মাইকেলের ইংরেজী কবিতা
অধ্যাপক বিশ্বজিৎ সিংহ, শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০১৩


মধুসূদন তরুণ বয়সে ইংরেজী চর্চা করেছেন। হিন্দু, কলেজে পড়ার সময় রিচার্ডসন সাহেবের কাছে ইংরেজী সাহিত্যের পাঠ গ্রহণ করতেন। রিচার্ডসন কবি ছিলেন। বায়রণ একালে মধুসূদনের প্রিয়তম কবি হয়ে উঠলেন। ইংরেজী সাহিত্যের রত্নভান্ডার কিশোর মধুসূদনের মনে সাহিত্য রুচির জন্ম দিয়েছিল। ইংরেজী সাহিত্য যার অবারিত অধিকার সেই মধুসূদন বাংলা কবিতা লেখার কথা ভাবতেই পারেননি। এ ভাষায় কোনো উচ্চস্তরের কাব্য রচনা সম্ভব বলে তাঁর ধারণা ছিল না। এমন কি বহু পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার উন্নততর অবস্থায় বঙ্কিমচন্দ্র Rajmohon's wife নামে ইংরেজী ভাষায় উপন্যাস লিখে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে চেয়েছিলেন।
মধুসুদন হিন্দু কলেজের শিক্ষার গুণে তরুণ বয়স থেকেই আচারে-আচরণে প্রায় সাহেব হয়ে ঊঠলেন। দেশি ধর্মসংস্থার বা পোশাক-পরিচ্ছদের প্রতি তাঁর তীব্র অনীহা জন্মেছিল। তিনি ইংরেজী পড়তেন লিখতেন। ভাবতেন ইংরেজীতে। দূর ইংলন্ডের স্বপ্নও দেখতেন। তাই ইংল্যান্ডের তটভূমির জন্যে তাঁর তরুণ হৃদয় দীর্ঘশ্বাসে আলোড়িতহ হত-
I sigh for Albion's distant shore,
Its valleys green,Its mountains high
Tho'friends,relations,I have none
In that far clime,yet oh!I sigh
To cross the vast Atlantic wave
For glory,or a namedess gave!
ইংল্যান্ডে গিয়ে তিনি মহাকবি হয়েছেন এবং এই স্বপ্নকল্পনা গৌরদাসকে লেখা তাঁর চিঠিতেই প্রকাশ পেয়েছে। ”Oh!how should I like to see you write my life',if I happen to be a great poet-which I am almost sure I shall be if I can go to England”
বন্ধু মহলে খ্যাতির জয়মাল্য লাভের নেশা প্রত্যক্ষত ইংরেজী কবিতা রচনায় তাঁকে সেই তরুণ বয়সেই নিত্য প্রেরণা জোগাত। রিচার্ডশন সাহেব নিত্য উৎসাহ দিতেন। কবি তাঁর কল্পনাসুন্দরীকে লক্ষ্য করে সকৌতুকে লিখেছিলেন
Return,before our “Monthlies”all,
The”Gleaner”-”Blossom”-”Commet”tempt
Me to scribble for them all.
সবকিছুর পেছনে ছিল তাঁর কবি মন এবং ইংরেজী ভাষায় মাতৃভাষার মত অধিকার। ফলে অল্পকালের মধ্যেই কবি অনেকগুলো কবিতা লিখে প্রশংসা অর্জন করেন।
কবির ইংরেজী কাব্যসাধনা মাদ্রাজ বাসকালেও পূর্ণবেগে চলছিল। ঐ সময় তিনি ”Rizia:Empress of india” নামে একটি পঞ্চাঙ্ক নাটকও লিখেছেন। ইংরেজী সেনটের বিদ্যালয়ে কবি পাঠ গ্রহণ করেছেন। তাঁর একটি কবিতায় সেক্সপীরিয় সনেটের আস্বাদ পাওয়া যায়
I love the beauteous infancy of day
The garlands that around its temple shine;
I love to hear the tunsful malin day
of the sweet kokil perched upon the pine:
I love to see you streamlet guily run
And blush like maiden beauty neck and fair,
When the bright beams of you refulgent sun
Crowd on her trembling bosom pure and clear
I love to see the bee from flower to flower;
Sucking the sweets, to him they smiling yield,
I love to hear the bruzes in the bower
smiging melodious, or along the field
All these I love, and Oh! in these I find
A balm to soothe the fever of my mind!
মধুসুদনের প্রকৃতি বিষয়ক কবিতাগুলো বেশীরভাগ সনেট। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মেঘাবৃত রজনীর একটি তারার প্রতি লেখা ” shine on sweet emblem of Hope's liring ray" ” প্রভাত বর্ণনামূলক ” I love the beauteous infancy of day"
সন্ধ্যার স্তুতিবিষয়ক “I saw young Zephyr pass from flower to flower” মধ্যরাত্রির ছবি ”love to see the those clouds of golden dye ” একটি হ্রদকে লক্ষ্য করে লেখা ”Beloved lake how oft I think of thee ” প্রভাত বর্ণনামূলক অপর একটি ইংরেজী কবিতায় উজ্জ্বল সূর্যালোক উদ্ভাসিত নীল আকাশের নীচে সদ্য জাগ্রত বিহঙ্গের উচ্চ আহ্বানে কবি- প্রাণের উৎসাহদৃপ্ত তারুণ্য সুন্দর প্রকাশ পেয়েছে-
The boundless heaven bathed in the brightining shower
of early sun-shine, was now fainty spread
with smiles. The lare, springing from his bed,
With lound acclaims to every grove and bower,
Did trumpet forth the Day's nativity;
কবি প্রথম বয়সে মেঘাচ্ছন্ন রাত্রির নিঃসঙ্গ তারাটিকে লক্ষ্য করে একটি কবিতা লিখেছিলেন। জীবনের দুঃখ, হতাশা সবকিছুর মধ্যেও দূর আকাশের ঐ উজ্জ্বল তারাটি আশা ও আনন্দের প্রতীক বলে কবির মনে হয়েছিল-
Shine on, sweet emblem of Hope's lingering ray!
That while the soul's bright sun shine is o'er cast,
Gleams faintly thro' the sable gloom, the last
To meet beneath Despair's dark night away!
ইংরেজি কবিতায় ঝড়ের বর্ণনা করতে গিয়ে কবি তাকে ক্রুব্ধ পুরুষ রূপে
অভিমত করেছেন-
The lightening from his eye,
The thunderbolts flashes from his hand,
His breath convulses all sky!
এই কবিতাগুলো কবির ভাবাবেগের প্রকাশমাত্র হয়ে থাকে নি, ভাষারূপে ধরা পড়েছে বলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে কবিত্বের বিচারে উত্তীর্ণ।
মধুসূদনের প্রেমবোধে প্রত্যক্ষতা ছিল। মিলনে আনন্দ, বিচ্ছেদে বেদনা, কামনা বাসনায় দেহমন প্রাণের আলোড়ন কবির প্রেমানুভূীতর বৈশিষ্ট্য। ইংরেজি কাব্য সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয়ের ফলে তিনি বোঝেছিলেন প্রেম ও প্রকৃতিই গীতি কবিতা ও সনেটের প্রধান অবলম্বন। কবি খ্যাতি লাভ করতে হলে প্রণয়গীতি রচনা অপরিহার্য। কবি তাঁর প্রেয়সিকে বিশ্ব সৌন্দর্যে ব্যাপ্ত করে দেখেছেন, যেমন-
My thoughts, my dreams are all of the,
Though absent still thou seemest near;
Thine image everywhere I see-
Thy voice in every gale I hear.
. . . . . .
What'er in this far earth I see
'Mong nature's forms that's pure and bright
Reminds me ever, love, of thee
And brings thine image to my sight.
কবির বেশির ভাগ কবিতায় হতাশার সুর প্রবল। কোথাও কল্পিতা প্রেয়সির মৃত্যু বেদনায় কবিচিত্ত দীর্ণ-
But 'tis past - like a vision of ethered ray
thou camest but to dazzle and vanish away_
A seraph forth straying from Heaven's bright bow'r.
In sun shine and glory to bless-but an hour!
কখনও বিচ্ছেদে তাঁর জীবন হতাশা ম্লান-
O! thus abandoned to despair
I've naught but grief for me;
My life a wilderness appear
Overgrown with misery!
ইংরেজিতে কবিতা লিখলেও তাঁর কাব্য প্রেরণা কৃত্রিম ছিল না। এদেশের কাহিনী, এদেশের অতি পরিচিত প্রসঙ্গ চিত্রে ধরে রাখবার প্রয়াস তিনি করেছেন।
সরোবরের বুকে মলয়পবনে পদ্মের মৃদু কম্পনের উপমাও সাগ্রহে প্রয়োগ করেছেন-
She trembled as the lily on the lake,
When the Moloya doth around soft ripples wake!
ইংরেজি ভাষা এবং এদেশীয় ভাব পরিবেশ, উপমা ও চিত্র কল্পের মধ্যে যে দ্বিধা আছে কবিকে এই সময় পর্যন্ত দ্বন্দ্ব দীর্ণ করে তোলে নি। যে দ্বন্দ্ব আত্মিক সঙ্কটের রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছে
Captive Ladie- Visions of the Past রচনার যুগে।
পিতামাতা ভাইবোনের স্নেহ ভালোবাসায় কবির চিত্ত পূর্ণ, তবুও কি এক অজানা এবং অনির্বচনীয় কারণে ইংল্যান্ডের দিকেই যেতে ইচ্ছা হয়।
Off like a sad bird i sigh
To leave this land, thou mine own land it be,
Its green robed meads- gay flowers and Clondless sky
Though passing fair, have but few charms for me.
এই ইংল্যান্ড যেন সব কামনা বাসনা বাস্তব রূপ ধারণ করেছে। স্বাধীনতার যেখানে চরম স্ফূর্তি, প্রতিভা বিকাশের অবারিত দ্বার, বিজ্ঞানের উন্নতি, মানব জাতির অফুরন্ত গৌরব, প্রকৃতির পরম শোভা-
Where man in all his truest glory lives
And natures face is exquisitely sweet.
প্রেম বিষয়ক কবিতাগুলোতে মিলন মোহাবেশের সুর বেজেছে। রমনীত্থিত সঙ্গীতে কবির চিত্তলোকে স্বপ্ন চাঞ্চল্য জেগেছে-
But lady! Sweeten's is the dream
the voice awakens in the breast,
It tells of Eden's land of beam,
Its glory and its bow'r of rest.
কিন্তু মাদ্রাজে কবি দুঃখ জয়ের সাধনায় সিদ্ধি লাভ করতে পারেন নি। দারিদ্র্যে, প্রেমলব্ধ দারিদ্র্য জীবনের ব্যর্থতায়, অতীতের স্নেহ প্রীতি স্নিগ্ধ মনোরম দিনগুলোর স্মৃতিতে প্রতিনিয়ত তিনি অন্তরে দীর্ণ হয়েছেন। জীর্ণ দল পদ্মের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য ও প্রেমের জন্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন কখনও সৌন্দর্যদূতীর আলোকপাতে ভ্রূকুটি ভরা তমিস্র পথকে উজ্জ্বল করার কামনা জানিয়েছেন-
Comest thou as one in beauty's ray
to light the starless gloom
That frowns upon the pilgrim's path
To death's domain the tomb . . .

এই বেদনা যে কত তীব্র, অন্তরের নিভৃততম অন্দর নিত্য অবক্ষয়িতের আঘাতে আঘাতে, অবসিত জীবনের সব মাধুর্য, সব আশা, ভবিষ্যতের সব স্বপ্ন-
Richard! there is a grief which can feel;
It cuts into the bosom's deepset care,
And with unwearied fingers aye dothsteal
Its summer gladness and its faery store
Of hopes and aspirations.

কবি যেন অজ্ঞাতবাস থেকে মুক্তির আলোয় এসে দাঁড়ালেন। বাংলা সাহিত্যে তখনও প্রবেশাধিকার ঘটে নি। মানস শূন্যতার এই অবস্থায় ইংরেজি অনুবাদ করেন ‘রত্নাবলী’। তারপরেই সাহিত্য সাধনার যুগে কবির নাট্য রচনা ‘শর্মিষ্টারও ইংরেজি অনুবাদ করেন। এ আগ্রহ তাঁর বেশিদিন ছিল না। ইংরেজি কাব্য সৃষ্টির রাজ্য থেকে বিদায় নিয়ে কবির কাব্যপ্রাণ বাংলা ভাষার পথ ধরে বিকশিত হয়ে উঠেছিল।