তিন রাণীর পর ডাচরা পেল রাজাঃ হল্যান্ডে উৎসবের বন্যা
বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া, হল্যান্ড থেকে , শুক্রবার, মে ১৭, ২০১৩


তেত্রিশ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৮০ সালের ৩০ এপ্রিল ওলন্দাজ রাণী জুলিয়ানা (৪ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ সিংহাসনে আরোহণ করেন) যখন তার কন্যা প্রিন্সেস বিয়াট্রিক্সকে রাজ সিংহাসন ছেড়ে দেন সে দিন রাজধানী আমস্টারডামে হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটেছিল। সাধারণ জনগণ রাণী বিয়াট্রিক্সের ক্ষমতারোহণ অনুষ্ঠানে (ক্রোনেশন) বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। ‘নো হাউস, নো ক্রাউন’ এই স্লোগানে স্লোগানে ভায়লেন্ট প্রতিবাদ জানিয়েছিল জনগণ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে) দেশে সে সময় গোটা দেশে গৃহায়ণ সমস্যা বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল রাণী বিয়াট্রিক্স সিংহাসন ছেড়ে দিলেন তার তিন পুত্র সন্তানের বড় জন, প্রিন্স উইলিয়ামকে। গত কয়েক যুগ ধরে হল্যান্ড শাসন করেছেন ‘অরেঞ্জ’ পরিবারের মেয়েরা। বিয়াট্রিক্সের আগে রাণী ছিলেন তার মা জুলিয়ান। তার আগে রাজ্য শাসন করেছিলেন জুলিয়ানার মা, প্রিন্সের ভিলহেলমিনা। তারও আগে রাণী এমা। এদের আগে ১৮৮০ তক্‌ হল্যান্ড শাসন করেছিলেন পুরুষরা। উইলিয়াম এক উইলিয়াম দুই। বর্তমান রাজা উইলিয়াম সেই অর্থে তৃতীয় পুরুষ শাসক।
গত ৩০ এপ্রিল গোটা দেশ জুড়ে চলে নতুন রাজাকে বরণ করে নেবার মহোৎসব। রাজধানী আমস্টারডাম ছাড়াও দেশের বিভিন্ন শহরে আয়োজন করা হয় চিত্তাকর্ষক অনুষ্ঠানাদি-নাচ, গান, চিত্র প্রদর্শনী, র‌্যালি, মেলা, শারীরিক কসরৎ ইত্যাদি। দিনের আবহাওয়া সুন্দর হওয়ায় গোটা ব্যাপারটাতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিল। কেবল যে ডাচরা এই সমস্ত অনুষ্ঠানের আয়োজনও উপভোগ করে তা ভাবার কোন কারণ নেই। বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী, শ্রেণি, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা এই দিনটিকে প্রাণভরে উপভোগ করে। দিনটিকে ঘরে টিভি পর্দার সামনে বসে উপভোগ না করার চাইতে জনতার কাতারে শরীক হতে আমরাও সকালে বের হয়ে পড়ি রাজধানীর উদ্দেশে। ভীড়ের কারণে আগ বাড়িয়ে শহরের বিভিন্ন সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ঠিক হলো প্রথমে বাংলাদেশী ব্যবসায়ী বুলবুল ভাইয়ের বাসার সামনে গাড়ি রেখে ওরাসহ যেখানে মূল অনুষ্ঠান অর্থাৎ আমস্টারডামের ‘ডাম’ সেখানে যাব। মাদাম তুসো সংলগ্ন এই রাজপ্রসাদে রাণী বিয়াট্রিক্স আনুষ্ঠানিকভাবে তার বড় ছেলেকে সিংহাসন ছেড়ে দেবেন। তারপর পাশেই বিশাল গীর্জায় আর একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান। তাতে উপস্থিত বিভিন্ন দেশ থেকে আসা রাষ্ট্রীয় অতিথিবর্গ। তাতে ইল্যান্ডের রাজপুত্র চার্লস ও তার বান্ধবী ক্যামেলিয়া থেকে শুরু করে জর্ডান, জাপান, ব্রুনাই, বেলজিয়াম, স্পেন আরো নানা দেশ থেকে আসা রাজা-রাণী। উপস্থিত জাতিসংঘের প্রাক্তন প্রধান কফি আনান এবং অন্যান্য দেশের সরকার প্রধানরা। উপস্থিত ডাচ প্রধান মন্ত্রীসহ সমস্ত সাংসদ। সবার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক, কেননা তাদের এক এক করে শপথ নিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করতে হবে নতুন রাজার প্রতি।
এই সমস্ত অনুষ্ঠান আমার মত আমজনতাকে বাসায় টিভিতে কিংবা শহরের বিভিন্ন স্থানে টাঙ্গানো বিশাল পর্দায় দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। ‘ডাম’ নামক এলাকায় আগের দিন থেকে অনেকেই বিছানা পেতে রেখেছিল অতি উৎসাহীরা যাতে রাণী, রাজা ও ভিভিআইপিদের কাছ থেকে এক নজর দেখতে পারে। গোটা অনুষ্ঠান যেন কোন গোলমাল ছাড়াই সম্পন্ন হতে পারে তার জন্যে আগ বাড়িয়ে নেয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বার হাজার বিশেষ পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আগ বাড়িয়ে চলে বাড়তি চেক্‌। রাস্তার ম্যানহোলগুলোও খুলে দেখা হয়। সন্ত্রাসীরা কখন কোন পথ দিয়ে আক্রমণ করে বসে-কোন সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেয়া যায় না। জামার্নী থেকে আনা হয় বিশেষ পুলিশ। মোটকথা, সন্ত্রাসের সব পথ বন্ধ। বুলবুল ভাইয়ের বাসায় পিয়াজু, চনা, হল্যান্ডে অতি পরিচিত ভিয়েতনামী স্নেক্স লম্পিয়া খেতে খেতে দেখি সেখানে এসে উপস্থিত আর এক শহর থেকে আসা এক ব্যবসায়ী লিটন দম্পতি ও তাদের দু-সন্তান। তিনটার দিকে সবাই মিলে হেঁটে রওনা দেই মেট্রো স্টেশনের দিকে। বুলবুল ভাইয়ের বাসার অনতিদূরে বসেছে খোলা বাজার। তাতে নতুন-পুরানো সব সামগ্রী নিয়ে বসেছে ব্যবসায়ী। সৌখিন ব্যবসায়ীর সংখ্যাও কম না। ছ/সাত বছরের ছেলে-মেয়েরাও তাদের ব্যবহৃত খেলনা সামগ্রী নিয়ে পসরা খুলে বসেছে। এখানকার ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার কমতি নেই। কদিন বাদেই খেলনার আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করার আগেই তারা ছুড়ে ফেলে পুরানো খেলনা, টেনে নেয় নতুন খেলনা। এই ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের একটি কথা মনে পড়ে আমার ছোটবেলায় তিনি লিখেছিলেন, ‘কালকার ছেলে-মেয়েরা চাইবার আগেই এত বেশি খেলনা হাতে পায় যে খেলনার মূল রসটা উপভোগ করার আগেই তারা তা ছুড়ে ফেলে দেয়। আমাদের সময় আমরা কোন খেলনা পেলে তার পুরো রস নিংরে নিতাম।’ (হুবহু মনে নেই। স্মৃতি থেকে লেখা।) যাই হোক দর্শক-ক্রেতার ভীড় এমনই প্রচণ্ড যে এক পর্যায়ে উল্টো পথ ধরে এগুতে হলো মেট্রো স্টেশনের দিকে। দেখা হলো আর এক বাংলাদেশী দম্পতির। তারাও থাকেন আমস্টারডাম। যোগ দিলেন আমাদের সাথে। সবাই হৈ-চৈ করতে করতে এগিয়ে চলি রাজধানীর মূল আকর্ষণ স্থল, ডামের দিকে। ততক্ষণে মূল অনুষ্ঠান শেষ। তাই উপড়ে পড়া ভীড় নেই। সেটাই চেয়েছিলাম। ডায়ে-বায়ে, দোকান-বার-ক্যাফের ভিতরে স্থান সংকুলান হচ্ছে না বলে বাইরে দাঁড়িয়ে দৃষ্টিকাড়া তরুণ-তরুণীদের বীয়ারের সাথে সমানে আড্ডা দিয়ে চলা চোখে পড়ে। এখানেও বসেছে বাজার। খাবারের পসরা নিয়েও বসেছে অনেকে। চিকেন, পোর্ক থেকে শুরু করে হরেক রকম মাংসের ‘বার বী কিউ। ড্রিংক্স।
প্রতি বছরই এই ৩০ এপ্রিল এমনি উৎসবের দেশে পরিণত হয় গোটা হল্যান্ড। তবে এ বছর গোটা অনুষ্ঠান ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণে। এই দিনটি এমনিতে জাতীয় উৎসবের দিন বিধায় অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাধারণ দোকান-পাঠ সব বন্ধ। এ বছরের বিশেষ দিক হলো, ৩৩ বছর পর রাণী বিয়াট্রিক্সের ক্ষমতা হস্তান্তর ও নতুন রাজার শপথ গ্রহণ। রাজ পরিবারের প্রতি ডাচদের রয়েছে অন্ধ আকর্ষণ, ভালবাসা। অন্যদিকে রাজ পরিবার কিংবা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধেও জনগণের ক্ষোভ ও বা অসন্তুষ্টি দিন দিন বেড়ে চলেছে। কয়েকটি রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে ডাচ রাজনীতিতে রাজা বা রাণীর হস্তক্ষেপ বন্ধ করারও দাবি জানান। এই সমস্ত দাবির প্রেক্ষিতে গেল বছর থেকে হল্যান্ডে সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় রাজা বা রাণীর সরাসরি ভূমিকা খর্ব করা হয়। গতকালও কয়েকটি স্থানে মৃদু প্রতিবাদ দেখা দেয়। একটি প্লাকার্ডে লেখা ছিল, ‘দূর হোক রাজতন্ত্রের। এটি ২০১৩ সাল’। অবশ্য পুলিশ অই প্লাকার্ড সরিয়ে ফেলে এবং প্লাকার্ড বহনকারী ডাচ তরুণীটিকে এক পাশে সরিয়ে পরে ছেড়ে দেয়।
রাজ পরিবার যে একেবারে ধোঁয়া তুলসীর পাতা তা ভাবারও কোন কারণ নেই। রাণী বিয়াট্রিক্সের মা, রাণী জুলিয়ানার স্বামী প্রিন্স বার্নাড ছিলেন অনেকের মতে প্লেবয় প্রিন্স। রাণীর সাথে বিয়ের পরও তার ছিল বৈবাহিক-বহির্ভূত পর নারীর সাথে সম্পর্ক। কেবল তাই নয়, অই নারীর ঘরে তার ছিল কয়েকটি মেয়ে। এবং আরো মজার ব্যাপার হলো, প্রথমে রাণী জুলিয়ানা এই সমস্ত ঘটনা মেনে নিতে না চাইলেও পরবর্তীতে সব মেনে নেন এবং প্রিন্স বার্নাড পরবর্তীতে তার ওই ইলিজিটিমেট’ মেয়েদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতেন এবং অই মেয়েরাও রাজ বাড়িতে আসতেন। প্রিন্স বার্নাড এই সমস্ত অভিযোগ অকপটে স্বীকার করেন। কেবল তাই নয় ১৯৭০ সালে লক্‌হীড বিমান কেনার সময় ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে তাকে ডাচ আর্মড ফোর্সের ইন্সপেক্টর জেনারেল পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়। সে দিক থেকে সদ্য বিদায় নেয়া রাণী বিয়াট্রিক্সের শাসনামল কেলেঙ্কারীবিহীন হলেও তার বড় ছেলে, নতুন রাজা উইলিয়াম আর্জেন্টনীয় মেয়ে, মাক্সিমাকে বিয়ে করে আর এক বিতর্কের সৃষ্টি করেন। এই বিয়ের বিরুদ্ধে দেশে বিতর্কের সৃষ্টি হয়, যেমনটি হয়েছিল রাণী বিয়াট্রিক্স নিজে যখন ডাচ তরুণ, ক্লাউসকে বিয়ে করেন তিনি যখন বিয়ে করেন তখন সবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ। ডাচ জনগণ জার্মানিদের অত্যাচারের কথা তখনো ভুলেনি। তবে পরবর্তীতে প্রিন্স ক্লাউস তার মিষ্ট ব্যবহার ও নানা জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশ গ্রহণের কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। আর্জেন্টনীয় মাক্সিমাকে নিয়ে আপত্তি এই কারণে তার বাবা সারিয়াগেটা সে দেশের স্বৈর সামরিক শাসকের অধীনে কৃষি উপমন্ত্রী ছিলেন। সে সময় অনেক নিরীহ লোক অই স্বৈর শাসক কর্তৃক নিখোঁজ হয়ে যায়। প্রতিবাদ এমনই তীব্র ছিল যে মাক্সিমার বাবা মেয়ের বিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। এমন কী তার মেয়ে যে গত হল্যান্ডে রাণী হলেন, সেই অনুষ্ঠানেও উপস্থিত থাকতে পারেননি। মজার ব্যাপার হলো রাণী বিয়াট্রিক্সের জার্মান স্বামী প্রিন্স ক্লাউস যেমন ডাচ জনগণের কাছে পরবর্তীতে অতি প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, আর্জেন্টনীয় মেয়ে রাণী মাক্সিমাও ইতোমধ্যে ডাচ জনগণের কাছে তার স্বামী, রাজা উইলিয়ামের চাইতে জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে এগিয়ে রয়েছেন।
রাণী বিয়াট্রিক্সের ক্ষমতার শেষের দিনগুলো সুখকর নয়। পারকিনসনে ভোগা স্বামী মারা গেলেন বেশ ক’বছর আগে। তিন সন্তানের এক সন্তান, ফিজো স্কী করতে গিয়ে বরফে চাপা পড়ে এখন ‘কমায়’। জীবন ফিরে পাবার কোন সম্ভাবনাই আর নেই। স্বদেশে রাজ পরিবারের বিরুদ্ধমতবাদীর সংখ্যা বাড়ছে। রাজ পরিবারের বেশ কিছু ভাতা ইতোমধ্যে কমিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেকে দাবি করছে রাজ পরিবারের যে আয় তার উপর কর বসানো হোক। খেঁটে খাওয়া জনগণ যদি ট্যাক্স দেয়, রাজ পরিবারের সদস্যরা কেন দেবে না এই দাবি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। উল্লেখ্য, নতুন রাজা ইউলিয়াম প্রতি বছর বেতন ভাতা হিসাবে এক মিলিয়ন ডলার পাবেন। এ ছাড়া কর্মচারী ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্যে তিনি পাবেন বছরের ৫.৭ মিলিয়ন ডলার। তার স্ত্রী রাণী মাক্সিমা পাবেন বছরের করমুক্ত চার লক্ষ পঁচিশ হাজার ডলার। এ ছাড়া অন্যান্য ব্যয় বাবদ তিনি পাবেন ৭৫০০০০ ডলার। উইলিয়াম ও মাক্সিমার রয়েছে তিন কন্যা সন্তান। বড়টির বয়স ১০। আঠার বছর বয়স হলে সেও পাবে অনুরূপ ভাতা। উইলিয়ামের পর সেই হবে উত্তর সাগর পাড়ে ছোট্ট এই দেশ হল্যান্ডের রাণী। রাজ মুকুট যাবে আবার নারীর কাছে।