জামায়াতকে নিয়ে ভোটের অংক কষার প্রয়োজন নেই
প্রফেসর আবদুল মান্নান , শুক্রবার, এপ্রিল ১২, ২০১৩


বাংলাদেশে এখন কোটি টাকার প্রশ্ন দেশে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ হবে কী হবে না ? এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্র সরকারই দিতে পারে তবে তারা এযাবৎ কাল পরিষ্কার ভাবে কিছু বলেনি । এই বিষয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হলে সরকারে বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিভিন্ন আইন দেখিয়ে বলেন কোন কোন আইনে জামায়াত-শিবির নামের এই দু’টি জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা যায় । পরিষ্কার করে বলেন না সরকার নিষিদ্ধ করবেন কী করবেন না । দুই একজন আবার বাঙালকে হাইকোর্ট দেখান । বলেন উচ্চ আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে তা নিষ্পত্তি হলে জামায়াত নিষিদ্ধ হয়ে যাবে । মামলাটি জামায়াতের নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন বিষয়ক । ধরে নিলাম উচ্চ আদালত জামায়াতের বিরুদ্ধে রায় দিল । তাতেতো জামায়াত নিষিদ্ধ হবে না । নির্বাচন কমিশনে তাদের নিবন্ধন বাতিল হবে । কোন নির্বাচনে দল হিসেবে তারা অংশ গ্রহণ করতে পারবে না । তাদের কোন সদস্য যদি অন্য দলে ভিড়ে অথবা নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্ধিতা করতে চায় তাহলে সেটি অনায়াসে করা সম্ভব । জামায়াত যদি একটি রাজনৈতিক দল হতো তাহলে তাদের নিষিদ্ধ করার তেমন কোন জোড়ালো দাবী উঠতো না । কোন সংজ্ঞায় জামায়াত এখন আর একটি রাজনৈতিক দল নয় । ছাত্র শিবিরও প্রকৃত অর্থে কোন ছাত্র সংগঠন নয় । উভয়ই এখন সন্ত্রাসি সংগঠন । পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংহতি সমিতি, হরকতুল জেহাদ, জেএমবি, হিজবুত তাহরির ইত্যাদি সংগঠন যে কারণে নিষিদ্ধ ঠিক একই কারণে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবি বর্তমানে সারা দেশে এত জোড়ালো । পাকিস্তান ও ভারতেও এর আগে একাধিকবার এই সংগঠনটি নিষিদ্ধ হয়েছে । আইনের ফাঁক ফোকর গলে তারা আবার ফিরে এসেছে, সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করেছে । যুক্তরাষ্ট্র ছাত্র শিবিরকে একটি জঙ্গি সংগঠন বলে তালিকা ভুক্ত করেছে এবং কেউ যদি ছাত্র শিবিরের সাথে সমপৃক্ত ছিল এমন প্রমান থাকে তাহলে সে ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ভিসা পায় না । জামায়াত কেন নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন তার একশত একটা কারণ হয়তো খুঁজলে পাওয়া যাবে । তবে সব চেয়ে বড় কারণ এই দলটি ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে শুধু অবস্থানই নেয়নি তারা পকিস্তানি সেনাবাহিনীর দোসর হিসেবে এদেশে লুটপাট, গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, ধর্মান্তর, বিদেশে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর মতো যত রাষ্ট্রদ্রোহি ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করা সম্ভব সব কিছু করেছে । তাদের সকল অপকর্মের সে সময়ের সৈনিক ছিল ইসলামি ছাত্র সংঘ, যা ১৯৭৭ সালে নাম বদলে ইসলামি ছাত্র শিবির হয়েছে ।
যে দলটি নিজ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সেই দল আবার ওই দেশে রাজনীতি করে এমন নজির বিশ্বের অন্য কোন দেশে নেই । এমনটি হলে জার্মানিতে নাৎসি পার্টি আর ইটালিতে ফ্যাসিসট পার্টি এখনো রাজনীতি করতো । আরো চিন্তার বিষয় হচ্ছে একাত্তর সালের জামায়াত-শিবেরের চেয়ে বর্তমানের জামায়াত-শিবির অনেক বেশী শক্তিশালী এবং ভয়াবহ । তারা এখন অনেক বেশী সংগঠিত হয়ে পূর্ণ শক্তি নিয়ে একাত্তরের অবস্থায় ফিরে এসেছে । তারা এখন ইচ্ছ করলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে, দেশের একটি অঞ্চলকে নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নিতে পারে এবং এমনটি চলতে থাকলে হয়তো একদিন তারা রাষ্ট্রক্ষমতাও দখল করে নিতে পারে । অবশ্য গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তারা রাষ্ট্রক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিল কারণ জোটের মন্ত্রীসভায় জামায়াতের দুজন শীর্ষ স্থানীয় নীতি নির্ধারক সে সময় অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলেন । এই দু’জনই বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে বিচারের সম্মূখীন । গত রোববার তারা রাজশাহীতে বোমা মেরে একজন পুলিশের এসআই এর হাতের দুটি কব্জী উড়িয়ে দিয়েছে । ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে শুরু করে বাংলাদেশ পুলিশের উপর বর্তমানে যে ধরণের নৃশংস আক্রমন করে তাদের হত্যা বা গুরুতর ভাবে আহত করছে তা ইতোপূর্বে কখনো দেখা যায়নি । শুধু পুলিশ নয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে তারা বিজিবির উপরও সশস্ত্র হামল করেছে । এই হামলা করার জন্য তারা পবিত্র মসজিদের মাইক ব্যবহার করে তাদের ক্যাডারদের জড়ো করেছে । দূঃখের বিষয় এই সব দূবৃর্ত্তপনার আবার সাফাই গেয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর । তিনি বলেছেন মিথ্যা মামলার আসামীকে ধরতে গেলে জনগনতো এমন আক্রমন করবেই । একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ হতে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য আশা করা যায় না ।
বহুদিন ধরেই বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলে আসছেন জামায়াত-বিএনপি’র রাজনীতি এখন আর একক ভাবে তাদের হাতে নেই । তাদেও রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এখন পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই দ্বারা । জামায়াতের একটা সুবিধা আছে । এটি একমাত্র দল যাদের বাংলাদেশে, ভারতে ও পাকিস্তানে কাযক্রম আছে । তবে বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দুটি দেশে তারা অনেকটা কাগুজে বাঘ । পাকিস্তানে তাদের সবচেয়ে ভাল সময়ে অন্যান্য সমমনা দলগুলির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে জাতীয় সংসদে দুটি আসন পেয়েছিল । আর ভোট পেয়েছিল ২ শতাংশ । এখন পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাদের কোন অবস্থান নেই । ভারতে তারা একটি জঙ্গি সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত । কখনো নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে না । ক’দিন আগে তারা পশ্চিম বঙ্গের কোলকাতা শহরে ভিন্ন নামে শেখ হসিনার পদত্যাগ চেয়ে দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর মুক্তি দাবি করে সমাবেশ করেছে । তবে বাংলাদেশের কথা আলাদা । ১৯৭৮ সনে জেনারেল জিয়ার হাত ধরে তাদের উত্থান । এখন সন্ত্রাস সৃষ্টিতে তাদের সক্ষমতা দেখে আইএসআই তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের কর্মকা- পরিচালনা করে বলে অনেক বিশ্লষক মনে করেন । তাদের সহায়ক ভূমিকায় আছে বিএনপি । দীর্ঘকাল ধরে পূর্ব ভারতে অশান্তি সৃষ্টি করার জন্য আইএসআই তৎপর রয়েছে । তাদের এই তৎপরতা পাকিস্তান আমল হতে শুরু । বর্তমানে তাদের হয়ে এই কাজটি করে জামায়াত । জামায়াত সমর্থিত বিএনপি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকলে এই কাজগুলি করতে তাদের জন্য অসুবিধা । বিগত চার বছর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় থাকাতে তাদের নিরবচ্ছিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনায় কিছুটা হলেও ছেদ পরেছে । তার উপর তাদের শীর্ষ স্থানিয় নেতৃবৃন্দ বর্তামানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে বিচারের সম্মূখীন হয়েছে । সার্বিক অবস্থায় এই মুহুর্তে জামায়াতের বাঁচা মরার লড়াই । সুতরাং অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে এই মুহুর্তে আইএসআই এর সমর্থন জামায়াতের সব চেয়ে বেশী প্রয়োজন । আইএসআই অবশ্য তাদের অশাহত করেছে বলে মনে হয় না । গত শনিবার ঢাকায় চারজন পাকিস্তানী নাগরিককে প্রচুর জাল টাকা, পাসপোর্ট, জিহাদি বই সহ পুলিশ আটক করেছে । ধারণা করা হচ্ছে এরা জামায়াতের সাথে সম্মিলিত ভাবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিঘিœত হয় এমন যে কোন নাশকতামূলক কাজ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল । এই নাশকতা মূলক কাজের মধ্যে আছে হাই প্রোফাইল ভিভিআইপ হত্যা, ব্যাংক ডাকাতি, বিভিন্ন জনসভাস্থলে আত্মঘাতী বোমা হামলা, বিমান ছিনতাই ইত্যাদি । জামায়াত-শিবিরের কর্মাকন্ড নিষিদ্ধ করলে তারা এই কাজগুলির সাথে সহজে সম্পৃক্ত হতে পারতো না । রোববার সন্ধ্যায় শিবির তাদের সভাপতিকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে সারা দেশে মঙ্গলবার হরতাল ডেকেছে । হরতাল ডেকেই ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন শহরে, হাইওয়েতে শতাধিক জানবাহন ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করেছে । এই সংগঠনটি যদি নিষিদ্ধ থাকতো তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারি সংস্থা আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারতো যেমন করে অতীতে জনসংহতি সংস্থা, জেএমবি বা হুজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে । সত্তরওে দশকে ভারতে নকশাল পন্থিদের এই ভাবেই দমন করেছিল সেই দেশের সরকার ।
জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করণের দাবি এখন কোন দলের নয়, সারা জাতির । ১৯৯৩ সালে রাজশাহি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন কর্মী শিবিরের হাতে নিহত হলে তখন সংসদে বিএনপি-আওয়ামী লীগ সকলে এক জোট হয়ে তাদের নিষিদ্ধ করণের দাবি তুলেছিল । কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হচ্ছে সে সময় বিএনপি ভোটের অংক কষে তা করা হতে বিরত ছিল যার মূল্য বর্তমানে জাতি দিচ্ছে । এখন বিএনপি সাথে নেই কিন্তু কোটি কোটি জনগন এই দাবির পক্ষে আছে । রোববার শাহবাগ জাগরণ মঞ্চের পক্ষে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করনের দাবি সম্বলিত এক কোটি মানুষের গণস্বরের বই জাতিয় সংসদের স্পিকার বরাবর হস্তান্তর করা হয়েছে । যারা এই দলিলে স্বাক্ষর করেছেন তারা সকলেই নিশ্চয় আওয়ামী লীগের সমর্থক নন । তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সম্মুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর । আওয়ামী লীগকে জামায়াত-শিবির নিয়ে নির্বাচনী অংক কষার কোন কারণ নেই । জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলেও যা না কলেও তা । তারা সব সময় আওয়ামী লীগের এবং জাতীর বিপক্ষ শক্তি । আর তাদের ভেটের সংখ্যাতো কোন অংশে ৪ ভাগের বেশী নয় । বরং এই যাত্রায় তাদেরকে যদি নিষিদ্ধ করা হয় তাহলে আওয়ামী লীগ তার আর একটি ঐতিহাসক দায়িত্ব পালন করবে এবং নিংসন্দেহে নতুন প্রজন্মের সমর্থন তাদের পক্ষে যাবে যেমনটি ঘটেছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনে । তবে এই কাজটি করার আগে ভারত আর পাকিস্তানে আইনের যে সকল ফাঁক ফোকর গলে জামায়াত বের হয়ে এসেছিল সেই ফাঁক ফোকরগুলি বন্ধ করতে হবে । এই কাজটি বর্তমান সরকার না করলে অন্য কোন সরকার করবে না আর জামায়াত-শিবির যে বেপরোয়া গতিতে এখন সামনের দিকে যাচ্ছে তেমনটি যেতে থাকলে নিকট ভবিষতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হুমকীর সম্মূখীন হতে বাধ্য । আর বিএনপি সত্যি সত্যি যদি তাদের অস্থিত্ব ধরে রাখতে চায় তাহলে জামায়াতের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করার এখনই সময়।