বাঁকা দুই নয়নে নিশার অনন্ত রূপ
তিতাশ চৌধুরী, শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০১৩


হাছন রাজা শাব্দিক অর্থেই মরমী ছিলেন। তিনি চিন্তা ও প্রতিভায়, ধ্যানে ও কল্পনায় এবং রূপে ও রঙে মরমীবাদের জয়গান গেয়েছিলেন। মরমীবাদে পৌঁছতে তাঁকে প্রথমেই প্রেমনগর অতিক্রম করতে হয়েছিল। প্রেমের মধ্য দিয়েই তিনি মরমীবাদকে স্পর্শ করেছিলেন। তাঁর মানবপ্রেম এবং ঈশ্বরপ্রেম এক সময় এক বিন্দুতে এসে একাকার হয়ে যায়। সেখানে তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সেখানেই তিনি মরমী, মরমী কবি। তাঁর জীবন পর্যালোচনায় এ-সত্য আবিষ্কার সম্ভব। হাছন রাজার জন্ম ২৪ জানুয়ারি ১৮৮৫ সালে সুনামগঞ্জ শহরের সংলগ্ন লক্ষণছিরি গ্রামের প্রসিদ্ধ জমিদার বংশে। তাঁর পূর্বপুরুষ ক্ষত্রিয় হিন্দু ছিলেন। হাছন রাজার পিতা আলী রাজা ছিলেন বিরাট জমিদারীর মালিক। হাছন রাজা উচ্চ শিক্ষালাভের সুযোগ পান নি। অর্থাৎ প্রভাত কুমার শর্মার কথায়, ‘বাংলার সেই মধ্যযুগে এতুদ্দেশে শিক্ষার প্রচার না হওয়ায় তাঁর শিক্ষার প্রতি তখন কোনো মনোযোগই দেয়া হয়নি। কিন্তু বনের ফুলের যেমন মালীর হাতের সেবার অপেক্ষা না রেখে আপন মত বর্ণগন্ধে ভরে ওঠে, শিক্ষা-অভাবের মধ্যে তেমনি এই বাউল কবির চিত্ত বৈরাগ্য ও প্রেমের আলোকে এক রমণীয় বন্য সৌন্দর্যে বিকশিত হয়ে উঠেছিল। হীরক খন্ড যখন ভূ-গর্ভ থেকে প্রথম খুঁজে তোলা হয় তখন তার বহিরাবরণ নিতান্তই মাটির মতো। তারপর তাকে কেটেছেঁটে যখন্একটি বিশিষ্ট আকার দেয়া হয় তখন তার ভেতরের মূর্তিটি আত্মপ্রকাশ করে। তখন তা লক্ষ লক্ষ টাকা মূল্যের লোভনীয় বস্ত্ত হয়ে দাঁড়ায়। হাছন রাজাও তেমনি স্বভাব তাঁকে যেমন অন্তরের ঐশ্বর্য তেমনি দেহের ঐশ্বর্য মুক্তহস্তে দান করেছিল। চার হাত উঁচু দেহ, দীর্ঘ বাহু, ধারাল নাক, তীক্ষ্ণ পিঙ্গল চোখ এবং তাঁর কোকড়ানো চুল ছিল।’ তিনি সিলেটের আঞ্চলিক তথা উপ-ভাষায় সঙ্গীত রচনা করেন। তাঁর সঙ্গীতের অনেক স্থানে তার হিন্দু পূর্বপুরুষের ধ্যান-ধারণা একবারে দুর্লক্ষ্য ছিল না। তবে তাঁর সঙ্গীতে কিংবা গানে সেইসব হিন্দু ধ্যান-ধারণার কথাই এসেছে যেগুলি গানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যেমন রাধাকৃষ্ণের গান বা এ জাতীয় সঙ্গীত।
হাছন রাজার কবিতাগুলিতে চিন্তার তিনটি স্তর লক্ষ করা যায়। যেমন : এক, প্রেম, দুই-বৈরাগ্য এবং তিন দার্শনিকতা। তাঁকে বুঝতে হলে এই তিনটি স্তর উপলব্ধিতে আনা দরকার। প্রথমত হাছন রাজা এই বিশ্ব সংসারে প্রেমের কারবারী ছিলেন। প্রেমই ছিল তার মূলধন। প্রেম বিনে তিনি অন্যকিছু চিন্তা করতে পারতেন বলে মনে হয়না। যেমন তিনি বলেন:
প্রীরিতের মানুষ যারা
আউলা-ঝাউলা হয় যে তারা।
এর সঙ্গে শেক্সপীয়রও তুলনীয়। যেমন :
The Lunatic, the Lover and The poet
Are of imagination all compact
’প্রেমে পড়লে মানুষ আউলা-ঝাউলা হতে বাধ্য। তার তখন দিকবিদিক জ্ঞান থাকে না। এটি একটি নেশার মতো- একটি অলৌকিক শক্তি। যেমন:
নিশা লাগিলরে বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলরে
হাছন রাজা পিয়ারির প্রেমে মজিলরে
.............................................
ছটপট করে হাছন দেখিয়া চান্দমুখ
হাছন জানের মুখ দেখিয়া জনমের গেল দুঃখ
হাছন জানের রূপটা দেখি ফালদি ফালদি উঠে
চিড়া বারা হাছন রাজা বুকের মাঝে কুটে।
আত্মহারা বন্ধু চেনা দেখে প্রতি মুহূর্তে মন উচাটন হয়ে উঠেছে, মনে উথাল পাতাল ঢেউ জেগেছে। মন তাঁর চুরি গেছে। তাই আক্ষেপ:
এসো সুন্দর দিদি শুনিয়া মাগো
প্রাণবন্ধু, কোথায় আছে বলিয়া মোরে দেগো
না হেরিয়া বন্ধু মম হইয়াছি মৃত সম
এখন কি করি করি গো।
করিয়া আমার মন চুরি কোথা গেল প্রাণহরি
ধরতে না যায় ধরা কেমনে তারে ধরি গো
হাছন রাজা বলে দিদি, মনকে আমি কত সাধি
মন হইয়াছে বিবাদী- সে বিনে মানে না গো।
প্রেমিক না হলে প্রেমের মর্ম কেউ বুঝতে পারে না। আগেই বলেছি, প্রেমিকজন একটু আউলা-ঝাউলাই থাকে। তাদের নিগূঢ় কথা যুক্তি-তর্কের মরুবালুতে ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু তা প্রেমিকের অগোচর থাকে না। অপ্রেমিকগণ এ সত্যের ধার ধারে না। যেমন:
অপ্রেমিকে গান শুনিলে কিছু মাত্র বুঝবে না।
কানার হাতে সোনা দিলে লাল-ধলা চিনবে না।
হাছন রাজা কছম দেয় আর দেয় মানা
আমার গান শুনবেনা যার প্রেম নাই জানা।
পৃথিবীতে কেবল বিরহীর দুঃখ বিরহীই বুঝতে পারে। বিরহিণী রাধিকার দুঃখ বিরহী হাছন রাজা ঠিকই হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন। যেমন-
প্রেমের প্রেমিক যেইজনা জানবে তার বেদনা।
অপ্রেমিক জানবে কিসে চৌক থাকিতে কানা গো।।
হাছন রাজা কামুন করে দেখিয়া রাধার দুঃখ।
রাধার দুঃখে হাছন রাজার ফাটিয়া যায় বুক গো।।
প্রেমের এমনি ঐন্দ্রজালিক শক্তি যে তা প্রেমিককে মুহূর্তেই অন্ধ করে দেয়, দিওয়ানা ও পাগল মুহূর্তেই অন্ধ করে দেয়। দিওয়ানা ও পাগল করে তোলে এবং প্রেমিকের রূপের ঝলকে ফানা হয়ে যায়। হাছন রাজা প্রেমিকের সেই জাদুকরি মোহে পড়ে গান বাঁধতে থাকেন। যেমন :
সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইল
দেওয়ানা বানাইল মোরে, পাগল করিল।
আরে না জানি কি মন্ত্র পড়িয়ে যাদু করিল।
কিনা ক্ষণে হইল আমার তার সঙ্গে দেখা।
অংশীদার নাইরে তার সেত হয় একা ।।
রঙে ঝলক দেখিয়ে তার আমি হইলাম ফানা।
সে অবধি লাগল আমার শ্যাম পীরিতের টানা ।।
হাছন রাজা হইল পাগল, লোকের হইল জানা।
নাচে নাচে, ফালায় ফালায় আর গায় গান।।
প্রাণের বন্ধুর অভাবে হাসান রাজার গায়ে আগুন লেগে যায়। সে আগুন নেভানো সহজসাধ্য নয়- যতক্ষণ না প্রাণের বন্ধুকে খুঁজে না পাওয়া যায়।
প্রেমের আগুন লাগল রে, হাসন রাজার অঙ্গে।
নিভে না আগুন ডুবলে সুরমা গাঙে।।
ধা ধা করি জ্বলছে আগুন কিসে কি করেঙ্গে।
আনিয়া দে গো প্রাণের বন্ধেরে গলেতে ধরেঙ্গে।।
হাছন রাজা বন্ধু বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে।
বন্ধুর আশায় নাচে হাসন, প্রেমের তরঙ্গে।।
হাছন রাজা বলে আমি,- যাইমু বন্ধের সঙ্গে।
আমিত্ব ছাড়িয়া দিয়া মিশব তার সঙ্গে।।
অন্যদিকে, হাছন রাজা প্রাণের বন্দের বিরুদ্ধে অভিযোগ বন্ধে কেন তাকে ভালোবাসে না। ছয় মাসে নয় মাসে একদিনও আসে না। কত কাকুতি-মিনতি করেন, তবু অন্যের ঘরে চলে যায়। তাই তার আকাশছোঁয়া দুঃখ। তবু বন্দে বিনে চলবে না তার জীবন।
বন্দে কেন আমায় ভালোবাসে না।
ছয় মাসে নয় মাসে একদিনও আসে না।।
আমি বলি আইস তারে সে তো যায় গিয়া পরের ঘরে।
কাকুতি মিনতি করি আমার ঘরে বসে না।।
কপালে মোর কি যে লেখা লেখিয়াছে প্রাণসখা।
দিয়ে দেখা আয়না কাছে প্রাণ মোর বাঁচে না।।
হাছন রাজা কান্দিয়ে বলে আবার আসলে ধরব গলে।
তুলিয়ে লইব প্রিয় কোলে, ছাড়িয়া দিব না।।
হাছন রাজার গানে শুধু প্রেম নয়, বৈরাগ্য ও দার্শনিকগত স্পর্শ করেছে। হাছন রাজা যেমন কোনো লেখাপড়াই করেন নি। সুযোগও ছিল না। তা সত্ত্বেও তার মাঝে যে সত্য ও সুন্দর লক্ষ করা যায়-তা এককথায় অসাধারণ। তিনি অশিক্ষিত হয়েও অধ্যাত্মমূলক যে সব গান বেঁধেছেন-তা এ্কজন শিক্ষিত স্বভাব কবির পক্ষেও সম্ভব নয়। হাছন রাজার গান আলৌকিকতা ও ঐন্দ্রজালিকতার স্পর্শে সোনা হয়ে ফলেছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে তা চেনা সম্ভব নয়। অধ্যাত্ম লোককবির পক্ষেই এ ধরনের বৈরাগ্য ও দার্শনিকতামূলক গান রচনা অনেকটা সহজ। যেমন হাছন রাজা-তিনি মেধা ও মনন, চিন্তা ও প্রতিভার জাদুকরি স্পর্শে যেসব গান সৃষ্টি করেছেন- তা এক কথায় অপূর্ব। প্রায় প্রতিটি গানই চিন্তামূলক এবং দিগন্ত স্পর্শ। সেই চিন্তায় ঢুকে পড়েছে প্রেম, বৈরাগ্য ও দর্শন। এই তিনের সমন্বয়ে হাছন রাজা সৃষ্টি করেছেন গানের এক অলৌকিক জগৎ। সে জগতে রবীন্দ্রনাথও ঢুকে পড়েছিলেন। তার কাব্যপ্রতিভা ও জীবন দর্শনে মুগ্ধ হয়ে ১৯২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর কোলকাতার সিনেট হলে অনুষ্ঠিত ভারতীয় দার্শনিক কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাছন রাজার সাহিত্যকর্ম ও দর্শন বড় তত্ত্ব পাই। সেটি এই যে, ব্যক্তি স্বরূপের সাহিত্য সম্বন্ধ সূত্রই বিশ্বসত্য। তিনি গাইলেন:
মম অাঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন
মম কর্ণে পয়দা হইছে মোহাম্মদী দীন।
শরীরে করিল পায়দা শক্ত আর নরম
আর পয়দা করিরাজে ঠান্ডা আর গরম
নাকে পয়দা করিয়াছে খোশবয় আর বদবয়
আমি হইতে সব উৎপত্তি হাছন রাজায় কয়।
এই সাধক কবি দেখিতেছেন যে, শাশ্বত পুরুষ তাঁহারই ভিতর হইতে বাহির হইয়া তাঁহার নয়ন পথে আবির্ভূত হইলেন। বৈদিক ঋষি এমনিভাবে বলিয়াছেন যে, যে-পুরুষ তাঁহার মধ্যে তিনিই আদিত্যমন্ডলে অধিষ্ঠিত।
‘রূপ দেখিলাম রে নয়নে আপনার রূপ দেখিলাম রে
আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল আমারে।’
রবীন্দ্রনাথ উপর্যুক্ত গান দুটির অনুবাদসহ মূল ভাষণ দিয়েছিলেন ইংরেজি ভাষায় এবং প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৬ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় ‘বিশ্বভারতী কোয়াটারলি’ ও ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায়। তার অনুমোদিত বাংলা ভাষান্তর প্রকাশিত হয়েছিল মাঘ ১৩৩২ সংখ্যা ‘প্রবাসী’ ও ‘বঙ্গবাণী’ মাসিক পত্রিকায়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত হিবার্ট লেকচারেও রবীন্দ্রনাথ হাছন রাজার কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেই থেকেই প্রকৃতপক্ষে সুধী সমাজে হাছন রাজা সম্পর্কে আগ্রহ অনুসন্ধিৎসা দেখা দেয়। অনেকেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়।
হাছন রাজা বাউল। দেহতত্ত্ব এবং আরো হরেক রকম অধ্যাত্মগানের কারবারী ছিলেন। অতি সাধারণ গেঁয়ো কথা তাঁর হাতে পড়ে শিল্পরূপ ধারণ করেছে। হাছন রাজা গানের উপমা-উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, রূপক প্রতীক তাঁর জীবনের চারপাশ থেকে সংগ্রহ করেছেন। সহজ কথাকে তিনি রূপকে কিংবা উপমা উৎপ্রেক্ষায় এমনভাবে প্রকাশ করেছেন- শিক্ষিত কোনো কবির পক্ষেও তা স্পর্শ করা কঠিন। হাছন রাজা যখন তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে দেহতত্ত্বের গান করেন পিঞ্জিরা কিংবা ময়না পাখীর রূপক কিংবা প্রতীকে তখনও আমরা অবাক না হয়ে পারি না।যেমন :মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে।
কান্দে হাছন রাজার মন মনিয়া রে।।
মায়ে-বাপে বন্দী কইলা, খুশীর মাঝারে।
লালে-ধলায় বন্দী হইলাম পিঞ্জিরার মাঝারে।।
উড়িয়া যায়রে ময়না পাখী, পিঞ্জিরায় হইল বন্দী।
মায়ে-বাপে লাগাইলা, মায়াজালের আন্ধি।।
পিঞ্জিরায় সামাইয়া ময়নায় ছটফট করে।
মজবুত পিঞ্জিরায় ময়নায় ভাঙ্গিতে না পারে।।
হাছন রাজায় ডাকব তখন ময়না আয়রে আয়।
এমন নিষ্ঠুর ময়নায়, আর কি ফিরিয়া চায়।।
হাছন রাজার বাড়ি-ঘর ভাল ছিল না। লোকে তাই নিয়ে বলাবলি করত। তাতে হাছন রাজা বলেন- বিদেশে দালানকোঠা তৈরি করে কি হবে? শূন্যের মধ্যে রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করে কি লাভ? হঠাৎ কোন্দিন কোন্ মুহূর্তে এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে তা কে জানে? যদি জানতাম এখানে কয়দিন থাকব, তা না হয় একখানি সুন্দর করে প্রাসাদ তৈরি করতাম, কিন্তু হায়, জীবন যে পদ্মপাতার নীড়। তাসের ঘরের মতো কখন উড়ে যায় তার নেই কোনো ঠিক। এদিকে চুলে পাক ধরেছে। কানের কাছে ঘণ্টা বাজছে। চলে যাবার আর দেরি নেই।
লোকে বলে লোকে বলেরে, ঘরবাড়ী ভাল না আমার।
কি ঘর বানাইব আমি শূন্যের মাঝার
ভালা করি ঘর বানাইয়া কয়দিন থাকব আর।
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার।
এই ভাবিয়া হাছন রাজায় ঘার-দুয়ার না বান্ধে।
কোথায় নিয়া রাখব আল্লাহ্য় এর লাগিয়া কান্দে।।
হাছন রাজা বুঝতো যদি বাঁচব কতদিন।
দালানকোঠা বানাইত করিয়া রঙিন।।
এই গান&&ট একটি সত্য গল্প-নির্ভর কিংবা ঘটনা-নির্ভর। একবার কয়জন বিদেশী ভদ্রলোক এখানে এসে তার বাড়ি দেখতে যান। বাড়ির সামনেই হাছন রাজার সঙ্গে দেখা। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন- আপনারা কি চান? বিদেশীরা তাকে না চিনে বললেন, ‘আমরা হাছন রাজা সাহেবের বাড়ি দেখতে এসেছি।’ মরমী কবি অতি আগ্রহের সঙ্গে বললেন, ‘আসুন, আসুন, আমি আপনাদের তার বাড়ি দেখিয়ে দিচ্ছি।’ এই বলে তাদের একটি মাঠের পাশে নিয়ে গেলেন। সেখানে তাঁর কবর তৈরি হচ্ছিল। সেই চিরদিনকার বাড়ির দিকে অঙুলি নির্দেশ করে বললেন, ‘অই দেখুন আমার বাড়ি’।
মাঝে মাঝে মরমী কবিগণ রাবেয়া বসরীর মতোন আল্লাহকেই কেবল
পাবার আকাঙ্ক্ষা করেন। যেমন হাছন রাজা করেছেন। হাছন রাজা আল্লাহর সঙ্গেই যেতে চেয়েছেন। আল্লাহ ব্যতিরেকে অন্য কেউর সঙ্গ তিনি কামনা করেন না। আল্লাহকে পেলেই তার সবকিছু পাওয়া হয়ে যায়। এ সত্যটিকে তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন তার গানে।
আমি যাইমুরে যাইমুরে আল্লাহ্র সঙ্গে।
ও আমি যাইমুরে যাইমুরে আল্লাহ্র সঙ্গে।।
হাছন রাজায় আল্লাহ্ বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে।
আল্লাহর রূপ দেখিয়ে হাছন রাজা, হইয়াছে জানা।
নাচিয়ে নাচিয়ে হাছন রাজায় গাইতেছে গানা।।
আল্লাহ্র রূপ, আল্লাহ্র রঙ্গ, আল্লাহ্রও ছবি।
নূরের বদন আল্লাহ্র কি কব তার খুবি।।
হাছন রাজা দিলের চক্ষে আল্লাহ্কে দেখিয়া।
নাচে নাচে হাছন রাজা প্রেমমাতয়াল হইয়া।।
রূপের ভঙ্গী দেখিয়া হাছন রাজা হইছে ফানা
শুনেনা রে হাছন রাজায়, মুল্লা-মুন্সির মানা।।
আল্লাহ্ কিংবা দয়াময় ভিন্ন তিনি অর্থাৎ হাছন রাজা কিছুই নন্। তাকে বিনে কিছুই দেখার উপায় নেই। তিনি অন্তরে-বাহিরে সর্বত্র বিরাজমান, তিনি প্রেমময়। তুমিই আমি আমিই তুমি। অর্থাৎ এক আধারে দুজনার সহবাস। এই আনন্দে আজ আমি উন্মাদ হয়ে নাচি। এ বিশ্ব কেবল তুমিময়।
‘হাছন রাজায় কয়’ আমি কিছু নয়রে। আমি কিছু নয়।
অন্তরে-বাহিরে দেখি (কেবল) দয়াময়।।
প্রেমেরি বাজারে হাসন রাজা, হইয়াছে লয়।
তুমি বিনে হাছন রাজার, কিছু না দেখয়।।
প্রেম জ্বালায় জ্বলি-মইলাম আর নাহি সয়।
তুমি আমি, আমি তুমি ছাড়িয়াছি ভয়।
উন্মাদ হইয়া হাছন, নাচন করয়।।
প্রিয়ার রূপে মিলে যাবার যার ইচ্ছে-তার অন্যকিছু কাম্য হতে পারে না।