন। এক ঝটকায় পানদানিটা সরিয়ে স্থান ত্যাগ করেন। সারাদিন আর দেখা মিলে না।
সন্ধ্যা হলে আবার কাছাকাছি হয় বুড়োবুড়ি দু’জন। চা-নাস্তা শেষে পানদানি নিয়ে বসে দু’জন গল্পে মেতে ওঠেন। পানধুঁকানিতে পানসুপারি গুড়ো করার টুং টাং সুরে কতো কথা যে হয় দু’জনে দু’জনায়। তিন মেয়ের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে চাকুরি করে একটি প্রাইভেট ফার্মে। বৌমা মেয়েটি ভালো। একমাত্র নাতি শাওন ক্লাশ সেভেনে পড়ছে। জমি-জিরাত যা আছে তার ফসল আর ছেলের আয় দিয়ে মোটামুটি যাচ্ছে যাপিত জীবন। এখন কষ্ট কেবল একটাই। রোগ-ব্যাধি। শীত এলেই সে কষ্ট বেড়ে যায়। ফারুক সাহেব তার শ্বাসকষ্টের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে কতো বার যে বিধাতার দ্বারস্থ হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। তবুও মুক্তি মেলে না। চোখের সামনেই কতোজন চলে গেলো। কেবল তিনিই রয়ে গেলেন। রয়ে গেলেন বউ-ছেলের বোঝা হয়ে। শুধু কি ফারুক সাহেব, তাহমিনা বেগমও ওই ম্যারম্যারে শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন হার্টের সমস্যা। দুইজনের দুই জটিল রোগের কারণে দু’জনেই নিজের কাছে কেমন অপরাধীর মতো মিইয়ে থাকেন। বৌমা মেয়েটি ভালো। পরের মেয়ে। অনেক কিছুই সয়ে যায়। রাত-বিরাতে উঠে গরম পানি দেয়। বাথরুমে নিয়ে যায়। মাঝে-মধ্যে একটু বিরক্ত হয়। নিজের মেয়ে হলে এরচেয়ে বেশি হতো। ছেলেও অবহেলা করে না। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। ঔষধ-পত্তর এনে দেয়। এসব গল্প যখন হয় তাহমিনার চোখে-মুখে রাজ্যের সুখ এসে ঠাঁই নেয়। ছেলে আর ছেলেবৌয়ের কাছে কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ে।
তবে যখন নাতি শাওনকে নিয়ে ফারুক সাহেব বিকেলে বেড়াতে বের হন তখন যা শুনেন তাতে মনটা ভেঙে চুর হয়ে যায়। সে কথা কোনদিনও তাহমিনাকে বলেন না তিনি। এই জানুয়ারিতে মাহতাব ছেলেকে শহরের স্কুলে পড়ানোর নাম করে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে সে কথা এখনো তাহমিনা জানে না। তাহমিনাকে বলেন নি ফারুক সাহেব। কিছু কিছু কষ্ট তিনি নিজেই বয়ে বেড়ান।

কষ্টের রঙ
শাওন এসে দাদুর পাশে বসে। একেবারে গা ঘেঁষে। দপ্‌ করে। তাহমিনা বেগম খেঁকিয়ে উঠেন। একটু আস্তে বস্‌। ব্যথা পাবেন তো। কোন হুঁশ-জ্ঞান নেই।
তাহমিনার এমন খেঁকানি পৌঁছে যায় বৌমার কানে। সে গলা উঁচিয়ে দু’কথা শুনিয়ে দেয়। বৌমাকে নিয়ে তাহমিনার স্বপ্নের বুননটা আলগা হয়ে যায়। এবার ফারুক সাহেবের ঠোঁটের রেখায় ফুটে ওঠে নীলকষ্টের রঙ। তাহমিনার চোখে নামে কুয়াশা শিশির। দু’জনের নিরবতা ভাঙে শাওনের কথায়।
দাদু, আমাদের স্কুলে এক বিশাল অনুষ্ঠান হবে। আজ ক্লাশ টিচারের কাছে শুনেছি। সে অনুষ্ঠানে নাকি পুরনো সব ছাত্র-ছাত্রীরা আসবে। মাঠে বিশাল সামিয়ানা টাঙানো হবে। গান-বাজনা হবে। কতো কি!
কি বলিস ? পুনর্মিলনী। এতো দারুণ খবর। কবে হবে অনুষ্ঠানটা?
স্যার বললো জানুয়ারিতে। আমাদের বার্ষিক পরীক্ষার পর। আচ্ছা দাদু, পুনর্মিলনী মানে কি?
পুনর্মিলনী হচ্ছে স্কুলে পড়া সব পুরনো শিক্ষার্থীরা এক হয়ে উৎসব করা। আনন্দ করা। স্কুলের সেই পুরনো স্মৃতিগুলো আবার চোখের কোণে ফিরিয়ে আনা। সেইসব প্রিয় মুখগুলোকে কাছে পাওয়া। মজার এক ব্যাপার।
রাতে মাহতাব এলে ফারুক সাহেব ডেকে পাঠান। শুনেছিস কিছু? পোমরা হাই স্কুলে নাকি পুনর্মিলনী হচ্ছে।
কি জানি। কে কে জানি বলাবলি করছিল। গা করিনি। মাহতাবের নির্লিপ্ত জবাব।
সে কি! এতটা বছর পর স্কুলের পুরনো শিক্ষার্থীরা একটি উৎসব করার উদ্যোগ নিয়েছে। তুই, আমি সেই স্কুলের পুরনো শিক্ষার্থী। আর তোর কিনা কোন আগ্রহই নেই।
বয়স হয়ে গেছে বাবা। এখন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার সময়। ওসব আবেগী ব্যাপার নিয়ে জগত-সংসার মাথায় তোলার কোন মানে হয় না। বাদ দাও তো ওসব। অন্য কোন কথা থাকলে বলো। আমার কাজ আছে।
না। অন্য কোন কথা নেই। তুই যা।
ফারুক সাহেবের মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ছেলেটা টাকার পেছনে ছুটতে ছুটতে পাথর হয়ে গেছে সেটা জানতেন। তবে এতটা পাথরমানব হয়ে গেছে বুঝতে পারেন নি। তার বুকটা হু হু করে উঠল। তিনি রাগে কষ্টে গলা উঁচিয়ে তাহমিনা বেগমকে ভাত দেয়ার হুকুম দিলেন।
ভাত খেয়ে নীরবে শুয়ে পড়লেন। আজ পান খেলেন না। গল্পও করলেন না।
তাহমিনা বেগম রাতের খাবারটা শেষ করে এসে দেখেন তিনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
তাহমিনা এসে তোষকটা গায়ে জড়িয়ে দিলেন। টাঙিয়ে দিলেন মশারিটা। এমন কনকনে ঠাণ্ডাতেও মশার যন্ত্রণা থেকে নিস্তার নেই। তিনি আলগোছে ফারুক সাহেবের পাতলা চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন। আলতো হাত ছোঁয়ালেন ভাঁজ হয়ে যাওয়া নরোম কপালে। ঠোঁটটা নামিয়ে আনতে গিয়ে লজ্জায় আবার ফিরিয়ে নিলেন। মানুষটা ঘুমিয়ে আছে। এই ঘুমন্ত মানুষটাকে ছুঁতে গিয়ে পৃথিবীর সকল লজ্জা এসে জড়িয়ে ধরল তাহমিনাকে। কতো দিন হয়ে গেলো দু’জন দু’জনের কাছাকাছি এসেছিলেন। কেমন শিশুর মতো ঘুমাচ্ছে মানুষটা। মানুষ বুড়ো হলে শিশু হয়ে যায়- কথাটা একদম সত্যি। শিশুর মতো বুড়ো মানুষটাকে দেখে তাহমিনার খুব মায়া হলো। ইচ্ছে হলো পাশে শুয়ে পড়তে। তাহমিনা এখানে শু’লে শাওন কার কাছে থাকবে? তাহমিনার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।

পতনের কাল
অনেক বেলা হয়ে গেলো। কখন ন’টা বেজে গেছে বোঝা যায় নি। ফারুক সাহেব ভোরের নামাজ শেষে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। যখন উঠলেন তখন ন’টা। বিছানা ছেড়ে সকালের নাস্তা সেরে লাঠি হাতে বেরুলেন। তাহমিনা বেগম জানতে চাইলেন। কোথায়া যাচ্ছেন?
একটু স্কুলের দিকে যাবো। ওরা পুনর্মিলনী করছে। একটু খোঁজ-খবর নিই।
এখনো সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। রাস্তায় নামতেই করিম মোল্লার সাথে দেখা। কাঁধের দু’পাশে চারটি খেজুর রসের হাঁড়ি ঝুলছে। ফারুক সাহেবকে দেখেই সালাম দিল।
কেমন আছো করিম? রস কেমন পেলে?
ভালা নাই ভাইজান। রস কই পামু? খেজুর গাছগুলো পুড়ছে আগুনে আর পাহাড় ও জমির মাটিগুলো হয়ে যাচ্ছে ইট। সোনার ইট।
কি করবা করিম। সব মানুষ যে বড়লোক হয়ে যাচ্ছে।
হ’ ভাইজান।
বলতে বলতে করিম মোল্লা অনেক দূর চলে যায়। ফারুক সাহেবের সাথে হাঁটলে তার চলবে না। জীবন তাকে টেনে নিয়ে চলেছে দুরন্ত গতিতে।
কদ্দুর গেলে চোখে পড়ে একদল শিশু খড়কাঠে আগুন জ্বেলে উষ্ণতা নিচ্ছে। ওরা সবাই মক্তব থেকে আসছে। এবার ছুট দেবে স্কুলে। মাঝখানে একটু মজা করে নেয়া। শিশুরা আজকাল মজা করার কোন সুযোগই পায় না। মাঠ নেই। সময় নেই। সব যন্ত্র হয়ে যাচ্ছে। জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আনন্দ। ওরা এখন কানামাছি খেলে না। সাপলুডু খেলে না। ওরা দাড়িয়াবান্দা খেলার নাম কখনো শোনেনি। দেখেনি ডাঙ্গুলি কিংবা বউচুরি খেলা। কতকিছুই ওরা দেখেনি। এক বিশাল শূন্যতা নিয়ে ওরা বড় হচ্ছে। ফারুক সাহেব ওদের পাশে বসে পড়লেন। আগুনের উষ্ণতা নিলেন। ওদের নিয়ে মেতে উঠলেন। আগুন থেকে সাবধান থাকার বুদ্ধি দিলেন। একটা যাদু দেখালেন। ওরা মুগ্ধ হয়ে গেলো।
তিনি হাঁটছেন। পাশ দিয়ে সাঁ সাঁ করে ছুটে যাচ্ছে একের পর এক মোটর সাইকেল। অটোরিক্সা। কতো ব্যস্ত হয়ে গেছে সড়কটি। এক সময় হাতে গোনা কয়েকটি সাইকেলই এই সড়কের সঙ্গী ছিল কেবল। তিনি যখন স্কুলে পড়তেন তখন পুরো স্কুলে মাত্র পাঁচজনের সাইকেল ছিল। বাবাকে কতো করে বলেছিলেন একটি সাইকেলের জন্যে। বাবা দেন নি। আসলে দিতে পারেন নি বাবা। তখন বাবার এত সামর্থ্য ছিল না। মাহতাব যখন ক্লাশ সেভেনে ওঠে তখন তিনি মাহতাবকে একটি সাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। মাহতাব মেট্রিক পরীক্ষার পর সে সাইকেল বিক্রি করে দেয়। তিনি মানা করেছিলেন। মাহতাব শোনে নি। তার অনেক স্বপ্ন ছিল একটি সাইকেলের। সে স্বপ্ন পূরণ করতে ছেলেকে সাইকেলটি কিনে দিয়েছিলেন। তাই তিনি সাইকেলটি বেচতে চান নি। ছেলের কাছে পিতার আবেগের কোন মূল্য ছিল না। তখন থেকেই মাহতাব টাকার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। সে চক্র এখনো তাকে আঁকড়ে আছে।
স্কুল গেইটে এলে তিনি খানিকটা জিরিয়ে নেন। তারপর প্রথম সিঁড়িতে পা রাখেন। পা’টা কেঁপে উঠল। বুকটাও। বাবার আঙুল ধরে প্রথম এই সিঁড়িতে পা রাখার স্মৃতিটা মনে পড়ে গেলো ফারুক সাহেবের। বাবা বলেছিলেন, এই সিঁড়িতে ক’টি ধাপ আছে গুণে গুণে উঠবি।
কেন বাবা?
উপরে ওঠার একটা শিক্ষা আছে। মানুষ যখন উপরে ওঠে তখন প্রতিটি ধাপে তাকে ঝুঁকতে হয়। তার মানে তোমাকে উপরে উঠতে হলে আগে নত হতে হবে। এই যে তুমি জীবনে উপরে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে স্কুলে যাচ্ছো, এই স্কুলের কাছে তোমাকে প্রতিদিন কতবার ঝুঁকতে হবে সেটা প্রথম দিনই হিসাব করা দরকার।
বাবার কথায় আমি সেদিন সিঁড়ির ধাপগুলো গুণেছিলাম। এরপর থেকে যতবারই এই সিঁড়িটা ডিঙ্গিয়েছি ততবারই মনের অজান্তে ধাপগুলো গুণেছি।
আজো সিঁড়ির ধাপগুলো গুণে গুণে উঠছেন ফারুক সাহেব। সর্বশেষ ধাপটিতে যখন তিনি পা রাখলেন, তিনি বললেন, সাতচল্লিশ। চারটি ধাপ বেড়েছে। এ ধাপ আগে ছিল তেতাল্লিশ। আজ তিনি সাতচল্লিশ বার ঝুঁকলেন। মনে মনে ভাবলেন, কেন?
জীবন তো সায়াহ্নে। আর উপরে উঠার কোন ইচ্ছে নেই। এখন শুধু পতনের কাল। অধঃপতন। এই অধঃপতনের দিকে যেতে যেতে খুঁজে ফেরা কিছু সোনালী স্মৃতি। সেই স্মৃতি হাতরাতে কি ব্যাকুল এ মন।
হেডমাস্টার সাহেব রুম থেকে বেরুতেই ফারুক সাহেবকে দেখলেন। ছুটে এলেন। হাত ধরলেন। উতলা হলেন। রুমে নিয়ে বসালেন। চা-বিস্কিট খাওয়ালেন। পুনর্মিলনীর আদ্যন্ত জানালেন। একটি ফরম এগিয়ে দিলেন। ফারুক সাহেব পূরণ করলেন। একশ’ টাকা ফি আর দুটি ছবি পরে পৌঁছাবেন বলে জানালেন।
ফারুক সাহেব চোখ থেকে চশমাটা খুলে হাতে নিলেন। ভরা পূর্ণিমার জোয়ার নেমে এসেছে তার চোখে। গাল বেয়ে উপছে পড়া সেই জোয়ারের জল টপ টপ করে নেমে আসছে। তিনি কাঁদছেন। অঝোর ধারায় কাঁদছেন। আঙুল তুলে মবিন চৌধুরীর ছবিটা দেখিয়ে বললেন, ওই মানুষটা না হলে এখানে এই স্কুলটা হতো না। ওই যে, অই বাদশা মিয়ার ছবিটা দেখছেন তিনি আর তাঁর চাচা সরু মিয়া জমি না দিলে এখানে এই স্কুলটা হতো না। এই মানুষগুলো অনেক বড় মাপের মানুষ। এদের আরেকটু বেশি যত্ন পাওয়া উচিত।
তিনি বাইরে এলেন। এক দৃষ্টিতে বটগাছটির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। বললেন, ওই বটগাছটি ছিল আমাদের পরম বন্ধু। ওই গাছের নিচে বসে নজির আহমদ আইসক্রিম বিক্রি করতেন। আমরা বাকীতে খেয়ে শুধুই ঠকাতাম তাকে। পাঁচ টাকা খেলে তিন টাকা দিতাম। ওখানে ছিল স্কুল বোর্ডিং। সেখানে কি সুন্দর বিল্ডিং হয়েছে। দো’তলা বিল্ডিং। চোখটা জুড়িয়ে গেলো। এখানে একটা পলাশ গাছ ছিল। সেটি নেই। তবে আরো অনেক পলাশ গাছ দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে আরো অনেক কৃষ্ণচূড়া গাছও। ফেব্রুয়ারিতে পলাশ আর কৃষ্ণচূড়া ফুলে আকাশ লাল হয়ে যেতো।
বাহ একটি সুন্দর মসজিদ হয়েছে। এটি খুব ভালো কাজ। আমরা দিন দিন নৈতিকতা হারিয়ে ফেলছি। স্কুলের পুরনো ভবনটা এখনো রয়ে গেছে। বিরাট ফাটল। বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে পাঠদান করা ঠিক না। অনেক পুরনো। নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ জরুরী।
তিনি পুরো স্কুলটা ঘুরে ঘুরে দেখলেন। চারপাশের বৃক্ষরাজি দেখে খুশী হলেন। তিনি একটি স্বপ্ন নিয়ে ফিরে এলেন।

একটি টিকটিকি ও কয়েকটি তেলাপোকা
মাহতাব বউ-ছেলে নিয়ে শহরে চলে যাচ্ছে। রাস্তায় দুটি মিনি ট্রাকে ঘরের মালামাল সব উঠানো হয়েছে। ঘরে আছে কেবল একটি চৌকি। দুটি বেতের মোড়া। কয়েকটি হাঁড়ি-পাতিল। কিছু কাপড়-চোপড়। তাহমিনা বেগম নির্বাক। বসে আছেন ঘরের দাওয়ায়। ফারুক সাহেব ছেলেকে সবকিছু দেখে-শুনে নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। শাওন কিছুতেই যাবে না। বৌমা তাকে ধমকাচ্ছে। গ্রামে থেকে গোয়ার্তুমি ছাড়া তো কিছুই শিখতে পারলে না। এবার একটু মানুষ করতে পারি কিনা দেখি।
গাড়ি দুটি চলে গেলো। নিঃসীম শূন্যতা এসে ঘিরে ধরে ফারুক সাহেবকে। তিনি একটি বেতের মোড়া এনে উঠোনে বসলেন। তাহমিনাকে পান দিতে বললেন। তাহমিনা পানের কৌটা এনে দেখে কৌটায় পান নেই। ফারুক সাহেব বললেন, চিন্তা করো না। এখন থেকে ‘নেই’ অবস্থার সাথে বসবাস করার অভ্যাস করতে শেখো। তোমার ছেলে মাসের খরচ দিয়ে গেছে। দু’জনের চলে যাবে।
তাহমিনা রান্নাঘরে যান। কয়েকটি তেলাপোকা দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে। অনেকদিন পর খোলা মাঠ পেয়ে তারা খুশিতে আত্মহারা। তাহমিনা বেগমকে মোটেই কেয়ার করছে না। ফারুক সাহেব ঘরে ঢুকলে একটি টিকটিকি ফ্যাল ফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে যেন তাকে দেখে বিদ্রুপের হাসি হাসছে।
রান্নাঘরে তাহমিনার পেছনে গিয়ে দাঁড়ান তিনি।
আলু সেদ্ধ করো। প্রথম দিনটা আলু-ভর্তা দিয়ে শুরু করি।

আলোর বুনন
আজ পুনর্মিলনী। তাহমিনাকে নিয়ে ফারুক সাহেব এসেছেন অনেকক্ষণ হলো। খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে পুরো মাঠ। পুরনো শিক্ষার্থীরা আসছে। এখনো পর্যন্ত ফারুক সাহেবের ব্যাচের কারো দেখা মিলল না। অনুজরা এসে সালাম করছে। তাদের সমবয়সী কারো দেখা মিললেই একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরছে। লাফালাফি করছে। সেই সাথে চিৎকার-চেঁচামেচিও। ফারুক সাহেবের খুব ভালো লাগছে। তিনি তাহমিনাকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মাঠের দক্ষিণ কোণার দিকে গেলেন। সেখানে একটি নীল চেয়ারে বসে আছেন নীল শাড়ি পড়া এক বয়স্ক মহিলা। তিনি একা। চুপচাপ। ফারুক সাহেব কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন, আপনার ব্যাচের কেউ আসেন নি?
কাউকে ঠিক চিনতে পারছি না।
আপনি কোন ব্যাচের?
৬৬।
কি বললেন? ৬৬?
ফারুক সাহেব জহুরি দৃষ্টিতে ভালো করে তাকালেন মহিলার দিকে। মনে হয় চিনতে পেরেছেন। আপনি শাহেদা না? শাহেদা পারভিন।
হ্যাঁ। আপনি?
দেখি চিনতে পারেন কিনা।
তিনি অনেকক্ষণ ধরে গভীর পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, না। চিনতে পারছি না।
একটা ক্লু দিই। তারপরও চিনতে না পরলে ধরে নেবো আপনি স্মৃতিভ্রষ্টা।
ক্লাশ সিক্স। প্রথম দিনের প্রথম ঘন্টা। জুট মিলের বাসা থেকে আসা ফর্সা একটি মেয়ে বসে আছে মেয়েদের সারির প্রথম বেঞ্চে। পাড়া-গাঁ থেকে আসা লাল কোর্তাওয়ালা একটি ছেলে তাদের দ্বিতীয় সারির পঞ্চম বেঞ্চে। ছেলেটি মেয়েটির দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। স্যার পড়াচ্ছেন। সেদিকে ছেলেটির খেয়াল নেই। স্যার ডাক দিলেন। ছেলেটি শুনলো না। স্যার ছেলেটির কাছে আসলেন। কান ধরে টেনে দাঁড় করালেন। ছেলেটি হতভম্ব। জীবনে এমন সুন্দর মেয়ে কোনদিন দেখে নি।
স্যার ছেলেটিকে বললেন, ওদিকে তাকিয়ে আছো কেন?
ছেলেটির মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুচ্ছে না। হা করে আছে। ক্লাশের প্রথম দিনেই তার কপালে জুটলো দশটি বেতের আঘাত।
মহিলা এবার চেঁচিয়ে উঠলেন। রাব্বি। তুমি ফজলে রাব্বি। কিভাবে চিনব? কেমন বুড়ো হয়ে গেছো।
তুমি বুঝি বুড়ি হও নি?
ইস, কতোদিন পর দেখা। দাঁড়িয়ে আছো কেন ? বস, বস। ইনি নিশ্চয়ই তোমার স্ত্রী।
হ্যাঁ। তোমার স্বামী?
নেই।
ও’ সরি। ছেলেপুলে?
দুটি মেয়ে। বিয়ে হয়ে গেছে। দেশের বাইরে থাকে। আমি এখানে একা। নিঃসঙ্গ। মেয়েরা তাদের কাছে চলে যেতে বলে। দেশ ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না। কোলাহল ভালো লাগে না। শুধু পুরনো বন্ধুদের দেখা পাবো। এই ভেবে পত্রিকায় পেয়ে ছুটে এসেছি। তোমার দেখা পেয়ে খুব ভালো লাগছে। এবার বলো, তোমার ছেলেপুলে কি?
এক ছেলে। গেল সপ্তাহে বউ-বাচ্চা নিয়ে শহরে চলে গেছে। আমরা গ্রামেই পড়ে আছি। নিঃসীম নিঃসঙ্গতায়।
বাদ দাও ওসব। বলো, অন্যদের খবর কি? মালেক, জব্বার, জাহাঙ্গীর, ইফতি, আকরাম, আরেফিন, কৃষ্ণ, মেঘবতী, পাপিয়া, আফরোজা। ওরা কোথায়?
জানি না। আমার মতো যারা কোথাও যাবার কোন সিঁড়ি পায় নি, তাদের সাথেই কেবল কালেভদ্রে দেখা হয়। যারা সৌভাগ্যের ট্রেনে উঠে চলে গেছে বহুদুর, তাদের কোন খবর কোনদিন পাই নি। আমরা আছি মৃত্তিকা বুকে নিয়ে। রক্ত-ঘাম জল করে জীবনের ঘানি টেনে। পারিনি তোমাদের মতো শরীরে মেদ জমাতে। রূপসী হতে।
কি যে বলো। এখনো তেমনই রয়ে গেছো তুমি।
ফরহাদ কোথায়? শারমিনের সাথে তার সংসারটি টিকেছিল?
হ্যাঁ। তারা খুব সুখেই আছে। তাদের দুই ছেলে-মেয়ে। বিয়ে হয়ে গেছে।
কি বজ্জাতই না ছিল সে। শারমিনকে ভালোবাসতো। আর চিঠি দিয়ে বেড়াতো আমাদের সবাইকে। আরেক ফাজিল ছিল মাসুদ। মেয়েদের টেবিলে শুধু আজেবাজে কথা লিখে রাখতো।
আজেবাজে না। প্রেমের সংলাপ।
তখন ওসবই বাজে মনে হতো। সাজ্জাদ মুন্নীকে চিঠি দিয়েছিল। আর মার খেলো ওসমান। মামুন ছিল স্কুল পালানোতে ওস্তাদ। স্কুল পালিয়ে চান্দিনা হলে সিনেমা দেখতে যেতো দল বেঁধে। নিখিল ছিল চুরির ওস্তাদ। আমাদের সময়ে মেয়েদের জামায় পকেট ছিল না। আমরা টাকা রাখতাম বইয়ের ভাজে। নিখিল ব্যাটা মেয়েরা ক্লাশে গেলে সুযোগ বুঝে কমনরুমে ঢুকে বইয়ের ভাঁজ থেকে সব টাকা হাতিয়ে নিতো। একবার ধরা খেয়ে ভীষণ মার খেয়েছিল। বলেই হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে শাহেদা।
ফারুক বলে, তোমার দেখছি সব মনে আছে।
ওইসব ফাজিলরা কই? ওরা আসবে না?
নিখিল নেই। একসিডেন্ট করেছিল। সাজ্জাদ মারা গেছে ক্যান্সারে। কৃষ্ণ দাশকে কারা মেরে নদীতে ফেলে দিয়েছিল। দুই দিন পর লাশ মিলেছে। শাহজাহান একটি ব্যাংকের বড় অফিসার। কাদের বিদেশ গিয়ে অঢেল টাকার মালিক হয়েছে। শফিকের ছেলেরা টেম্পু চালায়।
মাইকে ডাক পড়ে। অনুষ্ঠান শুরু হবে। অতিথিরা এসে গেছেন। মাঠ জনারণ্যে পরিণত হয়েছে। চারপাশে চলছে হৈ-হুল্লোড়। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শিহরণ। শাহেদা উঠে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায়। যেন একটি নীলপরী হেঁটে যাচ্ছে। তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে মনে মনে গুন গুন করেন তিনি, গহীনে বন্ধু হও বুকের ভেতর।
ফারুক সাহেব পাশ ফিরে দেখেন, তাহমিনা নেই। সারা মাঠ খুঁজে বেড়ান। না, তিনি কোথাও নেই।