একটি মৃত্যু এবং আমি
মোহাম্মদ হোছাইন, শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৩


ক’মিনিট আগে আজরাইল এসে ইসরাফিলের প্রাণটা এক ঝটকায় বের করে নিয়ে আকাশে উড়াল দিয়েছে। কোন ছুঁতো ছাড়াই যে যম বেটা এমন গর্হিত কাজটি করেছে, তা নয়। শুধু ইসরাফিলের ক্ষেত্রে কেন-সবারই বেলায় থাকে কোন না কোন অজুহাত। কেউ মরে রোগের খপ্পরে পড়ে, কেউ মরে পানিতে ডুবে, কেউ বিষ খেয়ে, কেউ গাড়িচাপা কিংবা আগুনে পুড়ে-আরো কত কত উপলক্ষ। কেউ বা আর দশজনকে অবাক করে দিয়ে হাসতে হাসতে দম আটকে ভবলীলা সাঙ্গ করে। সুতরাং প্রতিক্ষেত্রে যম বেচারা নির্দোষ। আমরা মিছামিছি তার দোষ দিই। আমার বন্ধু ইসরাফিলের বেলায় ওরকম একটি ছুঁতোর বদৌলতে যম সাহেব বিধাতার অর্পিত দায়িত্বটি সুসম্পন্ন করেছেন।

সিঁধেল চোর সিঁধকাটা-ফোকর দিয়ে ঢুকে গৃহের অদ্বৈত এবং অমূল্য জিনিসটিও চুরি করে নিয়ে যায়। যম বেটাও একটি ছুঁতোকে ফোকর হিসেবে ব্যবহার করে সিঁধেল চোরটির মতো ইসরাফিলের দেহে কটাস করে ঢুকে তার প্রাণটা চুরি করে ফুডুৎ করে উড়াল দিয়েছে। আরে, এটাকে চুরি বলি কেন! এ তো দিনেদুপুরে রীতিমতো হাইজ্যাক। আমার সামনে দিয়ে এসে আমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমার বন্ধুর প্রাণটা লুট করেছে, যদিও যমের বৃদ্ধাঙুলি বা অবয়ব-কোনটাই আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি।


একখন্ড বিস্কুট হাতে পঞ্চবর্ষীয় একটি ছেলের প্যাঁক প্যাঁক করে হাসতে হাসতে গৃহাভিমুখে প্রত্যাগমনকালে অকস্মাৎ একটি দস্যি কাক এসে তার বিস্কুটটা এক ছোঁ-তে কেড়ে নিয়ে উধাও হলে, ছেলেটি যেমনি আচম্বিত হালকা একটু চমকে ওঠে কিছুক্ষণের জন্য একেবারে নির্বাক নিথর হয়ে যায়, ইসরাফিলের প্রাণটা হরণকালে সেও তেমনি চমকে ওঠে ভেঙ্চি কেটে নিথর হয়ে গেছে। তবে বাচ্চা ছেলেটির মতন কিছুক্ষণের জন্য নয়-চিরতরে নিষ্পন্দ হয়ে গেছে তার দেহটা।


এক্ষণে ইসরাফিলের প্রাণটা বহুদিনের আশ্রয়দাতা দেহের বিরহ-ব্যথায় আজরাইলের নিষ্ঠুর হাতের মুঠোয়, বন থেকে সদ্য ধরে আনা খাঁচাবন্দি পাখির মতো ছটফট করছে কিনা জানি না। তবে আমার ভেতরের প্রাণটা ভীষণভাবে তোলপাড় করছে। দেহাভ্যন্তরকে করে দিচ্ছে ক্ষত-বিক্ষত, জৈষ্ঠ্যের আচমকা ঝুপঝাপ বৃষ্টিতে পুকুর থেকে কই মাছ ওঠে এসে তার কণ্টকময় শক্ত ধাঁরালো কান দিয়ে যেমনি ক্ষত-বিক্ষত করে দেয় নরম ভূমিকে। কেবল ইসরাফিলের মৃত্যুশোকই আমার এমন আসোয়াস্তির কারণ নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে আরো একটি মিঠেকড়া ইতিহাস যা কোন ইতিহাস গ্রন্থে লিখিত নাই-খুদিত আছে আমার অন্তরপটে।


সেবার বি.এ পরীক্ষা শেষে গ্রামের বাড়ি মেহেরনামা গিয়েছি। মেহেরনামার অধিকাংশ নিবাসীই আমার অচেনা। কেননা গ্রামের জল আর বায়ুব পরশে ন’টি বছর কাটিয়েই শহরে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলাম। বড় খালার বাসায় থেকে পড়ালেখা করি। একটা পুত্রসন্তানের আশায় একহালি কন্যা প্রসব করে আশাহত খালামণি ওকাজে ক্ষান্তি দিয়েছেন। তাই খালামণির বাসায় আমার সমাদর ছিল এভারেস্টুচুম্বী। আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম, আমি যেন গৃহের শ্রীবর্ধক বাহারি মৎস্যের অ্যাকোরিয়াম, যেটি দেখে খালা-খালুর হাড়ে বাতাস লাগে, আর আগন্তুকরাও গৃহটিকে সুখী-সমৃদ্ধ ভেবে আশ্বস্ত হন।


তখন গ্রামে আমার বাবা পার্টনারশীপ ব্যবস্থা করতেন। ধানের ব্যবস্থা। মৌসুমের সময় বাবা আর তাঁর পার্টনার লোকমান সাহেব সস্তা দামে প্রচুর ধান ক্রয় করে গুদামে মজুত করে রাখতেন। আর বাজার গরম হলে সেগুলো চওড়া দামে বিক্রি করে বেশুমার মুনাফায় পকেট ফাঁপাতেন।


একদিন কী একটা উপলক্ষে আমি বাবার সাথে লোকমান চাচার বাড়ি যাই। তখন লোকমান চাচার স্ত্রী অসুস্থ। আমাদের জন্য চা-বিস্কুট নিয়ে এল চৌদ্দ-পনের’র একটি মেয়ে। মেয়েটিকে এক পলক দেখেই আমি ভেবাছ্যাকা খেয়ে গেলাম। মনে হল, এ কোন মামুলি মেয়ে নয়-সোজা স্বর্গ থেকে প্রেরিত কোন অন্সরী। আমি নির্লজ্জের মতো হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ বাবার কণ্ঠস্বরের ধাক্কায় আমার হাঁ-টা থপ করে বন্ধ হয়ে গেল-পারুল, কেমন আছো মা?


আমি বাবার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, শুধু মা কেন?


বৌমা বলেন না।


বাড়ি ফিরে এসে আমি সবিস্ময়ে অনুধাবন করলাম, আমার মনটা আমার সঙ্গে আসেনি-পারুলদের ওখানে রয়ে গেছে। ঘুরঘুর করছে ওর চারপাশে। আমার দেহ এখানে। আর পুরা মনটা রয়ে গেছে ওখানে। তাই আমি আয়নায় প্রতিফলিত আলোর মতো অতিদ্রুত ফিরে যেতে চাইলাম আমার ফেলে আসা ব্যাকুল মনটার কাছে। কিন্তু সৌজন্য নামক একটা অদৃশ্য বস্ত্ত আছে। আর সেটা, আমি গমনোদ্যত হতেই, আমার পা-টা খপ করে ধরে ফেলল।


আমি মহাফাঁপরে পড়ে গেলাম। ভাবনা-নদীর প্রবল স্রোতে মাথাটা হাবুডুবু খাচ্ছে, কোন রাস্তায় পারুলের সান্নিধ্যে গেলে সৌজন্যের ধার ধারতে হবে না, তা ভেবে। এমনকি কোমর বেঁধে সশরীরে নেমেও গেলাম একটা নিকণ্টক রাস্তার খোঁজে। কোন মহৎ কর্মের পুণ্যে জানি না, অপকর্মের পাপে হলেও চমকাবার কিছু নেই, আমার প্রত্যাশিত রাস্তাটাও পেয়ে গেলাম, যে রাস্তা দিয়ে আমি সটান ছুটে যেতে পারব পারুলের কাছে।


যখন জ্ঞাত হলাম ইসরাফিল পারুলের অগ্রজ, তখন মহাসমারোহে অল্প সময়েই তার সাথে খাতির জমিয়ে ফেললাম। আর তার অছিলায় যখন তখন যেতে লাগলাম তাদের বাড়ি। যাওয়া-আসায় আড়চোখে দেখা, একটু একটু সম্বোধন সম্ভাষণ, শরতের আকাশে খন্ড খন্ড মেঘের মতো হালকা আর ছেঁড়া ছেঁড়া আলাপন-এসবের ওপর চড়ে পারুলের মনটাও বাগিয়ে নিলাম।


আমি ইসরাফিলের সাথে সখ্য করেছিলাম কেবল পারুলকে বাগে আনার মানসে। তখন ভাবতাম, নারী-পুরুষে যে গভীর হৃদ্যতা গড়া যায়, তা পুরুষে-পুরুষে কিংবা নারীতে-নারীতে অসম্ভব। পরে বুঝলাম, আমার ধারণা ডাহা ভুল। এখন শুধু পারুল নয়-ইসরাফিলের সঙ্গেও বেশ ক’দিন দেখা না হলে আমার খপখপানি আরম্ভ হয়ে যায়। গলাধঃকরণকৃত আহার্যগুলো ঠিকমত হজম হতে চায় না। অবশ্য এসব অশুভ লক্ষণ নয়।


কারণ দু’দিনের ব্যবধানেই যদি জলজ্যান্ত একটা বন্ধুকে বেওফার মতন ভুলে গেলাম, তবে কিসের আর বন্ধুত্ব! সৃষ্টিকর্তাকে বিস্মৃত হলে, তাঁর অবমাননা হয়। আর বন্ধুকে বিস্মৃত হলে, হয় বন্ধুত্বের অস্বীকার।


ছেলেদের আবেগ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভার মতো। ভিতরে ভিতরে টগবগ করতে থাকে। খুব সহজে বেরোয় না। আর মেয়েদের আবেগ শ্রাবণের মেঘের মতো। আকাশময় সারাক্ষণ ঘোরাঘুরি করে এবং একটু উষ্ণতার পরশ পেলেই ঝরঝর করে ঝরে পড়ে। তাই হয়তো বন্ধু হিসেবে ইসরাফিলের মনে আমার উপস্থিতি কতটুকু, তা বুঝতে পারতাম না। কিন্তু দীর্ঘ সময়ান্তরে পারুলের সাথে দেখা হলে পাঁচ-ছয় দিনের পুঞ্জীভূত অভিমানে কিংবা আবেগে সে ফুলে ফুলে কাঁদত। কান্নার কাজটা একনিষ্ঠভাবে সম্পন্ন করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলত, এতদিন আসেন নি কেন?


তার আকুলতা দেখে আমার মনটা আনন্দে কলকলিয়ে উঠত। ভেবে বড়ই পুলক বোধ করতাম, পৃথিবীতে অন্তত একটা প্রাণী আমার কথা অহর্নিশ ভাবে, তার মনটা আমার বিরহ-ব্যাথায় বেসামাল হয়ে ওঠে। পৃথিবীতে অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়ে লাভ কী, যদি না এরকম একজন সুহৃদ থাকে? আত্মচিন্তায় মগ্ন মানুষের মাঝে এক পাহাড় সম্পত্তি কুড়ানোর চেয়ে এক ফোঁটা নিখাদ বন্ধু বানানো কম প্রাপ্তি নয়।


দিন দিন নিজেকে আমার আর পাঁচজনের চেয়ে অধিকতর ভাগ্যবান মতে হতে লাগল। কিন্তু এর দুয়েক মাস পরেই ঘটল একটা অতি কদর্য ঘটনা। সত্যিই যদি ভাগ্য নামক কিছু থেকে থাকে, তবে হয়তো ভাগ্যনির্মাতা স্বয়ং ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার ভাগ্যে বদনজর দিয়েছিলেন।


সেদিন সোমবার। চারপাশের জগৎটা সারারাত দিব্যি আরামে ঘুমিয়ে সবে জেগেছে। আমি তখনো আলসেমিকে প্রশ্রয় দিয়ে মাথাটাকে নরম বালিশে চাপিয়ে রেখেছি।


আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরেই গ্রামের রাস্তা। ওখানে দাঁড়িয়ে কেউ উচ্চস্বরে কথা বললে, ঘরে বসে স্বচ্ছন্দে শোনা যায়। ওই রাস্তা থেকে বজ্র-পতনের শব্দের মতো জোরালো একটা কণ্ঠস্বর হঠাৎ আমার কানে এসে ধাক্কা মারল। কণ্ঠটা আমার সুপরিচিত। বালিশ থেকে মাথা না তুলেই লোকমান চাচার কর্কশ কণ্ঠের সজোরে বলা কথাগুলো কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। তাঁর অভিযোগ-আমার বাবা গত সন্ধ্যায় গুদাম থেকে মণ-পাঁচেক ধান গোপনে বিক্রি করে দিয়েছেন।


কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে আমি একটু নাড়াচাড়া করাতে চাইলাম। কিন্তু সেই অবসরটুকু পেলাম না। রাস্তা থেকে গোটা-চারের উত্তেজিত কণ্ঠের ধারালো আওয়াজ আমার কানে একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি দৌড়ে বেরিয়ে ওদিকে ছুটে গেলাম। ততক্ষণে তাঁদের বাকযুদ্ধ হাতে গিয়ে ভর করেছে। গ্রামের মানুষ অধিক বিচার-বিশ্লেষণের তোয়াক্কা করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাত-পাগুলোকে সমস্যা সমাধানের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়।


আমি কার পক্ষ নেব-দু’জনই তো আমার পরম পূজনীয় ব্যক্তি। তাই আমি মাঝখানে গিয়ে ঝগড়াটা চুপানোর অভিপ্রায়ে অগ্রসর হচ্ছিলাম। আমার ধারণা ছিল, আমাকে দেখে দু’জনই কিছুটা প্রশমিত হবেন। কিন্তু না, বরং জ্বলন্ত আগুনে বায়ু প্রবাহের মতো আমার উপস্থিতি উভয়ের উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দিল। আমি কাছে ঘেষতেই লোকমান চাচা আমাকে সজোরো ধাক্কা মেরে ফেলে দিলেন, আর আমার দুর্বল স্বাস্থ্যের বাবাকে ‘হারামজাদা, জোচ্চোর কোথাকার’ বলে সশব্দে ভারী একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। চড় খেয়ে বাবা গালে হাত দিয়ে থু করে থুথু ফেললেন। কিন্তু তাঁর মুখ থেকে থুথু বেরুল না-বেরুল এক দলা টকটকে লাল রক্ত। সে মুহূর্তে আমার কী হয়েছিল জানি না। আমি নিজেকে আর স্থির রাখতে পারিনি। চোখের সামনে নিজের জনককে ওভাবে মার খেতে দেখলে কার মাথাইবা ঠিক থাকে! আমি এক দৌড়ে বাড়ি গিয়ে একটা দা হাতে হাঁসফাঁস করতে করতে ফিরে এলাম। আর দা-টা উঁচিয়ে তেড়ে গেলাম লোকমান চাচার দিকে। সক্রোধে চোখ বুজে শাঁ করে চালিয়ে দিলাম তাকে লক্ষ করে। কিন্তু তিনি সুকৌশলে নিজেকে বাঁচিয়ে নিলেন। দা-টা লক্ষ্যচ্যুত হয়ে লোকমান চাচার পরিবর্তে জখম করল তাঁর এক অনুচরকে। হয়তো ঘটনা আরো ভয়াবহ হত। কিন্তু ততক্ষণে গ্রামের অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। তারা ধরাধরি করে দু’দলকে ছাড়িয়ে দু’দিকে নিয়ে গেল।


সন্ধ্যায় আমি উঠানে পায়চারি করছিলাম, আর ভাবছিলাম-আহা, মানব-সম্পর্ক কতই না ভঙুর! ক’দিন আগেও বাবা আর লোকমান চাচার অপূর্ব দহরম মহরম দেখে লোকে ঈর্ষা করত। এখন তাঁদের সেই ঈর্ষণীয় সম্বন্ধটা পরিণত হয়েছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সম্বন্ধে।


তাঁদের কথা ভাবতে গিয়ে আমার কম্পিত মনের পর্দায় চকিতে ভেসে উঠল পারুল আর ইসরাফিলের বিষণ্ণ চেহারা। পূর্বে আমার কল্পনায় হাজিরা দিত তাদের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা-বিষণ্ণ চেহারা নয়। তাহলে কি আমাদের সম্প্রীতিটাও চাপা পড়ে গেল বড়দের আগ্রাসনের তলে? আর কোনদিন কথা হবে না তাদের সঙ্গে?


ভেবে আমার ভেতরটা হু হু করে উঠল। লাঠির আঘাতে ঝনঝনিয়ে কাঁচ ভাঙার মতো আমার ভেতরটাও যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল কুঁকড়ানো দুঃখের আঘাতে। ওপরে বসে যিনি তামাশা দেখেন, তাঁকে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল-হে খোদা, বড়দের আগ্রাসনের আগুনে আমাদেরও কেন পুড়তে হয়?


যখন এসব ভেবে আত্মগ্লানির উত্তাপে ক্রমশ ঘর্মাক্ত হচ্ছিলাম, তখন কুয়াশিয়া চোখে দেখি, ইসরাফিল উত্তেজিত চেহারায় মারমুখো ভঙ্গিতে আমার দিকে ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে। তার বাবাকে মারতে চেয়েছি শুনে সে শোধ নিতে ছুটে আসছে আমরাই বাড়িতে। তার দুঃসাহস দেখে আমি বিস্মিত হলাম। হাজার হোক, সে তো আমার বন্ধু। সে যতই আঘাত করার চেষ্টা করুক, আমি প্রতিঘাত করব না-শুধুই প্রতিহত করব। তাকে প্রতিহত করার জন্য আমি ভিতরে ভিতরে প্রস্ত্তত হয়েই ছিলাম। কিন্তু সে আমার ঊষর মাথার আজগুবি ধারণাটা ভ্রান্ত করে দিয়ে আমার কাঁধে হাত রেখে কাঁপা গলায় বলল-ওয়ালিদ, তোদের সাথে নাকি বাবার ঝগড়া হয়েছিল? তোর কোথাও লাগেনি ত?


আমি মুহূর্তে নিশ্চল মাটির পুতুল হয়ে গেলাম। সহসা আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বেরোল না। একটু্ আগে যার জন্মদাতাকে আমি দা-হাতে কাটতে গিয়েছি, সে এসেছে আমি ঠিক আছি কিনা দেখতে! হৃদ্যতার এতই শক্তি! এতই মহাত্ম্য বন্ধুত্বের! অতল সমুদ্রে ডুবন্ত কোন অসহায় মানুষ তার সামনে হঠাৎ একটা গাছের গুঁড়ি দেখলে যেমনি শক্ত হাতে তা সজোরো অাঁকড়ে ধরে, আমিও তেমনি তাকে নিঃশব্দে জড়িয়ে ধরলাম। বিস্ময়ে কিংবা আবেগে আমার পা জোড়া ঠকঠক করে কাঁপছিল। আর দু’ চোখ থেকে ঝর্ণার জলধারার মতো অবিশ্রান্তভাবে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রুধারা।


এখন যদিও আমার বাবা এবং লোকমান চাচা পরস্পরের চক্ষুশূল, ইসরাফিল ও আমার সম্পর্কটা কিন্তু পূর্বের মতো অটুট রয়ে গেল। তবে প্রকাশ্যে নয়-গোপনে। আমরা গোপনে প্রায়ই দেখা করতাম। এমনকি মাঝে-মধ্যে পারুলের সামীপ্যও পেতে লাগলাম। সেও ইসরাফিলের মতো আমার বিরুদ্ধে একটা অনুযোগও তুলল না।


দু’মাস পরের কথা। একদিন ইসরাফিল আমায় ডেকে বলল-


ওয়ালিদ, চল আমরা কোথাও বেড়িয়ে আসি।


ওর প্রস্তাব শুনে আমি পুলকিত হয়ে বললাম চল। কিন্তু কোথায় যাবি?


আমাদের এখান থেকে সাফারি পার্ক তো বেশি দূরে নয়। চল সাফারি পার্ক যাই।


হুঁ, ঠিক বলেছিস। কখন যাবি?


আগামী শুক্রবারে গেলে কেমন হয়?


মন্দ হবে না।


জুমার পর আমরা বাড়ি থেকে বার হয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম সাফারি পার্কে। সবুজ ভূষণে সজ্জিত পার্কটি গ্রাম্য এলাকায় হওয়ায় সারাবছর দর্শনার্থী থাকে হাতেগোণা। তাই টিকেট বিক্রেতারা বসে বসে ঘুমানো কিংবা ঝিমানোর সময়ও পান পর্যাপ্ত। দু’ঈদে চোখে লাগার মতো দর্শনার্থী হয় বৈকি।


পার্কটিতে সবুজের বুক চিরে বানানো হয়েছে অনেকগুলো কালো রাস্তা। ওপর থেকে তাকালে মনে হয়, কে যেন নিষ্ঠুর হাতে ভোঁতা তরবারির ঘায়ে একটা মনোরম পরিপুষ্ট শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে। আমরা পার্কটির ওরকম একটি ক্ষতের উপর দিয়ে হাঁটছিলাম। আমাদের দেহধারী পাগুলো তখন অনেকটা শ্রান্ত। হাঁটার সময় আমাদের চোখগুলো ছিল শূন্যের দিকে। শ্রান্তিতে পাগুলো টলমল করছিল। দু’জন রাস্তার দু’ধারে। ইসরাফিল আমার একটু পেছনেই ছিল। মোটা শরীর নিয়ে হাঁটতে হয়তো তার কষ্ট হচ্ছিল। হঠাৎ তার ‘উহ’ শব্দে আমি পেছনে তাকালাম। এবং আশ্চর্য হয়ে দেখলাম লাউয়ের লতার মতো লিকলিকে সরু আর হালকা সবুজ বর্ণের একটা সাপ তার পায়ের নিচ থেকে সড়সড় করে ঘন জঙ্গলে ঢুকে যাচ্ছে। আমি একলাফে ইসরাফিলের কাছে গেলাম। সে ততক্ষণে পায়ে হাত দিয়ে বসে পড়েছে। আমি বিস্ফোরিত চোখে দেখলাম, পায়ের যে স্থানটি সে হাত দিয়ে চেপে ধরেছে, সেখান থেকে শিমের লতার মতো চিকন একটা রক্তের ধারা নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। আমি তড়িৎবেগে ক্ষতস্থান এবং এর ওপরের অংশটি রুমাল দিয়ে বেঁধে দিলাম। আর তার একটা হাত আমার কাঁধে ঝুলিয়ে অনেকটা টেনে-হেঁচড়ে তাকে নিয়ে গেটের দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম।


আমরা পার্কের অনেক ভিতরে চলে গিয়েছিলাম। রাস্তাগুলোও জিলাপির প্যাঁচের মতো প্যাঁচানো। তাই গেটটা ঠিক কোন্ দিকে এবং কত দূরে, তা নির্ণয় করতে পারছিলাম না। আশেপাশে কোন মানুষও চোখে পড়ছিল না। কোনরওকমে কিছুটা পথ পেছনে ফেলেছি। এমন সময় আচমকা ইসরাফিল তার হাতটা আমার কাঁধ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। আমি তাকে আবার ধরার আগেই সে মাটিতে ঢলে পড়ল এবং ক্লান্ত গলায় অস্ফুটস্বরে বলল, ওয়ালিদ...।


সে কেবল আমার নামটাই উচ্চারণ করতে পারল। আর কিছুই না।


তারপর....


তারপর সেই অন্তিম ভেঙ্চি!


একি, আমার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে না কেন! আমি কাঁদছি না কেন হাউমাউ করে! তবে কি বন্ধুর মৃত্যুশোক আমাকে স্পর্শ করে নি? কিন্তু আমি স্পষ্ট টের পাচ্ছি, অসহ্য বিষাদের একটা ঘূর্ণি যেন আমার ভেতর হু হু দাপিয়ে বেড়াচ্ছে!


আমাদের সাফারি পার্কে আসার কথা শুধু পারুলই জানে। সে হয়তো বিশ্বাস করবে-তার সহোদর সত্যিই সাপের ছোবলে মরেছে। কিন্তু তার জনক-জননী? লোকমান চাচা কি বিশ্বাস করবেন-তাঁর তনয়ের মৃত্যুতে আমার কোন হাত নেই? কয়েকমাস আগেই তো আমি তাঁকে দা নিয়ে কাটতে গিয়েছিলাম। তিনি কি আমাকে ফাঁসাতে সুযোগটা বাগিয়ে নেবেন না? আমি হয়তো চেঁচিয়ে বলব-আপনারা দেখতে পাচ্ছেন না, তার গায়ে সর্পাঘাতের চিহ্ন? তখন অসংখ্য মানুষ কি হাত নাচিয়ে আমাকে ভ্রুকুটি করে বলবে না-আরে, মনে কুটিলতা থাকলে সাপের ছোবল খাইয়ে মারা তো খুব জটিল কাজ না? যদি অপদেবতার চক্রান্তে পারুলও হঠাৎ? বেঁকে বসে? না, না, না,! না, আমার মাথায় আর কিছুই ঢুকছে না! কেবল মনে হচ্ছে, মাথার যেখানটায় মগজগুলো সজ্জিত থাকে, সেখানটায় লক্ষ সর্প তাদের বিষাক্ত ফণা তুলে অব্যক্ত আক্রোশে ছোবল মারছে।

দিনের আলো ক্ষীণ হয়ে এসেছে। উপরের সূর্যটা সারাদিন আলো আর উত্তাপ ঢেলে ক্লান্ত হয়ে শ্রান্তদেহে লাল চাদর জড়িয়ে ঘুমোতে যাচ্ছে। আর আমি এখনো কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো ইসরাফিলের নিথর মাথাটা কোলে নিয়ে বসে আছি।