সাইবার ছারপোকা এবং ...
মোস্তফা কামাল পাশা, শুক্রবার, মার্চ ০১, ২০১৩





গল্পের চেয়েও রোমাঞ্চকর একটি সত্যি ঘটনা লেখার সুগারকোট হিসাবে উপহার দিতে চাই। ঘটনার নায়ক সরকারি কর্মচারি। কাজ করেন স্পর্শকাতর একটি প্রতিষ্ঠানে। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারিটির নাম গ। পবিত্র হজ্বব্রত পালনের পাশাপাশি পাঞ্জেগানা নামাজ ঘটনা-দুর্ঘটনা ছাড়া ক্বাজা করেন না তিনি। ফজরের আগে তাহাজ্জুদের নামাজও আদায় করেন। নামের আগে যত্ন করে লিখেন ‘আলহাজ্ব’। তিনি শহরে চার চারটা বহুতল ভবনের মালিক। ভুল হয়ে গেল একটু। বাড়িগুলো গ সাহেবের নয়, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ও শ্যালকের নামে। ৩০০ টাকার স্ট্যাম্প পেপারে চুক্তি করে স্ত্রীর বাড়িতে ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করেন তিনি। চার বাড়ির বাইরে নির্মাণ ও পরিবহন খাতেও মোটা অংকের অর্থ খাটছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, পরহেজগার মানুষটি ছোট চাকরি করে এত অর্থবিত্তের মালিক হলেন কী করে? দেশের চলমান বাস্তবতা সম্পর্কে যারা সচেতন, তারা নিজেরাই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজে নিতে পারবেন। অবশ্য গ সাহেবকে যারা চিনেন, অপ্রিয় প্রশ্ন করার সাহস তারা রাখেন না। একান্ত ইয়ার দোস্তরা রসিকতা করে জানতে চাইলে দাড়ি মোবারকে আঙ্গুলের চিরুনি চালিয়ে বলেন, সবই আল্লাহ্‌র নেয়ামত, আমি উছিলা মাত্র। আল্লাহ যাকে নেয়ামতের ভাণ্ডার থেকে দান করতে চান, তাকে যে কোন উছিলায় দান করেন।
তো একদিন হয়েছে কি, ভদ্রলোকের সাংঘাতিক মেজাজ খারাপ। কারণ, কিছু ইসলামি দল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে ইসলাম বিরোধী অপতৎপরতা বন্ধের দাবিতে। হরতাল মানেই আদালতের কাজ বন্ধ। হাকিম সাহেবরা আসবেন না। মামলা উঠবে না এজলাসে। মামলা নাই তো গ সাহেবের দৈনিক নগদ আমদানি নাই। প্রচুর টাকা লোকসান। সকালে ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে ডেক চেয়ারে তজবিহর দানা টিপার পাশাপাশি হরতালকারীদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধারের মত আখেরাত এবং দুনিয়ার যুগল দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। এসময় হানা দেন স্কুল জীবনের এক ঘনিষ্ঠ সহপাঠী। ‘অসফল’ মানুষটি তার দু’চোখের বিষ। স্কুলে মাস্টারি করে চুল পাকিয়েছে। নামাজ-কালামের ধারেকাছে নেই। কিন্তু ছাত্ররা তাকে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে প্রচুর ভক্তি শ্রদ্ধা করে। ওদিকে নিস্তেজ সূর্যের সাথে আকাশজুড়ে মেঘের লুকোচুরি খেলা চলছে। মাস্টারকে পাত্তা না দিয়ে আকাশ দেখছিলেন গ সাহেব। বন্ধুর দৃষ্টি অনুসরণ করে মাস্টারের চোখ জোড়াও পূর্ব দিগন্তে ছুটে যায়। নারকেল গাছের এলোমেলো ঝাঁকড়া চুলের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে এক টুকরো আকাশ। সেখানে গাঢ় বেগুনি আর সিঁদুরে মেঘের থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে। রঙের আভা ছিটকে পড়েছে নারকেল ডগার ঝাঁকড়া চুলে। দিগন্তরেখা ছুঁয়ে অর্ধচন্দ্র বানিয়ে উড়ে যাচ্ছে যাযাবর পাখির ঝাঁক। বিদায়ী সূর্যের নরম সোনা রঙ ধুয়ে দিচ্ছে পাখিদের ডানার সকল ক্লান্তি। আকাশ হাল ফ্যাশনের হিরে বসানো সোনার সরব নেকলেস পরে সাজুগুজু বিবি সেজে আছে নাগরের অপেক্ষায়। কনে দেখা বিকেলে আকাশের রূপ দেখে মুগ্ধ মাস্টারের ঠোঁট দিয়ে বেরিয়ে আসে একটি শব্দ, অপূর্ব!
কী অপূর্ব! খেকিয়ে উঠে মাস্টারের মুগ্ধতার আবেশে তিরিক্ষি শব্দের তীক্ষ্ণ খঞ্জর চালিয়ে দেন গ সাহেব। খঞ্জরের কোপে সৃষ্টির অপরূপ শোভাটি হারিয়ে ফেলেন মাস্টার। আকাশের গলা থেকে পাখির নেকলসটাও মুছে যায়। মাস্টারের ধারালো চোখ ফিরে আসে বাল্যবন্ধুর দাড়ির অরণ্য ঘেরা গারদা- গোবদা চর্বিল মুখে।
এই গাছে ৩৪টা ঝুনা নারকেল ছিল। এখন আছে মোট ২২টি। ঝড়ের ঝাপটায় পড়ে গেছে। খানকির বাচ্চারা সব হাপিস করে মাত্র ৬ টা দিয়েছে। চোর-বাটপারে ভরে গেছে দেশ, আর তুই বলছিস অপূর্ব! গ সাহেব নিম্নচাপটা বের করে আনেন প্রচণ্ড উদগারে। মাস্টার তো যাকে বলে, একেবারে ‘লা-জবাব’। তাঁর ধারণা ছিল, বন্ধু বিভোর হয়ে আকাশের অপার্থিব রূপসুধা উপভোগ করছে, সে যে গাছের ঝুনা নারকেল গুনছিল, এটা বোঝার মত মগজ অভিজ্ঞ মাস্টারের ভাণ্ডারে আল্লাহপাক দেননি।
বন্ধুর তীক্ষ্ণ হূল শরীর থেকে খুলে নিয়ে মাস্টার ফোড়ন কাটেন, তা দোস্ত বাড়িতো তোর না ভাড়া থাকিস, নারকেল হাপিস হলে তোর কী? জবাবে গ সাহেবের চোখের মণি থেকে ক্রোধের তীব্র বিদ্যুৎঝলক ছুটে এসে বিদ্ধ হয় মাস্টারের শরীরে। গ সাহেব আধ্যাত্মিক সাধক হলে বহ্নিঝলকে ছাই হয়ে মাস্টারের ক্ষিণতনু মার্বেল পাথর বসানো পিছলা বেলকনিতে পড়ে থাকতো। পোড়খাওয়া মাস্টার বন্ধুর চোখের আগুন সামলে ফোড়ন কাটেন, তুচ্ছ কারণে তোর এতো মন খারাপ?
তুচ্ছ, বলিস কীরে হারামজাদা! একটা নারকেলের দাম ৪০টাকা। ৬টার দাম ২৪০! এদিকে . . . পুতেরা ধর্মরক্ষার নামে হরতাল ডেকেছে। অফিস কামাই মানেই বিশাল লস। এমনিতে সপ্তাহে দু’দিন ছুটি তার উপর হরতাল। হারামজাদাদের রসদ যোগায় কারা? আমাদের মত ছাপোষা প্রাণিরা। এরাই আবার পেটে উল্টো লাথি ঝাড়ে। মাস্টার বন্ধুর ক্রোধের সূত্র আবিষ্কার করে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হয়ে পড়েন।
ঘটনা বলুন গল্প বলুন, এখানেই শেষ। অর্থাৎ কিনা ‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’। বাঙালির ভাষা, স্বাধীকার তথা স্বাধীনতার চেতনা উন্মেষের মাস ফেব্রুয়ারি বিদায়ের অপেক্ষায়। আসছে মহান স্বাধীনতার মাস অগ্নিঝরা মার্চ। লক্ষ দিনের সুষুপ্তি কাটিয়ে বাঙালির মননে নবজাগরণের চেতনার বীজ ছড়িয়ে দিয়েছে শাহবাগের দুর্বিনীত কিন্তু সৃজনশীল তারুণ্য। তারুণ্যের নবজাগরণের সজীব সতেজ বীজতলা লণ্ডভণ্ড করে দিতে পবিত্র ধর্মকে ঢাল বানিয়ে জাতিসত্তার বিরুদ্ধে নতুন ফ্রন্টে লড়াই ঘোষণা করেছে পশ্চিমা প্রভুদের আদরযত্নে পোষা প্রতিক্রিয়াশীল একটি শক্তি। দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবেগ ও ধর্মীয় অনুভূতিকে টার্গেট করে তারা সশস্ত্র তাণ্ডব চালাচ্ছে দেশজুড়ে। অমর একুশের চেতনার সারজলে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা বীজতলার সোনালি ফসল ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল ছড়িয়ে পড়ার আগেই লাখো শহীদের রক্তভেজা মানচিত্র নিজেদের দানবীয় অস্তিত্ব ধরে রাখতে মরণকামড় বসাতে ৩৬ বছরের মজুদ বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার শান দিচ্ছে। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার সহজ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে সাইবার অপপ্রচারণা। শাহবাগের আন্দোলনকারী তরুণদের নামে ভুয়া আইডি খুলে প্রিয় ধর্ম ইসলাম, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স.) এর বিরুদ্ধে অশ্লীল এবং অত্যন্ত আপত্তিকর প্রচারণা চালিয়ে খেপিয়ে তুলছে ধর্মপ্রাণ আলেম-ওলামাসহ সাধারণ মুসল্লিদের। সাইবার ফ্রন্টের উলঙ্গ ধর্মীয় অপপ্রচারকে নিজেদের পৃষ্ঠপোষক মিডিয়াগুলোর মাধ্যমে প্রিন্ট সংস্করণ প্রকাশ করে ধর্মরক্ষার নামে নিজেদের সুরক্ষায় আত্মঘাতি নতুন সেক্টর খোলা হয়েছে। দেশের লাখ লাখ মসজিদ-মাদ্রাসার কোটি-কোটি ধর্মপ্রাণ মুসল্লির, শিক্ষার্থীকে নতুন প্রচারণা যুদ্ধের গোলাবারুদ হিসেবে ব্যবহার করতে জাতিঘাতি ষড়যন্ত্রের জাল পেতেছে দেশজুড়ে। অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, নতুন ফ্রন্টের রণকৗশল তারা সাজিয়েছে মহাজোট সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের ঢোল বাদ্যির হুংকারে শত্রুর রণকৗশল নিয়ে সরকার বা দলীয় সুবিধাভোগী চক্র এবং যুব ছাত্র ফ্রন্টের মাথামোটা চাঁইরা মাথা ঘামাবার সময় পায়নি। ফলত ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের স্লোগান ও লোগোধারীদের হটিয়ে সাইবার সেক্টরের প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় নিয়ে নেয় বিপুল বিত্ত-পুঁজি এবং বিদেশি সহায়তাপুষ্ট পরজীবী শ্রেণি। জন্মের পর থেকে নিজেদের প্রতিরক্ষা এবং সুরক্ষা হাতিয়ার হিসেবে তারা ব্যবহার করছে পবিত্র ধর্মকে। ধর্মভীরু এবং ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে এর চেয়ে শক্তিশালি অস্ত্র আর কিছুই নেই। পাশাপাশি একাত্তরের মানবতাবিরাধী চিহ্নিত যুদ্ধপরাধীদের রক্ষায় মহাজোট সরকারের গত চার বছর বিদেশি লবিস্ট ও মিডিয়া খাতে ব্যয় করেছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। দেশের সেবা ও ভোগ্যপণ্য খাতে স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ আর্থিক তদারকি চালালে দেখা যাবে, অন্তত ৩০ শতাংশ সাদাকালো অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে বিশেষ গোষ্ঠীটা। নানা ছিদ্রপথ ব্যবহার করে সরকারি পদাধিকারী বহু রাঘব বোয়ালের কব্জিতে এরা রৌপ্যের হাতকড়া আটকে দিয়েছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, সরকারি প্রশাসন শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেক্টরের মত স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান বিশেষ গোষ্ঠীর সাবেক ক্যাডাররা ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাতাদের ‘এ্যপ্রন’ ব্যবহার করে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে নির্বিঘ্নে। সাইবার সেক্টরে কাজের সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে জানি, নিজের ইমেইল, নিউজপোর্টাল এ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে বেশ কয়েকবার। ভুয়া ব্লগ, ফেইসবুক একাউন্টে নিজের নামে পোস্ট করে দেয়া হয়েছে চরম অশ্লীল এবং অরুচিকর একাধিক ট্যাগ! বিপুল আর্থিক ক্ষতির দামে জঞ্জালমুক্তির পথ খুঁজে নিতে হয়েছে। কারা এসব করছে? ডিজিটাল বাংলাদেশের স্থপতিরা জাতি, দেশ ও ধর্মবিরোধী অশ্লীল অভব্য প্রচারণা থেকে উন্মুক্ত মিডিয়া দিগন্তকে সুরক্ষায় কী ব্যবস্থাই বা নিয়েছেন? এর জবাব হচ্ছে, না-কিছুই না। এরা কথা বলতে, সম্পদ বৃদ্ধির হিসাব কষতে যত দক্ষ, ঠিক ততটাই নাবালক দেশের সাইবার দিগন্তের ছারপোকা নিধনে। আজ সাইবার অপপ্রচারে ধর্মবিরোধী জঘন্য স্টিকার সেঁটে দেয়া হচ্ছে ঘাতকের খঞ্জরে ক্ষত-বিক্ষত একজন শাহবাগ যোদ্ধার শরীরে। নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর তাকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে মুরতাদের কাতারে! যারা বেঁচে আছেন, চালিয়ে যাচ্ছেন অসম সাইবার যুদ্ধ, তাদের পরিণতি নিয়েও শঙ্কার মেঘ ভারি হচ্ছে। প্রতিপক্ষের নামে ভুয়া আইডি খুলে সাইবার ফ্রন্টের অভব্য ধর্মীয় অপপ্রচার সযত্নে পরিবেশন করা হচ্ছে ধর্মপ্রাণ মানুষের পাতে। এরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন, ধর্মীয় অনুভূতির পবিত্রতা রক্ষায় রাস্তায় নামছেন পাগলের মত। কিন্তু আসল শত্রু যে এদের ভেতর ধর্মীয় আলখেল্লা চাপিয়ে লুকিয়ে আছে, তাদের শনাক্ত করার দায়িত্ব কার? নবীন সাইবার যোদ্ধাদের যুদ্ধ শুরু হয়েছে মাত্র। শেষ করতে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ এবং কঠিন পথ। বিধ্বংসী সাইবার ছারপোকা সমূলে বিনাশ ছাড়া অভীষ্টে পৌঁছা মোটেই সহজ নয়।