খোলামেলা আলোচনা এখনই
ফরমান আকব , শনিবার, এপ্রিল ২০, ২০১৩


বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বয়স এখন ৪২ বছর। স্বাধীন বাংলাদেশের এই চার দশকের অর্জন কী? স্বাধীনতা একটি শব্দমাত্র নয়, একটি অমূল্য প্রত্যয়। নির্যাতিত এবং অবহেলিত একটি জাতিকে উন্নয়ন আর প্রগতির চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে যাওয়ার এক বিশাল আয়োজনের নাম স্বাধীনতা। অতি সম্মানজনক অবস্থা। এই ৪২ বছরে আমরা কতটুকু সার্থকতা অর্জন করেছি, আমাদের ব্যর্থতার পরিমাণ কতখানি, তা কি আমরা বাস্তবতার নিরিখে বিচার বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছি? গত চার দশকের বেসামরিক ও সামরিক শাসকরা ছিলেন যেন একেকজন পি.সি সরকার ও জুয়েল আইচের চেয়েও উৎকৃষ্ট যাদুকর। সম্মোহিতের মতো বিশাল এই জনগোষ্ঠী ছুটেছে তাদের পেছনে। প্রশ্নাতীতভাবে তাদেরকে কাতারবন্দি হয়ে অনুসরণ করতে গিয়ে আজ আমরা এতটাই ক্ষত-বিক্ষত আর ক্লান্ত-শ্রান্ত যে, গোটা দেশসহ আমরা কোন অন্ধকার অতল গহবরের কিনারায় উপনীত হয়েছি, সেটা ভেবে দেখার মত বিচারবোধও সম্ভবত আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতার আন্দোলনে আমজনতার অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য ছিল না। দেশভাগ এবং ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে গান্ধী জিন্নাহ-নেহেরু প্রমুখ জনগণের সমর্থন নিয়ে মাউণ্টব্যাটেনের সঙ্গে দেনদরবার ও দর কষাকষি করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ছিল অন্যরকম জনযুদ্ধ। যা ছিল সর্বাংশে একটি জাতির অস্তিত্বের লড়াই। মুক্তিকামী জনগণ যারা যেখানে যেভাবে সম্ভব হয়েছে শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
একাত্তরে নয়টি মাস বাংলাদেশে ‘বাংলাদেশ সরকার’ বা মুক্তিযুদ্ধের কোনো নেতা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না। ছিল পাকিস্তানি সামরিক প্রশাসনের নামে একটি হিংস্র হায়েনার দল। সেদিন কোনো রকম কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই স্বাধীনতাকামী মানুষ অভূতপূর্বভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিল। সেই ঐক্য এমনই ছিল যে, যা অতীতে বা পরবর্তীতে কোনোদিনও ঘটেনি। আশ্চর্যের ব্যাপার, মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার দেশে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর মুহূর্ত থেকে সেই ঐক্য ও সংহতি কর্পূরের মত উবে গেল। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উত্থাপিত হতেই পারে, মুক্তিযুদ্ধের সময় সরকার কলকাতায় না থাকে যদি দেশের মধ্যে কোথাও অবস্থান করত, তাহলে মুক্তিযোদ্ধারা বা স্বাধীনতাকামী মানুষ কি ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারতো? হানাদারদের পৈশাচিক নিপীড়নের মধ্যে নেতৃত্বহীন অবস্থায়ও দীর্ঘ ন’মাস সাত কোটি বাঙালি সুসংহত, ঐক্যবদ্ধ থাকল অথচ স্বাধীনতার পর পরই কেন সেই অটুট ঐক্যে ভাঙ্গন বা বিভেদ দেখা দিল? রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে কোনো দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হলে সেই দেশে একাধিক পক্ষ থাকাই স্বাভাবিক। বিজয়ের পর বিজয়ী পক্ষের অবশ্য করণীয় যা কর্তব্য তা হলো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাতীয় সংহতি ও ঐক্য সুসংহত করার কাজে হাত দেওয়া। আর পরাজিত পক্ষকে তাদের ভ্রান্তনীতি পরিত্যাগ করে সংশোধিত হওয়ার এবং অনুশোচনার সুযোগ করে দেওয়া। মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধীদের কথা আলাদা। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই তাদের প্রাপ্য। লঘু অপরাধের জন্য অনুকম্পার ব্যবস্থা থাকা বাঞ্চনীয়। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাধীনতা বিরোধী প্রবক্তারা অনুশোচনা বা জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার কোনো প্রয়োজনীয়তাই বোধ করেনি এবং তৎকালীন বিজয়ী নেতৃত্ব জাতিকে সুসংহত, ঐক্যবদ্ধ ধারায় পরিচালিত করার উপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে একটি সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠিত না হয়ে প্রাথমিক অবস্থা থেকেই পরস্পর বিরোধী একাধিক ধারা বিদ্যমান থেকেছে চার দশক যাবৎ। পাকিস্তানের ২৩ বছরে গণতন্ত্রের চর্চা বিদ্যমান থাকলে এদেশের স্বাধীনতার দাবী কখনও উঠত না। গণতন্ত্রের দাবীতে বাংলার মানুষ সোচ্চার হলে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। ফলে যুদ্ধ করে পাকিস্তানি নাগপাশ থেকে বেরিয়ে এসে একটি নির্ভেজাল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল এ অঞ্চলের মানুষগুলো। কিন্তু গত বিয়াল্লিশ বছরে সেই গণতন্ত্রকে একবারও বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। দেখতে, শুনতে বা বলতে শোভন হবে বিবেচনায় সংবিধানে সেক্যুলারিজমের কথা লিখে দেওয়া হলো বটে কিন্তু হিন্দু- বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান-আদিবাসীসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়ার প্রয়োজন অনুভূত হয়নি। যেখানে মাওলানা ভাসানী, মনি সিংহ, আতাউর রহমান খান, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদদের মত দেশবরেণ্য জননন্দিত নেতাদের মতামতের কানাকড়ি মূল্য ছিল না, সেখানে পাহাড়-পর্বতে বসবাসকারী ক্ষুদ্র এক জনগোষ্ঠীর আরও ক্ষুদ্র এক নেতা মানবেন্দ্র লারমার ক্ষীণ কণ্ঠের দাবী শোনার বা অনুধাবন করার ফুরসত যে সরকারের হবে না তাতো বলাই বাহুল্য। ’৭১ এর ২৫শে মার্চের আগে এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ডান-বাম ও মধ্যপন্থি, ধর্ম নিরপেক্ষ-ধর্মপন্থি, উগ্র জাতীয়তাবাদী ইত্যাদি দল ও উপদল বিদ্যমান ছিল। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরক্ষণেই কেউই নিজের অস্তিত্ব ও খাসলত মুহূর্তের মধ্যে বদলাতে বা বিলুপ্ত করতে পারে না। প্রায় সব দলের নেতা কর্মীই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, দু’চারটি জনসমর্থনহীন দল ছাড়া। গণতন্ত্রে নানা দল-উপদলের অস্তিত্ব থাকাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সরকারের নেতারা অন্য দলের বিজ্ঞ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন মনে করেননি। সেই সময়ের যোগ্যতর ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ‘সর্বোৎকৃষ্ট’ সরকার গঠিত হতে পারত। সরল এবং ফলপ্রসূ নিয়মের পথে যাত্রা না করে তারা হাঁটলেন উল্টো দিকে। হঠাৎ করে মোসাহেব আর চাটুকারদের আধিক্যে ভরে গেল গোটা দেশ। কেউই বুঝতে চাইলেন না যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বহুমতের সমন্বয় ঘটাতে হয়। দেশের সংকটময় মুহূর্তে ভিন্ন মতাবলম্বী যোগ্যতম নেতার দাবীও আমলে নিতে হয় জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে।
ভিন্ন মতাবলম্বী নেতার যুক্তিপূর্ণ পরামর্শ উদারচিত্তে গ্রহণ করাই গণতান্ত্রিক চেতনা। অসহিষ্ণুতা, প্রতিহিংসা পরায়ণতা এবং প্রতিশোধ প্রবণতা ইত্যাদি ভেতরে লালন করে আর যাই হোক গণতন্ত্রের হয় না। ব্যক্তি বা দলীয় এজেন্ডা অন্যায়ভাবে জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা হলে তার পরিণাম হয় ভয়াবহ। আর দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর পর অতীতের তিক্ত, অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক এবং বিষাদময় ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময় এখনো কি আসেনি? সকল পক্ষকে এই বাস্তবতা স্বীকার করতেই হবে যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিলো জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। বারে বারে বিঘ্নিত হলেও এখন চলছে গণতন্ত্রের বিকাশের সংগ্রাম। এখানে প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের উদারতা সর্বাঙ্গীন ভাবে স্বীকৃত। আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষায় কোনো জাতি শিক্ষিত হয়ে উঠলে ধর্মীয় সম্প্রদায়ক রাজনীতির স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটবে।
মুক্তির প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আমরা ৪২ বছর আগে পাকিস্তানী শোষণ-শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। সার্বিক মুক্তি বিশাল ব্যাপার। সেই মুক্তি এখনও অর্জিত হয় নি। স্বাধীনতার পর নেতারা ভুল করেছিলেন বলে খেসারত তারাও দিয়েছেন, ৪২ বছর ধরে আমরাও দিচ্ছি। এখন নেতারা বড় কোনো ভুল করলে আগামীতেও জাতির মুক্তি আসবে না। সুতরাং সকল মতাদর্শের ধারক-বাহকদের আস্থায় নিয়ে, বহুমতের সমন্বয় ঘটিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে খোলামেলা আলোচনার সময় এখনই।