ঘরের পাশে জয়নুল আবেদিন,ঘরের পাশে বাংলাদেশ,প্রতিদিন
কাজী ইনসানুল হক , মঙ্গলবার, জুন ১১, ২০১৩


ঘরের পাশে জয়নুল আবেদিন,ঘরের পাশে বাংলাদেশ,প্রতিদিন

এগারো সালের এগারো মাচ। জাপানের ভয়াবহ সুনামির পর অফিস কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিল ,
সুনামি স্রস্ত অনিশ্চিত অর্থনৈতিক সংকটের কারনে সবার বাসাভাড়ায় এযাবত দেয়া
সাবসিডি উঠিয়ে দেয়া হল , অর্থাৎ হয় নিজ পকেট থেকে পুরো বাসাভাড়া দিতে হবে
নইলে বাসা বদলিয়ে কিছুটা অর্থের সাশ্রয় করতে হবে ।
সিধান্ত নিলাম -বাসাই বদলাব ।যুগ যুগ ধরে কম্পানির বাসায় ছিলাম,নানান নিয়ম কানুন,
পান থেকে চুন খসলেই সমস্যা,বয়সের ভাড়ে নুয ব্রদ্ধা "কানরি সান"(Representative
of Building Management company) প্রতিনিয়ত “জ্ঞান" দেয়।

জাপানে বাসা বদলানর নানা ঝক্কি,advance money,key money র আলাদা খরচ,বাসা
খোজা সময় সাপেক্ষ , ফুদোসান (Housing Agent) হয়ত কয়েক্ টা বাসা দেখাল,একটা
আপনার পছন্দ হল কিন্তু মুল মালিক বিদেশিদের ভাড়া দেবেন্ না বলে দিলেন ,সব
পরিশ্রম বৃথা গেল ।এই "বিদেশী" আবার বিশেষ "বিদেশি" সাদা গাত্রবর্ণ ভিন্ন ব্যাপার,
এশিয়ান্ দের ব্যাপারে বাড়ি মালিকদের নানান অভিযোগ, ,curry খেকোদের ঘর ণোংরা
হয়,গোটা এলাকায় মসলার গন্ধ ,চীনারা একজনের ঘরে ৫-৬ জন থাকে ইত্তাদি,ইত্তাদি।

ফুদোসান কে জানালাম বাসার খোজ দিতে ,স্টেশন থেকে যেন ১২-১৫ মিনিটের হাটা দুরত্তে
হয় (মেদ ভুড়ি কমাতে) বন্ধু জ়াহিদের পরিচিত এই ফুদোসান হাসলেন ,সবাই কাছাকাছি
থাকতে চান স্টেশনের,দূরে কেউ যেতে চায়না ।যত দূর ভাড়া তত কম ,যত কাছে তত
বেশি। ১০ মিনিটের মদ্ধে অন্তত ২৫ বাসার কাগজপত্র দিয়ে বললেন এবার বাসা দেখুন ।
ফুদোসান এ কাজ করেন আমার পরিচিত জাপানি জানালেন কমপক্ষে ৫০ টা বাসা নাদেখে
নাকি জাপানিরা বাসা বদলায় না ,৬ মাস যায় এই বাসা দেখাদেখি নিয়ে। আমার বেলায়
সেটি হলেনা ,প্রথমবারই এবং বাসা না দেখেই আমার বাসা চুড়ান্ত হল সেটাই মজার।

এক রোববার ফুদোসানের প্রতিনিধি আমাকে বাসা দেখাতে নিয়ে গেল ।বাসার মালিক
বেশ দূরে থাকেন ,উনি আসতে একটু দেরী হবে বিধায় আমরা বাসাটির পাশের পার্কে
গাড়ী থামিয়ে অপেক্ষা করছি। পার্কের ভিতর তাকাতেই চমকে উঠি,ছুটে যাই পার্কের
ভিতর। ছায়া সুনিবির ,পল্লভ শোভিত এই নির্জন পার্কের এক কোনায় একটি ভাস্কয।
আমার চমকানোর কারন-পার্কের এই ভাস্কযের সাথে আমাদের শিল্পাচায জয়নুল
আবেদিনের বিখাত চিত্রকল্প "লড়াই" বা "সংগ্রাম"(The struggle)ভাব্ ধারনা নিয়ে
নিমিত ও সোনারগা লোকশিল্প যাদুঘরে সংরক্ষিত কাদায় আটকানো কাঠ বোঝাই
গরুর গাড়ির চাকা ঠেলা গাড়োয়ানের সেই বিখাত ভাস্কযের অদ্ভুত মিল।এটি ও
কাঠ বোঝাই তবে হাতে টানা গাড়ি,সামনে চালক , ভার টানছে, পেছনে স্ত্রী,সন্তান,
ঠেলছে।জ়য়নুল আবেদিনের চালক কাদায় আটকানো গাড়ি ঠেলছে, জাপানের চালক
পাহাড়ের উচু-নিচু সামাল দিচ্ছে। দুজনেই কমঠ,জ়ীবন সংগ্রামের কঠিন বাস্তবতার
প্রতীক।একই "লড়াই" একই "সংগ্রাম" ,দেশ দুটো আলাদা,জাপান আর বাংলাদেশ।
"ওশিন" আমলের এই ছবিটি এখন জাপানিদের জাদুঘরে ঠাই নিয়েছে আর
আমরা এখন ও নিরন্তর লড়াই করছি ।


এলাকাটি টোকিওর ইতাবাশী ওয়াডের তকুমারু।পাহাড়ী উচু নিচু এলাকা। সামান্য সমতলে চাষাবাদ।এই ভাস্কযটী অতীত দিনের জাপানিদের যাপিত
জ়ীবনের এফিটাফ। ণাম "মিদোরি নো মিচি"।৩০ বছর আগে এই পাকে ভাস্কযটি বসানো হয়েচে।কোন নিদ্রস্ট ভাস্করের নাম জানা যায়নি তবে
যারা এই কমযজ্ঞে ছিলেন সবার নাম খোদিত আছে।


জয়নুল আবেদিনের "লড়াই"---------বাংলাদেশ

বাসা না দেখেই সীদ্ধান্ত নিলাম,এখানেই থাকবো,ঘরের পাশে জয়নুল আবেদিন,ঘরের পাশে বাংলাদেশ ,প্রতিদিন।
প্রায় দুবছর কাটলো এই বাসায়।স্টেশন থেকে দুরে,পাহাড়ের উচু পথ,প্রতিদিন পথভাঙ্গার ক্লান্তি,না কোনোটাই
তত কস্টের নয়।সেই সাথে বাড়তি পাওনা,প্রতিদিন ভোরে জানালা খুললেই দুরের ফুজি পাহাড় দেখা যায়।
টোকিওর দোতালা বাসার দোতালা থেকে ফুজি দেখা যায়,বিষাস করানো কঠিন,কিন্তু সেটাই সত্তি।আমন্ত্রন
রইলো।


কাজী ইনসানুল হক
টোকিও
kaziensan@gmail.com