বৌমার অচেনা বন্দরে
শরীফা বুলবুল, শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০১৩


বৌমার সঙ্গে আমার খেলাটা জমে উঠেছে চাচার তাবলিগে যাওয়ার পর। একটা নেশা বটে বৌমা, হেরোইনের চেয়েও মারাত্মক এ নেশা! অথচ চাচা রহমত চৌধুরী বেরহমের এমন নেশা ফেলে কেন যে দূর-দূরান্তে তাবলিগে যায় আমি বুঝি না! এমন সুন্দর আমার বৌমা, দেখলেই নেশা ধরে যায়। পূর্ণ যৌবন তার। গভীর টানা টানা মায়াবি চোখ। ভীষণ ঘোরলাগা সে চোখ। যে চোখের দরজায় খেলা করে অনেক বর্ণিল এক সূর্যোদয়! ঘন দু’চোখের পাপড়ি। ঘনকালো দীঘল চুল। কোমল মায়াবি দুটো হাত। পায়ের পাতায় গোলাপি আভার আভাস। কেউ যেন হালকা করে আলতা এঁকে দিয়েছে ওই দুটো পায়ে! যেনো ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য...!’ টান টান বুক। চিবুকের নীচে দারুণ একটা তিল, তিলের জন্য সমরখন্দ নাকি রাজ্য ত্যাগ করেছিলেনা! আমি বৌমার ঐ চিবুকের নীচে তিলের জন্য জীবন দিতে পারি। অমল যৌবন আমার উজাড় করে দিতে পারি! এমন সুন্দরের জন্য কে-না উজাড় হবে? আহ নেশা। মৃত্যুর নেশা ! সারা অঙ্গে তার যৌবনের আগুন জ্বলে ! যে আগুনে পুড়ে যাই পুড়ে যাই পুড়ে যাই...।
আমাদের যৌথ পরিবার। কোনোকিছুতে তাই আমাদের খুব একটা রাখঢাক নেই। শিষ্টাচার কিংবা সভ্যতাবোধ সবার মাঝে যদিও বেশ টনটনে। একধরনের ঐতিহ্যের অহংকারে আমাদের মাটিতে পা পড়ে না। সে আমাদের রক্তগত ব্যাপার। চুলোয় যাক রক্ত। ওসবে আমার কিছু আসে যায় না। বৌমাকে আমার চাই। বৌমার টান টান বুক দেখলেই যে আমার নেশা ধরে যায়। মনকে আমি কতো শাসন করি। কিন্তু মন যে মানে না। আমাদের পরিবারে রাখঢাক নেই, যার যেখানে ইচ্ছে শুয়ে পড়ি, আড্ডায় কাটিয়ে দেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যে আড্ডায় সংসদ থেকে শুরু করে রাজপথের খবরও বাদ যায় না। যাকে বলে ফ্রি অ্যান্ড ফ্র্যাংক! আমাদের পরিবারে বয়ে যায় সারাক্ষণ আনন্দের ঝর্নাধারা। এমন আনন্দ অনেক পরিবার থেকে উঠে যাচ্ছে।
জৈষ্ঠের গরমে চারদিক হাঁসফাস করছে মানুষ। গরমের উত্তাপে পারছে না শরীর থেকে কাপড় ফেলে দিতে। আমি শুয়ে আছি বারান্দার একপাশের খাটে। মধ্যরাতে একটু হাঁসফাস কমে যাওয়ায় সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। সারা বাড়িতে নেমে এলো একধরণের কবরের নীরবতা। আমি চুপচাপ অন্ধকারে এপাশ ওপাশ করছি। দেখি একটি ছায়া আমার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। আরো কাছাকাছি আসার পর স্পষ্ট হলো বৌমার উপস্থিতি। কাছে এসে বললেন, খুব গরম লাগছে তাই না ? হাই তুলে বলি, হ্যাঁ, ঘুম আসছে না বৌমা! বৌমা বলেন, চল আমার খাটে, দক্ষিণের খোলা জানালা দিয়ে ফুরফুরে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে, শুলেই ঘুম চলে আসবে! আমি চমকে উঠি। আমি চঞ্চল হয়ে উঠি। আনন্দে আমার চোখ দুটো বুজে আসছে! আমার ভেতরটা আনন্দে নেচে ওঠে! আমার ভেতরে যেন সেই কবিতাটি বার বার ধ্বনিত হতে লাগলো ‘গলায় ফুলের মালা হাতে মদ, প্রেয়সী এসেছে আমার সকাশ, এমন মধুর দিনে মনে হয়, রাজাও আমার কাছে ক্রীতদাস’ আমি উচ্চবাচ্য না করে বৌমার পিছু পিছু তার খাটে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। চমৎকার ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। জানালার পাশে কামিনীর চাপা গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে এক ধরনের মিষ্টি øিগ্ধতা। আমার ঘুম আসে না ফুলের গন্ধে, বৌমার গভীর ঘনকালো চুলের গন্ধে, বৌমার শরীরের অন্যরকম মিষ্টি গন্ধে। বৌমা বলে আয় আরো কাছে আয়...। আমি কাছে যেতে যেতে বৌমার ভেতরে ঢুকে যেতে থাকি ঝড়ের মতো! ঢুকে যেতে থাকি নারী দেহের এক অচেনা বন্দরে! যে বন্দর এতোদিন পর আমার কাছে অনাবিস্কৃত ছিল!
আমি বৌমার বুকের ভেতরে মুখ লুকিয়ে রাখি, আমি বৌমার মুখে মুখ রেখে গভীর চুম্বনে হারিয়ে যেতে থাকি। হারিয়ে যেতে থাকি বৌমার ঘনকালো চুলের অরণ্যে। হারিয়ে যেতে থাকি গভীর আলিঙ্গনে! এরপর থেকে সবকিছু আমার অন্যরকম এলোমেলো হয়ে যায়! আমি যেখানে যাই- আমার চোখে ভেসে ওঠে বৌমার মুখ। কখনও সকালের কিশোরী রোদের মতো মিস্টি, চেরী গাছের মতো যে মুখ রঙিন হয়ে থাকে। তীক্ষè বাঁশপাতার মতো ওই শরীর। পিপাসিত দুটো ঠোঁট। নরম ওষ্ঠের সুগন্ধ। চারপাশ জুড়ে তার অফুরান মহুয়ার বন! যেখানে অজানা এক বৃষ্টির ঘ্রাণে জেগে ওঠে স্বপ্নের ঘর। আমি যেখানে যাই বৌমার দুটো চোখ আমাকে যেন অনুসরন করতে থাকে গোয়েন্দার মতো। নীলাভ আগুনের মতো আমাকে নীল করে তোলে। আমাকে উড়িয়ে নেয় রাঙা স্তব্ধতায়। বৌমার হাসিতে মাজেন্টা বোগেনভিলিয়ায় মজে যাওয়া রোদ যেন ঝলসে ওঠে! বৌমার নেশায় দিনভর আমি রাতের জন্য অধীর অপেক্ষায় ছটফট করে মরি। কামনার সুপ্ত পরমানু স্পর্শ তাপে যেন ঘটবে তুমুল বিষ্ফোরণ। অফিসে আমার মন বসে না। বৌমার নেশায় আমি পাগলপ্রায়।
সি আর বি’র আমি একজন মাঝারি কর্মকর্তা। সরকারি অফিসে চাকরি করলেই কী, না করলেই বা কী, হাজিরা খাতায় সই করেই দায়িত্ব শেষ। তার ওপর আমি ইউনিয়নের নেতা, আমি চেয়ারে না বসলেও আমাকে কিছু বলার তেমন সাহস কোনো বাপের বেটারই নেই! নেতাদের সবাই সমীহ করে, ভয় করে, খাতির করে। আমিও এর বাইরে নই। অফিসের কতো যুবতী মেয়েকে প্রেমের ভাণ ধরে চটকে দিয়েছি কেউ রা-ও করে না। হ্যান্ডসাম যুবক বলে আমার প্রতি ওদের এক ধরনের মোহ। তার উপর নেতা। ওদের চোখের ঝিলিক দেখে বুঝতে পারি। এই মোহটুকু কাজে লাগাতে দোষ কী? তবু বৌমার মোহ অন্যরকম। বৌমার সুখ অন্যরকম। কী যেনো আছে বৌমার মাঝে ! বৌমা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলে আমি অন্যমানুষ হয়ে যাই। আহা কী তার স্বাদ বুঝি না। আমি যেন বদলে বদলে যাই।
আমার বৌমার দু’কন্যা, এক ছেলে; আবারও পোয়াতী হয়েছে। বছরে বছরে বাচ্চা পয়দা করারই নাম সংসার-বেকুব রহমত চাচার ধারণা। শালার পুত একটা আহম্মক। ঘরে এমন কচি ডাবের পানির মতো বৌ রেখে কেউ তাবলিগে বাইর হয়! তার কথা হচ্ছে বৌ-বাচ্চা জাহান্নামে যাক আগে আল্লার পথ পরিষ্কার করতে হবে, তারপর দুনিয়াদারী। রহমতের এমন বেরহম কথাবার্তায় বৌমা আমার চোখের জলে ভেসে যায়। আমি বেশ সুখ পাই। মনে মনে বলি, শালা সীমান্তের ঐ পাড়ে চলে যাক বছরের পর বছর...। সেখানে গিয়ে কপাল ঘষুক আল্লার নামে। আটখুরা হয়ে আসুক চেহারা সুরতে। বৌমার একটা কন্যা হয়েছে। দেখতে অবিকল আমারই আদল ! বাড়ির সবাই আহলাদে আটখানা হয়ে বলে, দেখ আনসারÑ খুশির বোনটা এক্কেবারে তোর মতো ! হবে নাই বা কেন একই বংশের রক্তই তো। রক্ত না ছাই, মনে মনে বলি, আমার বাচ্চাই তো ওটা। আমার মতো হবে না তো আহাম্মক রহমইত্যার মতো হবে নাকি ? রক্ত বটে। আমারই রক্ত। আমার আর বৌমার আনন্দের ফসল। আনন্দে আমার ভেতরটা শির শির করছে। এ আনন্দের সুখ একমাত্র আমি ও বৌমা ছাড়া পৃথিবীর আর কেউ কোনোদিন জানবে না! আমাদের প্রতিদিনের যৌথ সুখের ফসল। আমি এক অপ্রকাশিত কুমার পিতা! যেমন হয় কুমারী মাতা! বিশ্রী এক অভিজ্ঞতা। এর সব দায়ভার মেয়েদেরই একাকী বহন করতে হয় কেন? অথচ দু’জনেই তো সমান দোষী, যদি এতে দোষ হয় মেয়েদেরই। সামাজিকতার নামে মেয়েদের উপরই দোষ চাপানোর অজুহাত। ফালতু সব সেন্টিমেন্ট।
বৌমার বড় মেয়ে খুশি বেশ সুন্দর। পাকা কামরাঙার মতো তীব্র অভিমানে প্রেম প্রেম ভাব নিয়ে লুকোচুরি খেলতে চায় আমার সঙ্গে। আমি ইচ্ছে করে খেলি না। খুব শান্ত ধীর স্থির ওর চালচলন। বেশ চুপচাপ। খুব ঘোরলাগা ওর চাহনী। আমি ওই ঘোরের মধ্যে মাঝে মাঝে হাবুডুবু খাই! ওর মুখ দেখে আমি পড়তে পারি ওর না বলা কথাগুলো। আমি খুশিকে ভালোবাসি। কিন্তু ওকে আমি বৌমার মতো কচলাতে চাইনা; খুশি আমার কাছে বৌমার পোশাকে আসুক আমি চাইনা। .....আমি ওর সাথে বৌমার মতো লুকোচুরি খেলতে চাই না। বৌমার সুঘ্রাণমাখা শরীরের ঐ বন্দরে ঘুরতে চাই। খুশি আমার প্রাণের কাছের বিপুলা পৃথিবী। খুশি আমার বিনিদ্র রাত্রির সহচর। ওর জন্য বুকের ভেতর আমি একধরনের মায়া অনুভব করি, একধরনের পবিত্রতা আছে ওর অবয়বজুড়ে। একধরনের চোরা টান। ঠিক বোঝাতে পারবো না বুকের কোনখানে তার অস্তিত্ব! আমি ওকে বৌমার মতো ছুঁতে চাই না। ছুঁয়ে ফেললে ও বাসি হয়ে যাবে, ও যে মলিন হয়ে যাবে। ওকে আমি অমলিন দেখতে চাই। ওকে আমি কিছুতেই নোংরা করবো না। খুশি ভালোবেসে কষ্ট পাক, অভিমানে মরে যাক, সে খুশির ব্যাপার-প্রেমের ভাণ ধরে খুশিকে আমার কলেজের বারান্দায় চঞ্চল হরিণীর মতো আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে দেখলে এবার আমি কড়াভাবে জানিয়ে দেবো-সে যেনো অমন করে আমার দিকে না তাকায়, আমি যে বৌমার ঐ নিষিদ্ধ আঙ্গিনা থেকে আমাকে ফেরাতে পারবো না।

চমৎকার রেজাল্ট নিয়ে ডিগ্রী পাশ করার পর পরই রহমত চাচার এক তাবলিগ ভাইয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ রেলওয়েতে ছোটোখাটো চাকরিটা পেয়ে গেলাম অনেকটা লটারী জেতার মতোই। শুরু হলো নতুন জীবন। খাল কেটে কুমীর আনা একেই বলে বুঝি ! আমার জন্য রহমত চাচার কতো রহমত ! তার বৌয়ের সাথে হেসে খেলে জীবনটা আমার একেবারে টইটম্বুর। জীবনের পরম পাওয়া বুঝি একেই বলে! রহমত চাচার মতো যারা আল্লার পথে তাবলিগে যায় তাদের বউদের বুঝি এমনই যৌন ক্রাইসিস চলে ? কিভাবে তারা থাকে! কতো বোকা-ঘরে এমন ক্রাইসিস রেখে উপোস থাকে! নাকি যেখানে যায় সেখানে ওরাও এমন যৌনাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে ! কী জানি পড়তেও তো পারে। পুরুষ তো। পুরুষের ভালোবাসা নাকি শরীরকেন্দ্রিক। আর নারীর ভালোবাসা মন কেন্দ্রিক।

বৌমা এখন অনেকটা আমারই অঘোষিত বউ হয়ে গেছে। একটু নিভৃতে পেলেই চটকে দিই, বুকে জড়িয়ে আদর করি। আমি প্রতি ভোরে গ্রাম থেকে দশটা-চারটা অফিস করে বৌমার শরীরের গন্ধ পাওয়ার আশায় পড়ি মরি করে ছুটে আসি। কখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত আসবে সে অপেক্ষায় কাটে আমার সারাবেলা। অন্ধকার এলে যেন আমি বদলে যাই। সব মানুষ কি অন্ধকারে এমন বদলে যায় ! এই আমারই মতো! সকালে সূর্য হেসে উঠলেই বৌমা প্রতিদিন গোসল সেরে জায়নামাজের উদার জমিনে নিজেকে উদাস সপে দেয়। বসে বসে তসবি গোনে সোবাহানাল্লা সোবাহানাল্লা.... !
গুনগুন করে সন্ধ্যায় আমাদের দীর্ঘ উঠোনের এপাড় থেকে ওপাড়ে পায়চারি করতে থাকে পরিপাটি পোশাক পড়ে, আমি এলে কানে কানে ফিস ফিস করে বলে, ‘আমি ভেতরে ভেতরে তোমার প্রতীক্ষায় আছি।’ না বললেও কেউ বুঝুক আর না বুঝুক আমি বুঝি। এ প্রেম বৌমার খোদা প্রেম নয় আমি তার মজনু ! বেশ টের পাই খুশিরও আকুলতা ! ওর হাসি খুশি অবয়বটা কেমন যেন সারাক্ষণই মলিন ক্লান্ত বিষণœ হয়ে থাকে ! ওর ভেতরের সমগ্র সবুজ যেন মরে যাচ্ছে মনের কষ্টে ! ওর ফ্যাকাশে অবয়ব তার সাক্ষী। খুশির জন্যে বুকের কোথায় যেন ঠিক বুঝতে পারছি না এক ধরনের কষ্ট বোধ করি।

আমার চাকরি হওয়ার পর মা গোপনে আমার জন্য বৌয়ের সন্ধান শুরু করে দিয়েছেন। আমার এক খালাতো বোনের মেয়েকে আমাদের বাড়িতেও নিয়ে এসেছে। নাম নীলা। আদর করে সবাই ওকে নীলু বলে ডাকে। শ্যামলা কিন্তু চমৎকার সুন্দর নীলু। অসম্ভব চুপচাপ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং খানিকটা লাজুক ধরনের। আপন মনে সে সবার সঙ্গে মেশে ঘুরে বেড়ায় আমাদের বাড়ি। নীলাকে দেখে প্রথম দিনই নীলার মুখের একটি ছবি আমার মনের মধ্যে যেন গেঁথে গেল ! ইচ্ছে হলো আরো নীলান্তরে যাই। মনে মনে বলি নীলা আমার ভেতরে যে ছাদখোলা গৃহ আছে তুমি তাতে উড়ে এসো- আমার তাতে আপত্তি নেই। গ্রামীণ বাতাসে মদির এই আমাকে বদলে দিয়েছো তুমি। কিছুই না মানা আপাত মানুষ আমি মৌনতা রচিত মাঠ। আমি আরো মাঠের দিকেই যেতে চাই! দু’পক্ষের আসা যাওয়া, খাওয়া দাওয়া এসব করতে করতে অনেকটা নীলার সাথে আমার বিয়ের কথা ফাইনাল করেই ফেলে মা, আমিও আর না করিনি। বৌমাকে তো আমি হাত বাড়ালেই পাবো। এতো কাছে বৌমা...! এ বিয়ে ঠেকাতে বৌমা আমাকে অনেক তাবিজ কবচ খাওয়াচ্ছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঠেকানো গেল না বিয়ে। অথচ মা আমার কিছুই জানে না!
বৌমা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠেছে ! যেন তার কী হারিয়ে গেছে খুঁজে পাচ্ছে না! আমি তার ভেঙে পড়া মুখ দেখে কষ্ট পাই। আমাকে কাছে ডেকে বৌমা ক্ষোভমিশ্রিত আবেগজড়িত কণ্ঠে বলে, এসব কী হচ্ছে আনসার? এ কোন খেলায় মেতে উঠেছ তুমি, আমি মনের কষ্টে মরে যাচ্ছি তুমি তা বুঝতে চাইছো না কেন? আমি বৌমাকে আশ্বস্ত করে বলি, কিচ্ছুতে আমার হাত নেই, তুমি কিছু ভেবো না। আমি তোমার কাছে ঠিকই আসবো- তুমি দেখো। তুমি আমার কাছে যেমন আছো ঠিক তেমনিই থাকবে। ঠিক আগে যেমনটি ছিলে! ভয় নেই, ইসলাম ধর্মে একজন পুরুষের তো চারজন বিবি রাখার নিয়ম আছে...। তুমি হলে আমার এক নম্বর বিবি, তোমার আসনে অন্য কেউ ঠাঁই পাবে না। তুমি আমার মনের ছোট্ট কুঠুরিতে সারাজীবন থাকবে। কেউ জানবে না, আমাকে তুমি যে সুখ দিয়েছ, তা বেহেস্তেও আমি পাবো না। তুমি তো আমার জীবন ভরে দিয়েছো মধুময়তায় আমি কি তা ভুলতে পারি? বৌমা হতাশ গলায় বলে, তুমি পারবে। আমি তো শাকের করাত। আমি চাইলেই তোমার মত তো আর কিছুই করতে পারি না।
খুব স্বল্প সময়ে নীলার সাথে আমার বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন হলো। বাসর রাতে বৌমা আমায় ডাক দিয়েছে ঝড়ের মতো ! আমি এ ঝড় ঠেকাতে পারিনি। বৌমার শরীরের চেনা বন্দরে আমি ডুব দিয়েছি জলের মাছের মতো ! বৌমার মাখনের মতো শরীর আমার শরীরের সাথে লেপ্টে আছে খাপ ঢোকানো তলোয়ারের মতো। এই জীবন্ত তলোয়ার বাসর রাতেও আমাকে কেটে টুকরো টুকরো করছে ! এতোদিনকার শত টুকরোগুলো জোড়া লাগিয়ে আমি বিয়ের পিড়িতে বসেছি। কিন্তু এ-কী হচ্ছে আমার ! এ রাত তো একান্তই নীলার আর আমার -এখানে বৌমা কেনো! আমার ঠোঁটে বৌমার ঠোঁট কেনো ? এ রাতেও আমি বৌমার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিÑ কেনো ? এ রাতেও কেন বৌমার স্তনে আমি গভীর চুম্বন এঁকে দিচ্ছি ! বৌমা আমাকে এমন অক্টোপাশের মতো আঁকড়ে ধরে আছে কেন! রাত বাড়ছে বৌমা আমাকে ছাড়ছে না, বৌমার চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে আমার বুকের বারান্দা! এ-কী হচ্ছে! এক রমণীর জন্য আরেক কুমারীরও কুমারীত্ব চরম অপমানিত হচ্ছে ! এ কোন নির্লজ্জতা বৌমার! কেন একটি রাত বৌমা সইল না! নীলা বিছানায় পাশ ফিরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অন্ধকার রাত। বাইরের আবছা আলো জানালার ফাঁক গলে এসেছে। ঐ আলোতে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি বৌমার অগ্নিমূর্তি। নীলার হু হু কান্নার শব্দ আমার ভেতরটাকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। নীলা আমার বিবাহিত স্ত্রী আর বৌমা? নীলা আমার জীবনের একটি অংশ আর বৌমা? বৌমা আমার সুখময় রাতের সহচর। আমার অশান্ত যৌবনে মৌবন। যাকে দেখলে কেবল কামবোধ জেগে ওঠে প্রতি অঙ্গ জুড়ে। সেই বোধের মধ্যে প্রেম মুখ্য নয়। দেহই মুখ্য। আমি বৌমাকে চেটেপুটে খেয়েছিÑ কেবল খেয়েছি- কেবল খেলেছি। বৌমা আমাকে পাক্কা খেলোয়াড় বানিয়ে তুলেছে আমার উদগ্র যৌবনে। কতোবার বৌমাকে পড়ি। শেষ হয়- হয় না প্রতিবারই মনে হয় নতুন। কী তার স্বাদ বুঝি না। কিন্তু এ মুহূর্তে বৌমাকে আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমি বৌমাকে আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়ে ফিস ফিস করে বলি ‘আমি তোমার, আজীবন তোমার-তোমারই থাকবো।’ এখন ফিরে যাও চষবধংব’ বৌমা বলে না-না-না। বৌমা কাঁদে। দরজা খুলে দিয়ে বৌমাকে ঠেলে বের করে দিই। বৌমা ফিরে গেছে নাকি দরোজার কাছে দাঁড়িয়েছিল বেহায়া কুকুরের মতো, জানিনা। আমি বিছানায় নিজেকে এলিয়ে দিলাম, পাশে নীলার কান্নার শব্দে আমার ঘুম আসছে না ! দূর থেকে মুয়াজ্জিনের ডাক ভেসে আসছে। বৌদ্ধমন্দির থেকে ঢং ঢং করে ঘণ্টার শব্দ। নীলার লাল বেনারসির ভাঁজ তেমনি আছে! একি করলে তুমি ! নীলার কাতর কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়লো একরাশ যন্ত্রণা। মহাসাগরের বিশাল ঢেউয়ের মতো আমার বুকে এসে ধাক্কা খেলো তার কথার ধ্বনি। আমি বালিশে মুখ গুঁজে রইলাম। আমি ক্লান্ত হাতে ওর হাতে হাত রাখলাম। ও আমার বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। আর কাঁপা স্বরে বললো ‘ আমি মরে গেলে তুমি আমার কবরে তোমার হাতে এক মুঠো মাটি দিও এ আমার দাবি-আর কিছু চাই না। দেবে ?’ - আমি কথা দিলাম দেবো। আর সন্তর্পণে বললাম, সাবধান কোনো কথা যেন এদিক সেদিক না ছড়ায়। নীলার চোখে বুকে কান্নার ঢেউ !
নীলা আমার আত্মীয় হলেও এ বাড়ির নতুন বউ। নতুন বউকে আত্মীয় স্বজনরা দেখার জন্য ডাকছে। নীলা বিছানায় আধমরা মানুষের মতো নি®প্রাণভাবে শুয়ে আছে। দু’চোখ জুড়ে বিবর্ণ ক্লান্তি। অনেকটা ঝড় বয়ে যাওয়া বৃক্ষের মতো। নীলা উঠে দাঁড়াতে পারছে না ! বললাম, ওঠো। নীলার ভেঙে পড়া মুখ শরীর মাত্র একটি রাতের ঝড়ে কী ভীষণ বদলে গেছে ! যেন কয়েকশো মাইল বেগে টর্নেডো বয়ে গেছে নীলার ওপর ! আমি দেখেও না দেখার ভান করি। বিয়েবাড়িতে আসা মুরুব্বি গোছের আত্মীয়-স্বজনরা বলে, এতো ভেঙে পড়ার কী আছে মা, তুমি আমাদের ঘরের মেয়ের মতো। সবাই তোমার চেনা মানুষ। সব মুখই তোমার চেনা। নীলার ক্লান্ত চোখ থেকে ঝরে পড়তে থাকে ফোঁটা ফোঁটা মুক্তোর মতো অশ্র“বিন্দু। বৌমা আশে পাশে হিটলারী ভঙ্গীতে ঘুরছে। যেন এ মুহূর্তে নীলাকে বিষপানে আত্মহত্যা করাতে পারলে তার স্বস্তি। নীলা বৌমার প্রতি মুহূর্তের শত্র“। খুশির নয়। খুশি নীরবে ভালোবেসে নিঃস্ব হয়ে গেছে। তার নিঃস্বতাকে সে একান্তই তার মতো করে সয়ে গোপনে চোখের জলে ভাসে ! এই ভেসে যাওয়া কেউ দেখুক না দেখুক আমি দেখি। মনের চোখে আমি সব দেখতে পাই। কিন্তু সে তার মায়ের কাছে হেরে গেছে ! মা মেয়ের এই অন্তর্গত দ্বন্দ্বে আমি বেশ সুখবোধ করি, কষ্টও কি কমকিছু পাই ! কিন্তু নীলা... ! বৌমা আর আমার যৌন লীলা নীলা দেখেছে, তাই আমি ওকে অপরাধী বানিয়ে রাখার জন্য ওর দোষ খুঁজতে থাকি। ওর মধ্যবিত্ত বাবা যৌতুক হিসেবে বিয়েতে যা যা দেয়ার সবই দিয়েছে শুধু বাকি ছিল একটা প্রোটন চাকার গাড়ি ও টু ইন ওয়ান। ছুঁতো হিসেবে সেসবের খোটা দিয়ে তাকে বিয়ের পরদিন শুতে যাওয়ার আগে বলতে থাকি। নিজের দুর্বলতায় সে মুখ নীচু করে থাকে। আমি আবার আঘাত করি তোমার বাপ চিটিংবাজি করেছে ! নীলার সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ে অসহায়তা ! অন্তর্গত দুঃখের সাথে আরেকটি দুঃখবোঝাই জাহাজ যেন ধাক্কা খেলো। নীলার মুখ আরো ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে ক্রমশ। তবু নিজেকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় যেনো সে তটস্থ। আমি ওকে আঘাত করতে থাকি ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের মতো! নীলা এখন অপরাধীর মতো তটস্থ হয়ে থাকে আমার পাশে-অনেকটা দরিদ্রের মতো। অথচ আমি জানি ও বড়ো নির্দোষ। বড়ো সরল এবং পবিত্র। অনেকটা শিশিরভেজা শুভ্র কেয়া ফুলের মতো ! কোনো কোণে ফুটে আছে - কেউ দেখেনি অথচ চাপা সুবাসে প্রাণ ভরে যায় ! আমি ওকে দুঃখ দিতে চাই না। কিন্তু বৌমা সামনে এসে দাঁড়ালে আমার সব গোলমাল হয়ে যায়। কেমন গোলমাল ঠিক বোঝাতে পারি না। নীলা বাপের বাড়ি গেলে আমি দোতলা ঘরে বৌমাকে নিয়ে সুখে মরে যেতে থাকি... ! বৌমা চায় নীলা একেবারে না আসুক। বৌমা আমাকে চাপ দিতে থাকে নীলাদের বাড়ি গিয়ে আমি যেন একটা অপ্রীতিকর ঘটনা করে ফেলি। আমি নীলাদের বাড়ী যাই বটে, কিন্তু বলতে পারিনা নীলার অসহায় মা বাবার মুখ দেখে কিছু। বিবেকের দংশনে আমি শত টুকরো হতে থাকি, তবু একটা ঘটনা ঘটাতে চাই। ঠিক ঘটাতেও নয়, ঘটেই যায়, নীলার চাচাতো বোন দিলু বড়ো গা ঘেঁষে ঘেঁষে কথা বলে আমার সঙ্গে। নতুন দুলাভাই হিসেবে আমিও ওর বুক দুষ্টুমি করে দুই হাতে ডলে পিষে দেই। সেও দেখি আমার পাশ ছাড়ে না। আমিও চাই সে আমার পাশ না ছাড়–ক। আফটার অল শ্যালিকা মানে তো সেকেন্ড ওয়াইফ। কথায় বলে বিয়ে করলে শ্যালিকা ফ্রি! ছোটো শ্যালিকা দুলাভাইয়ের পাশে থাকলেও দোষের না। নীলাও আমাদের দুষ্টুমি নিয়ে খুব একটা মাইন্ড করে না। আসলে নীলাদের পরিবারটাই অন্যরকম সম্ভ্রান্ত। আমার আতিথেয়তা নিয়ে সে বরং ব্যস্ত সারাক্ষণ, দিলু আমাকে সঙ্গ দেওয়াতে সে খুব সন্তুষ্ট। দিলুর সঙ্গে আমি এক ধরনের মজায় মজে যাই। আমার স্পর্শে দিলুও দেখি সুখে ভরে যাচ্ছে। হা হা হি হি করে দিলু সারাক্ষণ আমার পাশ ছাড়ছে না। ভীষণ মিষ্টি চেহারা দিলুর-মেদহীন শরীর। অনেকটা অশনি সংকেতের নায়িকা ববিতার মতো। অশনি সংকেত দেখে নেশায় আমি কতোরাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি! আমার জীবন ববিতাময় হয়ে উঠেছিল। আহা আমি যদি একটা ববিতা পেতাম। দিলু যেন খানিকটা আমার সেই দুঃখটা ভুলিয়ে দিয়েছে। সেই চোখ, সেই বুক, সেই কচি হাত, পাতলা নিভাঁজ কোমর, শরীরের মিষ্টি রং আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলেছে। নীলা বেশ খুশি ওদের বাড়িতে এতোদিন আতিথ্য নিচ্ছি। নীলার মা আমার-খালাম্মা নানারকম খাওয়া দিয়ে আপ্যায়নে ব্যস্ত। ভেতরে ভেতরে দিলুর জন্য আমি ছটফট করছি ওকে ছাড়া আমার কোনো খাওয়াই জমছে না। আমার দিলু চাই Ñ খাওয়া নয়। সেই আমার প্রাণের খাদ্য। সে আমার দিল! দিলুকে পেলে বুকের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। সুযোগ বুঝে ঢুকিয়ে ফেলি। আমি সুযোগের অপেক্ষায় ওৎ পেতে থাকি শিকারী চিতার মতো। দিলু আমার বুকের ভেতর বাকবাকুম কবুতরের মতো চুপ হয়ে থাকে। এমন সুখ বুঝি জান্নাতে নেই। নীলার সঙ্গে এক ধরনের সূক্ষ্ম অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছি যেন আমি তার প্রেমে মজে, শ্বশুর বাড়িতে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিচ্ছি। দিলুকে ছুঁতে গিয়ে একটি শরীরের কথা আমার মনের পর্দায় ভেসে উঠেছে। সে তুলসী দাশ। তখন একাত্তরের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আমরা পাঁচ বন্ধু মিলে দাশ পাড়ার মেয়ে তুলসীকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে এসেছিলাম একটি পরিত্যক্ত মন্দিরের ভেতর। আমাদের বহু দিনের লোভ তুলসীকে একান্তে পাওয়ার। একাত্তর আমাদের কতো সহজে সে সুযোগ করে দিয়েছে। তুলসী থর থর করে কাঁপছিল অনেকটা বাঘের সামনে ভীত হরিণীর মতো! ওকে পেয়ে অন্যরা ঝাপটা ঝাপটি খামছা খামচি শুরু করলে তুলসী আমাদের অবাক করে দিয়ে বলেছিলো, ‘আমি একবারও চিৎকার করবো না তোমরা একজন করে এসো। জবরদস্তি করো না, তোমরা পাকিস্তানী নও, তোমরা বাঙালি...। তোমাদের কাজ সেরে তোমরা আমাকে আমার বাবার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে এসো’। তুলসী স্বেচ্ছায় খুলে দিয়েছিল তার সমস্ত বসন, নির্লজ্জ আমরা একজন একজন করে তুলসী তলায় ভিজেছি!
দিলুকে বুকে নিয়ে আমি যেন তুলসীর সুখ পাচ্ছি। কাঁচা হলুদের মতো তুলসী। গভীর ঘন দীঘল কালো চুল, দু’চোখের ঘন পাপড়ি। অপূর্ব তুলসী। আমি যখন তুলসীর ভেতর ঢুকে যাচ্ছিলাম তখন দেখি তুলসীর দু’চোখের পাতা ভিজে গলার কাছে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমার তখন তুলসীর প্রতি এক ধরনের মায়াবোধ জেগে ওঠে। কিন্তু কী করি! তুলসীকে আমি কি আর এভাবে এমন নিবিড় করে আর কোনোদিন পাবো ? আমি অন্যদের মতো তুলসীর শরীরের ওপর বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে পৌরুষত্ব জাহির করিনি। আমি ধীরে ধীরে ঢুকেছি, ও যেন কষ্ট না পায়। কাজ শেষে তুলসীকে আমরা ওর কথামতো ওর বাবার কাছে ফিরিয়ে দিয়ে এসেছিলাম, আমার ইচ্ছে করেছিল তুলসীকে আর কোনোদিন ওর বাবার কাছে ফেরত না দিই! এমন তুলসী তলায় সারাটি জীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম! হায় স্বাধীনতা তোমাকে পাওয়ার জন্য কতো তুলসী সম্ভ্রমের বস্ত্র হারিয়েছে গোপনে গোপনে! ইতিহাসে সেইসব নাম কোনোদিন লেখা থাকবে না। যুদ্ধের ঢামাঢোলে তুলসীরা ভিটেমাটি ফেলে ওপাড়ে চলে গেছে। দাশদের বাড়ির দিকে তাকালে এখনো আমার বুক ঠেলে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। ডা. হাফিজুর রহমান মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আমারও নাম তালিকাভুক্ত করেছে ছবিসহ। আমি নিজেই হাসি সেই বইটি হাতে নিয়ে।
বৌমার শত বাধার পরও নীলাকে নিয়ে আসি, কিন্তু স্ত্রীর মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করতে থাকি নির্মমভাবে! একদিন নীলা বৌমাকে আমার বাহুবন্ধনে দেখে আগুনের মতো জ্বলে উঠে। অভিযোগ করে আমার বাবা-মার কাছে বলেÑ ‘আপনাদের ঘরে বউ থাকতে ছেলেকে বিয়ে করালেন কেন?
‘কে বৌ ?’ নীলা উদ্ধত গলায় বলে,
কেন বৌমা ! ‘কিছুই দেখেন না কিছুই বোঝেন না বুঝি আপনারা ? আপনাদের চোখের সামনে এতোকিছু ঘটে যাচ্ছে আপনারা দেখেও না দেখার ভান করেন কেন ? বিয়ের দিন রাতেও তো বৌমা...। ‘নীলার দু’চোখ থেকে আগুন বেরুবে যেন। উš§াদিনীর মতো এখন সেই, চোখ বেয়ে রাগাশ্র“ ঝরে পড়ছে।
সমস্ত ঘরময় থমথমে পরিবেশে এক ধরনের অশুভ ছায়া পড়ে। ঘরের সমস্ত পরিবেশ মুহূর্তে বদলে গেল। সবার মাঝে এক ধরনের বিরক্তির ছাপ। আভিজাত্যে যেন ঘা লেগেছে সবার ! আমার ছোটোভাই বশির আর পিয়াস এসব আঁচ করতে পেরেও ভয়ে টু শব্দটি করছে না। বিশেষ করে বশির বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করে আমার দিকে কয়েকটি কটুক্তির তীর ছুঁড়ে মারলো। বৌমার ভাগ্নী জামাই এতে বেশ অপমানবোধ করলো এবং বললো, যে মেয়ে চাচী সম্পর্কে এমন বাজে মন্তব্য করতে পারে তাকে তালাক দেওয়াই উচিত আনসারের। এ বাড়িতে আর থাকারই অধিকার ওর নেই। একটি সরল সত্য চাপা পড়ে গেল। সবার ক্ষোভ মিশ্রিত আগুনের আঁচে! হয়ে গেল নীলার সংসার ভেঙে তছনছ; নীলা চলে গেলো। মার্শাল’ল কোর্টে মামলা করলো ওর বাবা। আমি হেরে গেলাম মামলায়। একটি স্বপ্নময় মানুষের স্বপ্নকে আমি নিজ হাতে ভেঙে দিলাম। অথচ ওর কোনো দোষ ছিলো না। নীলার জীবনে নেমে এলো ঘোর অমাবস্যা। অথচ আমি আবার বিয়ের পিড়িতে বসি অবলীলায়। মোটা অংকের টাকা নিয়ে এক সরকারি আমলার বোনকে আমি বিয়ে করি। এবারও সামনে এসে দাঁড়ায় বৌমা। কিন্তু বৌমা এবার আর ছাড় পায় না, প্রথম রাতেই উদ্ধত ভঙ্গীতে বলল, ‘আমি নীলা নই, রেশমী’। আমি রেশমীকে বাঁধা দেইনি। রেশমীর ভাই আমাকে ঐশ্বর্য দিয়েছে বিপুল; তিন লাখ টাকা দিয়েছে। যা আমি নীলার মধ্যবিত্ত বাবার কাছ থেকে পাইনি। নীলার বাবা আদর্শ নিয়ে আছে, টাকা যেখানে দ্বিতীয় খোদা সেখানে, যা আমার কাছে বিরক্তিকর। যে অজুহাতে আমি ওকে পিষ্ট করেছি প্রতিনিয়ত ! ঘর বাধার স্বপ্নে বিভোর মেয়েটি কোনোদিন টু শব্দটি করেনি। ওদের রক্তে বনেদীয়ানা আমাদের চে’ কোনো অংশে কম না। যা নীলার অসামান্য ব্যক্তিত্বকে বাড়িয়ে দিতো। কোথায় যেন নীলার কাছে অসম্ভব রকম হেরে যাই আমি ! কিন্তু রেশমী অমন নয়। ও অন্যরকম। অনেকটা কলতলার নারীদের মতো; ঝগড়াটে মুখরা প্রকৃতির, কাউকে ছেড়ে কথা বলার পাত্র সে নয়।
রেশমী দুটো জমজ সন্তান প্রসব করে। কিন্তু দু’সন্তানই বিকলাঙ্গ! আরেকটি পরিপূর্ণ সন্তানের আশায় আমি আবারো সন্তানের জš§ দেই, কিন্তু না-পর পর চার বারই আমার সন্তানরা বিকলাঙ্গ ! সবাই বলে এ নাকি আল্লার গজব বুঝি না আল্লার একী খেয়াল ! আমি তো আমার নিজের খেয়ালেই সব কাজ করেছি সেখানে আল্লা কোথায় ছিল ! কোন অপরাধের শাস্তিস্বরূপ আমার এ পুরস্কার ! নীলার প্রতি অবিচারের শাস্তি হিসেবে আল্লা আমাকে বিকলাঙ্গ সন্তান দিয়েছে, পাড়ার লোকেরা এরকমই বলে। আমি জানি, এ অপরাধবোধ আমাকে একরাশ হতাশা ঝাপটে ধরে। দু’চোখে অন্ধকার দেখি, মা বলেছে শাহজালালের মাজারে গিয়ে কাঁদলে ফল পাব। আমি মাজারে মাজারে মানত করতে থাকি। কিন্তু আমার শাপমোচন হয় না কিছুতেই ! সিলেটের শাহজালাল থেকে আজমীরের খাজা বাবা সবার দরোজায় আমি মাথা খুঁটেছি। কিন্তু কোনো বাবার কাছে আমি আমার যন্ত্রণার সমাধান পাইনি ! কেউ আমাকে একটি পরিপূর্ণ সন্তানের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। বাবারা বুঝি সন্তান দিতে পারে ! আমি জানি না। মায়ের কথায় গেছি অনন্যেপায় হয়ে। চার চারটি বিকলাঙ্গ সন্তানের মুখ আমাকে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণায় দগ্ধ করে তুলেছে। বৌমা, রেশমী কাউকেই আমার ভালো লাগে না। প্রতিদিনের বিপন্নতায় আমি এক অন্য মানুষ হয়ে উঠতে থাকি। বিপন্ন এক অন্য মানুষ। এ বিপন্নতার মুখোমুখি রেশমী বৌমা কেউ হয় নি। ওরা সকলেই বেশ আছে। শুধু বদলে গেছে আমার পৃথিবী। এখন আর কারো সাথে কথা বলতেও আমার ইচ্ছে করে না। ইচ্ছেরা হামাগুড়ি খায় আর নীরবে কাঁদে।নয়ে এক সরকারি আমলার বোনকে আমি বিয়ে করি। এবারও সামনে এসে দাঁড়ায় বৌমা। কিন্তু বৌমা এবার আর ছাড় পায় না, প্রথম রাতেই উদ্ধত ভঙ্গীতে বলল, ‘আমি নীলা নই, রেশমী’। আমি রেশমীকে বাঁধা দেইনি। রেশমীর ভাই আমাকে ঐশ্বর্য দিয়েছে বিপুল; তিন লাখ টাকা দিয়েছে। যা আমি নীলার মধ্যবিত্ত বাবার কাছ থেকে পাইনি। নীলার বাবা আদর্শ নিয়ে আছে, টাকা যেখানে দ্বিতীয় খোদা সেখানে, যা আমার কাছে বিরক্তিকর। যে অজুহাতে আমি ওকে পিষ্ট করেছি প্রতিনিয়ত ! ঘর বাধার স্বপ্নে বিভোর মেয়েটি কোনোদিন টু শব্দটি করেনি। ওদের রক্তে বনেদীয়ানা আমাদের চে’ কোনো অংশে কম না। যা নীলার অসামান্য ব্যক্তিত্বকে বাড়িয়ে দিতো। কোথায় যেন নীলার কাছে অসম্ভব রকম হেরে যাই আমি ! কিন্তু রেশমী অমন নয়। ও অন্যরকম। অনেকটা কলতলার নারীদের মতো; ঝগড়াটে মুখরা প্রকৃতির, কাউকে ছেড়ে কথা বলার পাত্র সে নয়।
রেশমী দুটো জমজ সন্তান প্রসব করে। কিন্তু দু’সন্তানই বিকলাঙ্গ! আরেকটি পরিপূর্ণ সন্তানের আশায় আমি আবারো সন্তানের জš§ দেই, কিন্তু না-পর পর চার বারই আমার সন্তানরা বিকলাঙ্গ ! সবাই বলে এ নাকি আল্লার গজব বুঝি না আল্লার একী খেয়াল ! আমি তো আমার নিজের খেয়ালেই সব কাজ করেছি সেখানে আল্লা কোথায় ছিল ! কোন অপরাধের শাস্তিস্বরূপ আমার এ পুরস্কার ! নীলার প্রতি অবিচারের শাস্তি হিসেবে আল্লা আমাকে বিকলাঙ্গ সন্তান দিয়েছে, পাড়ার লোকেরা এরকমই বলে। আমি জানি, এ অপরাধবোধ আমাকে একরাশ হতাশা ঝাপটে ধরে। দু’চোখে অন্ধকার দেখি, মা বলেছে শাহজালালের মাজারে গিয়ে কাঁদলে ফল পাব। আমি মাজারে মাজারে মানত করতে থাকি। কিন্তু আমার শাপমোচন হয় না কিছুতেই ! সিলেটের শাহজালাল থেকে আজমীরের খাজা বাবা সবার দরোজায় আমি মাথা খুঁটেছি। কিন্তু কোনো বাবার কাছে আমি আমার যন্ত্রণার সমাধান পাইনি ! কেউ আমাকে একটি পরিপূর্ণ সন্তানের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। বাবারা বুঝি সন্তান দিতে পারে ! আমি জানি না। মায়ের কথায় গেছি অনন্যেপায় হয়ে। চার চারটি বিকলাঙ্গ সন্তানের মুখ আমাকে প্রতিনিয়ত যন্ত্রণায় দগ্ধ করে তুলেছে। বৌমা, রেশমী কাউকেই আমার ভালো লাগে না। প্রতিদিনের বিপন্নতায় আমি এক অন্য মানুষ হয়ে উঠতে থাকি। বিপন্ন এক অন্য মানুষ। এ বিপন্নতার মুখোমুখি রেশমী বৌমা কেউ হয় নি। ওরা সকলেই বেশ আছে। শুধু বদলে গেছে আমার পৃথিবী। এখন আর কারো সাথে কথা বলতেও আমার ইচ্ছে করে না। ইচ্ছেরা হামাগুড়ি খায় আর নীরবে কাঁদে।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক