পোশাক কারখানা নারী শ্রমিকদের মৃত্যুফাঁদ
রতন কুমার তুরী , শুক্রবার, মার্চ ০৮, ২০১৩


দেশের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি পোশাক কারখানায় ৪০ লাখ শ্রমিকের ৭০ ভাগই নারী শ্রমিক। ফলে পোশাক কারখানার যে কোন দুর্ঘটনায় নারী শ্রমিকরাই প্রাণ হারায় বেশি। পোশাক কারখানার মালিকদের অবহেলার কারণে কারখানার অবকাঠামো সঠিকভাবে গড়ে না উঠা, দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকদের জরুরি বহিঃগমন পথ না থাকা, দুর্ঘটনার সময় নারী শ্রমিকরা আতংকিত না হয়ে কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে সে বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান না থাকা, কিছু গার্মেন্টেসের ছোট ছোট কোঠরিতে অধিক সংখ্যক নারী শ্রমিকদের কর্মকালীন সময়ে অবস্থান ইত্যাদি বহুবিধ কারণে নারী শ্রমিকদের জীবন আজ ঝুঁকির মধ্যে অতিবাহিত হচ্ছে। দুর্ঘটনার ফলে নারী শ্রমিকদের স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ায় বহিঃবিশ্বে পোশাক ক্রেতা দেশগুলোও ব্যাপারটি ভাল চোখে দেখছে না। এতে করে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উপর আঘাত আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গত বছর বেশ কিছু পোশাক কারখানায় অগ্নিকান্ডের মত ঘটনায় ব্যাপক সংখ্যক নারী শ্রমিক নিহত হওয়ায় বাংলাদেশসহ বহিঃবিশ্বে গার্মেন্টেসে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইতিমধ্যে অনেকেই সুযোগ সুবিধাবিহীন গার্মেন্টসগুলোকে নারী শ্রমিকদের মৃত্যুফাঁদ হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রকৃত পক্ষে- বাংলাদেশের পোশাক শিল্প কারখানাসমূহে পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে নারী শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেশি। মূলত গ্রামের সহজ সরল মেয়েরা দু’বেলা অন্ন মুখে দেয়ার জন্য গার্মেন্টসমুখী হয়। তাদের ঘামে ঝরা শ্রমে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিশ্বের কাছে পরিচিতি পেলেও সেসব নারী শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা দেখার জন্য যেন কেউ নেই। অথচ বাংলাদেশ এ শিল্প থেকে প্রতিবছর ৫ থেকে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। প্রকৃত পক্ষে- মালিক পক্ষ পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের কাছ থেকে অধিক পরিমাণে শ্রম আদায় করে নিলেও এদের শ্রমের বিনিময়ে অল্পই মজুরি দেয়, তারপরও তারা কারখানাকে কর্মবান্ধব করে গড়ে তোলার প্রতি যত্নবান হন না। কারখানার পরিবেশ কর্মবান্ধব করতে সবসময় উদাসীন কারখানা মালিকরা, এতে করে পোশাক কারখানাগুলোতে ঘনঘন অগ্নিকান্ড ঘটে চলেছে।


আর এই অগ্নিকান্ডের মরণফাঁদে পড়ে নারী শ্রমিকরাই বেশি মৃত্যুবরণ করছে। পোশাক কারখানায় অগ্নিকান্ড বা যে কোন দুর্ঘটনা ঘটার পর দেশে বেশ কয়েকদিন চেঁচামেচি চললেও তারপরও আমরা সব কিছু ভুলে যাই। এমনকি দুর্ঘটনায় নিহত পোশাক শ্রমিকদের আমরা আর মনেও রাখি না। এ বিষয়ে সরকারি পদক্ষেপ সম্প্রতি গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকান্ড এবং হতাহতদের ক্ষতিপূরণ বিষয়ে বিজিএমই-এর সাথে শ্রমমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, যেসব কারখানায় বহিঃনির্গমনের সুযোগ কম এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত নীতি অনুসরণ করে গড়ে উঠেনি সেসব কারখানা শর্তপূরণ না হওয়া পর্যন্ত আপাততঃ বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে কারখানা চালু অবস্থায় কখনো কারখানার প্রধান কর্তৃক বন্ধ রাখা যাবে না। এ বিষয়ে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। তাছাড়া ক্ষতিগ্রস্থদের সরকার এবং বিজিএমই-র পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এমনকি প্রয়োজনে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের কাউকে চাকরি দেয়ার ব্যাপারেও বিজিএমই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উদ্বেগের কথা গার্মেন্টেসে অগ্রিকান্ডের পর তদন্তসমূহে অগ্রিকান্ডের সময় কারখানাগুলোকে জরুরি বহিঃনির্গমনের পথগুলো বন্ধ থাকার বিষয়টি বার বার গুরুত্ব সহকারে উঠে আসলেও বর্তমানে গার্মেন্টসগুলো কারখানা চলাকালীন সময়ে শ্রমিকদের জন্য জরুরি বহিঃনির্গমন পথ খোলা রাখছে কিনা তা দেখার কোন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে একই ঘটনা বার বার ঘটতে দেখা যাচ্ছে।


প্রকৃতপক্ষে- পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকরা দিবা-রাত্রি তাদের কঠিন শ্রম দিয়ে দেশের অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও কর্মক্ষেত্রে এ নারীদের অধিকার ও দাবি-দাওয়া আদায়ে এগ্রিয়ে আসছে না সরকার, গার্মেন্টস মালিক এবং পোশাক শিল্প সংগঠনগুলো। এ বিষয়ে নারী শ্রমিকদের প্রথমেই এগিয়ে আসা উচিত। তাদের বলিষ্ঠ দাবিই পারে পোশাক কারখানা মৃত্যুফাঁদ থেকে তাদের রক্ষা করতে।