লেভ টলস্টয়ের গল্প
রতন কুমার তুরী, শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০১৩


‘শৈশব’ গল্প দিয়ে লেভ টলস্টয়ের সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশ। মূলত টলস্টয় ছিলেন অত্যন্ত ধীরগতির লেখক। কোন ঘটনা তার হৃদয়কে আলোড়িত না করলে তিনি গল্পের খসড়া করতে বসতেন না। আর যদি খসড়া তৈরি করেন তা অসংখ্যবার পুনঃনিরীক্ষা এবং প্রতিস্থাপন করেই তার আসল রূপ দিতেন। ফলে একটা লেখা প্রকাশ হতে কখনো এক বছর আবার কখনো বা পাঁচ অথবা ছয় বছর সময় লাগত। লেভ টলস্টয়ের গল্প প্রায় দীর্ঘ-অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ, কমা ও সেমিকোলোনের পৌনঃপুনিক ব্যবহার এবং প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে আশ্চার্য্য যাদু-বাস্তবতা। ‘ফাদার সিয়ের্গি’এক সামরিক অফিসারের স্বেচ্ছা নির্বাসন ও কঠোর কৃচ্ছ্র সাধনের মধ্য দিয়ে প্রবৃত্তিকে জয় করার ব্যর্থ চেষ্টার কাহিনী যা টলস্টয়ের ছোঁয়ায় ধর্মপ্রাণ মানুষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের অপকট চিত্রের মর্যাদা লাভ করেছে। সিয়ের্গির কঠোর জীবন, কামনার দ্বন্দ্বে নিজের আঙুল কেটে ধৈর্য্য ধারণ, শেষ পর্যন্ত একজন সাধারণ মানুষের জীবনের মধ্যেই পরম মুক্তির সন্ধান লাভকে আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে আত্মজিজ্ঞাসামুখর একজন মানুষের স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু এই স্বাভাবিক পরিণতি যখন সাহিত্যের নিরিখে মূল্যায়িত হয় এবং উত্তীর্ণতা লাভ করে তখনই এই সাধারণ জীবনই অসাধারণ মহিমা পায়। খ্রিস্টধর্মের অমানবিক যাজক প্রথা, যাকে টলস্টয় মনে করতেন নিজ ধর্মের সবচেয়ে বড় গোঁয়ার্তুমি। তার বিপরীতে তিনি স্থাপন করেছিলেন মানবতার শাশ্বত বাণী। যেমন- মৃত্যুকে জয় করে নেয়া টলস্টয়ের ‘ইভান ইলিচের মৃত্যু’ গল্পটি। ইভান ইলিচ কোর্ট অব জাস্টিসের সদস্য, তার ছেলেবেলা কেটেছিল অন্য দশজন রাশিয়ান ছেলের মতই। লেখাপড়া শেষ করে সে বিয়ে করল এবং প্রথম সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর তাদের জীবনে দেখা দিল দাম্পত্য কলহ। অনেক সন্তানের জন্ম দেয়া যাপিত জীবন পঁয়তাল্লিশের শেষ প্রান্তে এসে বাজিয়ে দিলো বিদায়ের করুণ সুর। মৃত্যুর ভয়াবহ অথচ অবশ্যম্ভাবী যন্ত্রণার শেষ তিনটি দিনের বর্ণনাই গল্পের মুখ্যভাগ দখল করে আছে। জিজ্ঞাসা, অনুশোচনা ও কখনো কখনো মৃত্যু পথযাত্রীর পাগলামির মধ্যদিয়ে টলস্টয় এই গল্পটিকে করে তুলেছেন চূড়ান্ত আবেগধর্মী। বলা হয়ে থাকে বিশ্বসাহিত্যের বর্ণিল ইতিহাসে মৃত্যুর অন্তর্লীন বেদনার অপকট দলিল হিসেবে গল্পটি মৃত্যুকে জয় করে নিতে সক্ষম হয়েছে। ‘‘ক্রয়টজার সোনাটা’’ গল্প টলস্টয়ের চিন্তার আরেকটি বিশেষ দিকে উপস্থাপিত করে। রেলযাত্রী এক বৃদ্ধের মুখে বর্ণিত এ কাহিনীতে শারীরিক অক্ষমতা কিংবা স্নায়বিক দুর্বলতার কারণে কিভাবে নারী জন্ম দেয় অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক ব্যাধি এবং স্বাধীনতার নামে সোচ্চার ও অস্বাভাবিক কামনার বিকারে সৃষ্ট তিক্ততা শেষ পর্যন্ত কী ভয়াবহ পরিণতির সৃষ্টি করে এই গল্পে তার স্পষ্ট সাহসী উচ্চারণ। প্রেমের সমাপ্তি পাঠ, কিংবা শুরু, নিশ্চয়ই দেহগত সম্মিলন এবং বিয়ে প্রায়ই যে প্রেম ভিত্তিক নয়, বরং আবহমানকাল ধরে মানব জাতির অস্তিত্ব রক্ষা ও সংসার প্রতিপালনই মুখ্য। টলস্টয় যেন মৃত্যু এবং খুনের ভেতরে সেই যুক্তি ও সত্য আবিষ্কার করেছেন একই সাথে। তা ছাড়া টলস্টেয়ের ছোট গল্প ‘ইলিয়াস’, এবং ‘কতটুকু জায়গা চাই’ টলস্টয়কে দাঁড় করিয়েছে আলাদা পঙ্তিতে। ‘ইলিয়াস’ গল্পে গল্পের নায়ক হচ্ছে ইলিয়াস। ইলিয়াস এককালে গরীব ছিল। নিজের পরিশ্রম দ্বারা সে ধনী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করে। কিন্তু নিয়তির কারণে সে আবার দরিদ্রে পতিত হয়। তার সৎ প্রতিবেশি তাকে কাজের বিনিময়ে খাদ্য এবং আশ্রয় দেয়। সে তার বৃদ্ধা স্ত্রীকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকে। ভাগ্যকে নির্বিগ্নে মেনে নেয়ার অনুপম দৃষ্টান্ত এ গল্পে। ‘কতটুকু জমি চাই’গল্পে টলস্টয় দেখিয়েছেন একজন মানুষের ন্যূনতম চাহিদাও বিশাল আকাঙ্ক্ষার প্রান্তিক প্রতিতুলনা। মানুষ যা ভোগ করতে পারে সঞ্চয় করে তার তুলনায় অধিক এবং আয়েশী জীবনের প্রতি তার সহজাত আগ্রহ থেকেই জন্ম নেয় পাপ, পরিণামে সে অনিবার্য ধ্বংস ডেকে আনে-এগল্পের নায়ক ফাহমের সীমাহীন লোভের ফলে মৃত্যু এবং মাত্র সাড়ে তিন হাত জমিতেই অন্তিম শায়ান তারই দার্শনিক প্রতিনিধিত্বকারী।‘‘ফাদার সিয়ের্গি’’ ‘‘ইভান ইলচের মৃত্যু’’এবং ‘ক্রয়টজার সোনাটা’য় টলস্টয় ধর্মের মূল লক্ষ্য, মানব জীবনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি, সমাজ গঠনে নারী ও পুরুষের সম্মানের উপরই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। এর বাইরে ‘বোকা ইভানের কাহিনী’ ও ‘সেবাস্তোপলের গল্প’ লেভ টলস্টয়কে আরেক পথের সন্ধান দেয়। বোকা ইভানের কাহিনী অনেকটা রূপকথার মত হলেও শেষ পর্যন্ত ইভানের সরলতাই অপর ভাইদের পরাজিত করে। গল্পটি কিয়দাংশ এই রূপ-ইভান একজন সরল ছেলে হওয়ায় তার দুই ভাই সাইমন এবং তরাস তার সম্পত্তি অন্যায়ভাবে দখল করে নেয়। কিন্তু ভাগ্য বিপর্যয়ে পড়ে দুই ভাই নিঃস্ব হয়ে আবার ইভানের কাছে ফিরে আসে। কিন্তু ইভানের আশ্রয়ে থেকে পুনঃরায় তারা শয়তানিতে মেতে ওঠে এবং আবার তারা ইভানের সকল সম্বল কেড়ে নেয়। ইভান সততা, নিষ্ঠা এবং সরলতার পুরস্কার স্বরূপ আরোগ্য, অর্থ ও সৈন্যবল লাভ করলেও চতুর ভাইয়েরা তাও তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়। তারপরও শেষ পর্যন্ত সাইমন এবং তরাসকে তাদের পাপের ফল ভোগ করতেই হয় এবং ইভান তার সরলতা দিয়েই প্রলোভনকে পরাজিত করে। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখিত সেবাস্তোপলের গল্পে যুদ্ধ ও পরাক্রম শেষ পর্যন্ত মানুষকে ধ্বংস ছাড়া কি দিতে পারে জিজ্ঞাসা ধ্বনিত হয়েছে। কথা সাহিত্যের প্রচলিত মাপকাটির বাহিরে বিচিত্রভাবে উত্তীর্ণ একটি শিল্পকর্ম টলস্টয়ের ‘‘সেবাস্তোপলের গল্প’’। যা টলস্টয়ের হাতের ছোঁয়ায় হয়ে উঠেছে মর্মস্পর্শী এবং হৃদয় বিদারক। গল্পটিতে টলস্টয়ের যুদ্ধ বিরোধী চিন্তার পরিচয় মিলে। যুদ্ধ মানেই পাগলামি, আর মানুষ যদি এ পাগলামির স্রষ্টা হয় তাহলে যে মানুষকে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন জীব বলে থাকি মানুষ আসলে তা নয়। দুটি গল্পেই টলস্টয়ের রাজনৈতিক চিন্তা অত্যন্ত প্রখর। তৎকালীন সময়ে রাশিয়ার মানুষ যে সঠিক পথ পরিহার করে কণ্ঠকময় পথে হাঁটা শুরু করেছিল টলস্টয় তাদের ইভানের সহজ সরল পথে আসার জন্য আহবান জানিয়েছিলেন। সাম্যবাদী, সরল এবং অনাড়ম্বর জীবনের দিকে খ্রিস্টীয় যে উদাত্ত আহবান, টলস্টয় তাকেই বলতে চেয়েছেন চূড়ান্ত শান্তির পথ। সেবাস্তোপলের গল্পে যুদ্ধের নামে অযথা লোকক্ষয়, পরশ্রীকাতরতা এবং শোষণের পরিমন্ডল বৃদ্ধিকে তিনি হাস্যকর প্রমাণ করেছেন। লেভ টলস্টয়ের আরেকটি দুর্দান্ত গল্প ‘ঈশ্বর সত্যকে দেখেও অপেক্ষা করেন।’’ ইভান দিমিত্রিচ একজন ধনী যুবক। সে ব্যবসায়ী। অত্যন্ত আনন্দ এবং ফূর্তিতে জীবন কাটে তার। সে একটি মিথ্যা খুনের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে জেলে গেলে ভাগ্য চক্রে জেলেই তার সাথে আসল খুনির পরিচয় ঘটে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে দিমিত্রিচ তার বিরুদ্ধে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে কোন অভিযোগ উত্থাপন করেন নি, বরং তার প্রতি ভাল ব্যবহারের মাধ্যমে সদয় আচরণ করতে থাকে। এতে অপরাধী ক্রমেই আত্মগ্লানিতে ভুগতে থাকে এবং এক পর্যায়ে সে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের খুনের দায় স্বীকার করে দিমিত্রিচের মুক্তির ব্যবস্থা করে। কিন্তু মুক্তি পেয়ে দিমিত্রিচ জেল গেইট পেরোনোর আগেই ইহলোক ত্যাগ করে। এখানে টলস্টয়ের নৈতিক চিন্তার প্রাধান্য পেয়েছে। অপর দিকে ‘দুই হুসার’ গল্পে ঊনবিংশ শতাব্দির রুশ সমাজের জেনারেশন গ্যাপের মধ্য দিয়ে টলস্টয় রুশ সমাজের তৎকালীন ক্ষয়িষ্ণু অবস্থাকে তুলে ধরেছেন। প্রকৃতপক্ষে টলস্টয়ের গল্প তার মতে-উপন্যাসের বিশ্রামকালের অবকাশ যাপন। তবুও তাকে আমরা আলাদা পংক্তিতে দাঁড় করাতে বাধ্য হই-কারণ তার সমসাময়িককালে স্বদেশে এবং বিদেশে জন্ম নেয় বেশ কজন অমর কথা সাহিত্যিক, যারা আধুনিক ছোট গল্পের মৌলিক রূপকার হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। তাদের মধ্যে রুশ লেখক আন্তন চেখভ ফিয়োদ দস্তয়েভস্কি, ইভান তুর্গেনিভ, ফরাসী লেখক গী দ্য মোপাসাঁ, ভিক্টর হুগো, আমেরিকান লেখক হেনরি এবং মার্ক টোয়েনের নাম বিশেষভাগে উল্লেখযোগ্য। তাদের লেখার প্রকৃতি বিশ্লেষণে চেখভ, হেনরি ও মোপাসাঁর বৈশিষ্ট্য ছিল এক আর টলস্টয়, দস্তয়েভস্তি, হুগো ছিল অন্য বৈশিষ্ট্যের। তুর্গেনিভের লেখার স্বাতন্ত্র্য এদের থেকে তাকে আলাদা করে দেয়, আর টোয়েনীয় সাহিত্যের অত্যুজ্জ্বল ব্যাঙ্গ বিদ্রূপের ছুরি বলাই বাহুল্য তীর্যক মহিমায় স্বাধীন। যদিও চেখভকে সমকালের সবচেয়ে নিপুন ছোট গল্পকার বলা হয়ে থাকে তথাপিও বাকভঙ্গি, পরিসর এবং শিল্পের বিচারে টলস্টয়ের রচনা সম্পূর্ণ অভিনব। নির্মাণ শৈলী এবং কাঠামোতেও টলস্টয়ের গল্প সবার থেকে আলাদা। এক্ষেত্রে মার্ক টোয়েন, দস্তয়েভস্কি কিংবা হুগো ও তার থেকে অনেক দূরে। বস্ত্তত মানুষের চিরায়ত কামনা শান্তির অন্বেষাই টলস্টয়ের গল্পকে অমরত্ব দান করেছে।