পোশাকশিল্পে মৃত্যুর এ প্রবাহ কেন
হাফিজ রশিদ খান , রবিবার, মে ০৫, ২০১৩


সাভারের রানা প্লাজার এ মৃত্যুর প্রবাহ আমাদের মানুষী জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ মানে এমন একটা মুল্লুক, যেখানে জীবন তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ একটা বিষয়। এতোগুলো জীবন মুহূর্তের মধ্যে নাই হয়ে গেল। তারও বেশি জীবন পরবর্তী জীবনে কোনো মানে ছাড়াই বেঁচে থাকবে হয়তো। অনেক জীবন পঙ্গু হয়ে যন্ত্রণার সহযাত্রী হবে। ধুঁকে-ধুঁকে দিন কাটবে হয়তো অনেকের। তাহলে জীবন মানে কী?

জীবন মানে তো আসলে বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। কাজের মাধ্যমে মন ও মননের উৎকর্ষসাধন। বড় বোধ, বড় আকাক্সক্ষা নিয়ে বাইরের দিকে তাকানো। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে ঊনিশ শ’ একাত্তর সালে এ জীবনের জন্যেই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম উপনিবেশের বিরুদ্ধে। মহান মানবসন্তান বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বহু স্বাধীনতাকামী সহগামীর সাহচর্যে এদেশ আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল ওই জীবনেরই আহবানে। ওই হিরন্ময় যুগের প্রতি মুগ্ধতা আছে বলেই আমরা দেশকে কোনো পাথুরে পাহাড় বলে ভাবি না।

স্থবিরতাকে কাঁপিয়ে এগোতে চায় আমাদের কর্মশক্তি, ধী-শক্তি, প্রাণশক্তি। বহু বেদনা ও যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও এদেশ আছে মানুষভর্তি প্রেরণা হয়ে। আছে এদেশ, এ জনপদের হিতকামী বহু রাজনৈতিক সামাজিক নেতৃত্ব। আছে বিশাল-বিপুল সম্ভাবনাপূর্ণ ভবিষ্যৎ। শারীরিক ও মানসিক উদ্দীপনায় টগবগে অযুত-নিযুত সাধারণ মানুষ।

যারা কারো তোষামোদ বা চোখ রাঙানি বা মান-অভিমানের বশবর্তী হয়ে নয়, সম্পূর্ণ নিজের গরজে, আখেরে দেশের নিমিত্তে মাঠে-মাঠে ফসল ফলায়। কল-কারখানায় ঘাম ঝরিয়ে কাজ করে দিনরাত। হ্যাঁ, আরও আছে, যারা ওই জীবনেরই ক্ষুধার্ত ডাকে নানা আপাত অস্বীকৃত পথে কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হকের চোখে দেখা জীবন্ত, লড়াকু প্রান্তিক মানুষ। তাদের সবাইকে নিয়েই তো এদেশ।

সভ্যতার চাকা ঘোরে। প্রযুক্তিÑবিজ্ঞানের নতুন-নতুন আবিষ্কার উদ্যমী ও অভিলাষী মানুষকে আরও নতুন ভাবনা, নতুন কাজের পথে পা বাড়াতে সাহসী করে। অনেক মানুষকে নিয়ে বহু বড় কাজের প্রেরণা যোগায়। এভাবেই গত শতকের আশির দশকে এদেশে এলো পোশাকশিল্পের প্রযুক্তি।

সে সময় আমাদের সামাজিক স্তরে এক ধরনের স্থবিরতা ছিল, নতুন কিছুর প্রতি অনাগ্রহ ছিল। সেই জন্যে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে নারীশ্রমিকের অংশগ্রহণকে একটি নিন্দনীয় ও গ্রহণযোগ্য নয়Ñএমন পেশা হিসেবে দেখেছে একশ্রেণির মানুষ। পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, এটি আমদানি নির্ভর, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী একটি গতিশীল শিল্প উদ্যোগ।

এ উদ্যোগ বহু বেকার নারী-পুরুষকে কাজের নিশ্চয়তা দিল। বিশেষ করে দেশের প্রায় অর্ধেক জনশক্তি নারীকে স্বাবলম্বী হতে পথ দেখাল। এ উদ্যোগে শামিল হলেন এমন অনেক নেতৃস্থানীয় মানুষ যারা অনতি অতীতে ছিলেন সমাজ বদলের সংগ্রামে যুক্ত, নতুন কিছু করে দেখানোর পক্ষপাতি। তারা জীবনের নানা দিক ও পথের কুড়ানো অভিজ্ঞতা নিয়ে এ শিল্পে সমবায়ী ধারণায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বিপরীতে অনেকেই ছিলেন এ উদ্যোক্তাদের ব্যঙ্গকারী, বুর্জোয়া পুঁজির ভাগ-বাটোয়ার বা লুম্পেন বলে নিন্দামন্দকারী।

কিন্তু অচিরেই দেখা গেল, গার্মেন্টস শিল্পের উদ্যোক্তারা সময় উপযোগী চিন্তা চেতনায় ভর করে বাস্তবে অনেক দূর এগিয়ে গেলেন। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এ সময়ে এসে দেশের অবহেলিত নারীশক্তির বিশাল প্রণোদনাকে নিয়ে তারা নিজেদের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও বিপুল উপকার সাধন করেছেন বা করে চলেছেনÑ এটা অনস্বীকার্য।

এই ইতিবাচক বাস্তবতার পাশেই ইদানীন্তন সময়ে দেখছি, তাদেরই দায়িত্বহীনতায়, বড় ধরনের অবহেলার শিকার হয়ে আশুলিয়ায় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে নারীশ্রমিক অবলীলায় পুড়ে মারা যাচ্ছে। সম্প্রতি সাভারের রানা প্লাজা নামের ভবন ধসে নারী শ্রমিক তার গর্ভের সন্তানসহ চাপা পড়ে প্রতিকারহীনভাবে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিচ্ছে, তখন এই গার্মেন্টস মালিকদের, প্রাথমিক পর্বে যাদের ‘উদ্যোক্তা’ বলে সুনাম ছিল তাদের সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষ বলে ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। তারা কী সমাজ বিচ্ছিন্ন, বিলাসী, বেপরোয়া, অর্থলোলুপ, দাম্ভিক নামের আলাদা একটি সম্প্রদায়ে পরিণত হলেন?

বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত নতুন ও সুন্দর চিন্তাগুলো থেকে গ্রহণযোগ্য মানসিকতার পাশাপাশি আমাদের থাকবে না কেন পারিপার্শ্বিক চেতনা, সামাজিক দায়বদ্ধতার জ্ঞান। মানুষকে কেন মানুষের মর্যাদা দিয়ে আমরা নিজেদের সম্মানিত করবো না। এমন সব প্রশ্নের মুুখে পড়ে গেল কেন গার্মেন্টস শিল্পের একদার উদ্যোক্তা ও আজকের মালিকেরা ? এ নিয়ে আত্মসমালোচনা তাদেরকে বিপর্যয় থেকে বাঁচাবে আর দেশও উপকৃত হবে। আমরা সেই শুভবুদ্ধির উদয়ের অপেক্ষায়।