এই যুদ্ধ সেই যুদ্ধ
অনুষ্টুপ , শুক্রবার, মার্চ ০৮, ২০১৩


বলতে বলতেই দানব স্বরূপে হাজির। গত লেখাতেই লিখেছিলাম ‘সম্মুখ সমরের ডাক’। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছিলাম সবাইকে। সেই যুদ্ধটা শুরু হয়ে গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির রায় হওয়ার পরপরই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক মানুষ মারা গেছে। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, তারা দেখে ফেলছে জামায়াতের নৃশংসতা। আর যারা দেখেছে, তারা পুরনো দিনগুলোতে ফিরে গেছে। কী হিংস্র কী বর্বর একটা দল জামায়াত; দেশবাসী রুদ্ধশ্বাসে দেখছে। ৭১ এ এই জানোয়ারদের সঙ্গে লক্ষাধিক পাকিস্তানি সশস্ত্র যোদ্ধা ছিল। তাহলে বুঝুন তখন তাদের নৃশংসতা কি পর্যায়ে ছিল। কী কাকতাল, সেই নৃশংসতার বিচার ঠেকাতে তাদের আজকের নৃশংসতা! ৪২ বছর আগের মুক্তিযুদ্ধ ও আজকের মুক্তিযুদ্ধের একটা তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরার জন্য এই লেখা। এর আগে একটু অন্যপ্রসঙ্গে ঘুরে আসি। এতোদিন দেশের প্রধান বিরোধীদল শাহবাগ আন্দোলনের ব্যাপারে ‘যদি তবে কিন্তু’ অবস্থানে ছিল। এবার তারা তাদের অবস্থান খোলাসা করে ফেলেছে। সরাসরি জামায়াতের পক্ষ নিয়ে বিএনপি তার প্রধান বিরোধীদলের অবস্থান জামায়াতের হাতে তুলে দিয়েছে। দেশ এখন জামায়াত আওয়ামীলীগের হেড টু হেড ফাইটে।
গত পয়লা মার্চ বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া রাজধানীর গুলশানের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তার দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করেন। জামায়াতের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে আজ মঙ্গলবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ঘোষণা দেন। তবে এই সংবাদ সম্মেলনে বেগম জিয়ার অগ্নিমূর্তি দেখে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। অনেকেই ধন্ধে পড়ে যান এই কি বীরমুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়ার পত্নী। তিনি দেশব্যাপি জামায়াতের চালানো নৈরাজ্যকে সরকারের পৈশাচিক ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। একজন মাধ্যমিক অনুত্তীর্ণ মহিলা এর চেয়ে বেশি আর কি বলবেন। তার তো গণহত্যা সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই। ৭১ এ ছিলেন সেনানিবাসে। আর বই ঘেঁটেও দেখেননি গণহত্যা শব্দটির মানে কি।
যারা দল বেধে থানায় আক্রমণ করে, পুলিশের দিকে বোমাগুলি ছুড়ে তাদের মৃত্যু গণহত্যা হয় না। এটার একটা আধুনিক নাম দিয়েছে র‌্যাব- ক্রসফায়ার। গণহত্যা হয় নিরস্ত্র মানুষের ওপর একতরফা আক্রমণ করে যখন তাদের নিধন করা হয়। এছাড়া তিনি বলেছেন, জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার হীন উদ্দেশ্যে সরকার ইতিমধ্যে পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আক্রমণ চালিয়ে দেশে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংসের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। যারা ভিক্টিম তারাই যখন বলছে জামায়াতের লোকরা আক্রমণ চালিয়েছে, তখন বিএনপির এই ধরণের কথা বলার কী মানে! বিএনপি বড়ো দল। তার তো কারো লেজুড়বৃত্তির প্রয়োজন নেই।
এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। দেখবেন জামায়াতের নাশকতার মূল লক্ষ্য বস্তু হচ্ছে পুলিশ। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বামনডাঙ্গা পুলিশ ফাঁড়িতে তাণ্ডব চালিয়ে তিন পুলিশ কনস্টেবলকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ফাঁড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। লোহাগাড়ায় এক পুলিশকে কুপিয়ে হত্যা করার পর তার মাথায় খন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছে। আরো ১৯ জনকে ভবনে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়েছিল। সময়মতো উদ্ধারকারী দল আসায় তারা বেঁচে যান।
জামায়াত তথা পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা বরাবরই পুলিশের ওপর রুষ্ট। ৭১ সালে অপারেশন সার্চলাইট শুরুই হয়েছিল রাজারবাগকে দিয়ে। প্রথম প্রতিরোধের বুলেটটি এসেছিল পুলিশের মরচে পড়া পুরনো থ্রি নট থ্রি রাইফেল থেকে। জামায়াত নিশ্চয়ই তা ভুলে যায়নি। তাই এবারও সব রাগ ঝারছে তারা পুলিশের ওপর।
আমরা পুলিশকে যতই গালমন্দ করি না কেন এটা একটি সিভিল ফোর্স। জাতীয় সংকটময় মুহূর্তে পুলিশ সবসময় জনগণের পাশে এসে দাঁড়ায়। যে পুলিশ ৬৯-৭০ এ লাঠিচার্জ করেছে আমজনতার উপর, সেই পুলিশ ৭১ এ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। তাই জামায়াত পুলিশকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়ার মতলবে নেমেছে।
এখন বেশি হত্যাকান্ড সংঘটিত হচ্ছে পুলিশের ওপর হামলা চালাতে গিয়ে। উপজেলা পর্যায়ে একটা থানাতে ২০-২৫ জন পুলিশ থাকে। এই পুলিশের ওপর হাজার হাজার মানুষ যখন লাঠিসোঁটা আর দেশি অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন পুলিশের গুলি ছোঁড়া ছাড়া আর কি করার থাকে।
জামায়াতের দ্বিতীয় লক্ষ বস্তু হলো সাংবাদিক ও ব্লগার তথা লেখকরা। এই সহিংসতায় পুলিশের পরই যদি কোন পেশাজীবীদের নাম আসে তাহলে সেটা সাংবাদিক। একাত্তরে তারা যেমন বিবেকবান মানুষের সমর্থন পায়নি, এতো রঙ পাল্টানোর পরও ২০১৩ তে এসেও তারা ব্যর্থ। একবারেই তাদের পয়সায় করা কিছু পত্রপত্রিকা আর টিভি চ্যানেল বাদে কেউ জামায়াতকে আস্কারা দিচ্ছে না। বলা হচ্ছে সরকারের চোখ রাঙানিতে তটস্ত মিডিয়া। যে মিডিয়া বিডিআর বিদ্রোহ থেকে শুরু করে হলমার্ক সব নিয়ে সরকারকে কাবু করে ছেড়েছে সেই মিডিয়া ভয়ে থরথর হবে সেটা কতটা যৌক্তিক। সরকারের শেষ সময়গুলোতে বরং মিডিয়া আরো নির্ভীক হয়ে ওঠে। তারা মিডিয়াকে ছলনায় ভুলাতে না পেরে চড়াও হয়েছে। হয়ত আরেকটা ১৪ ডিসম্বরের ছক কাটা হচ্ছে।
একাত্তরে পাকিস্তানিদের প্রধান হাতিয়ার ছিল ধর্মের সুরসুরানি। গত লেখায় আমি আশংকা করেছিলাম মহানবীর নামে কটূক্তির যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা তাদেরই তৈরি। বলতে না বলতে তাও সত্য প্রমাণিত হয়েছে। রাজিবের নূরানি চাপা নামের যে লেখার জন্য ২২ ফেব্রুয়ারি তাণ্ডব হয়ে গেলো, পরে জানা যায় তা আসলে রাজিবের লেখা নয়। জামায়াতের সংগঠন শিবিরের ছেলেরাই এটা করেছে। আরো মজার ব্যাপার জানা গেলো রাজিবের ধৃত ৫ হত্যাকারীর কাছ থেকে। এরা স্বীকার করেছে তারা শিবিরের হয়ে এই কাজ করেছে। তারার হত্যার একমাস আগে থেকেই পরিকল্পনা আঁটছিল। অর্থাৎ শাহবাগ আন্দোলন শুরুর আগেই তারা হত্যার মিশনে নেমেছিল।
জামায়াত প্রথম থেকেই দেখছে তাদের ছলচাতুরি কাজ দিচ্ছে না। জনগণ যুদ্ধাপরাধী বিচারের পক্ষে। শাহবাগে একডাকে লাখ মানুষ জড়ো হয়ে যাচ্ছে। এই জনগণকে ফুসলিয়ে দলে আনা যাবে না, বরং ভয় ঢুকিয়ে দিলে পিছু হটবে। তাই দেখবেন তাদের সহিংসতার নীরব লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে জনগণ। ফেনিতে রেললাইনের ফিসপ্লেট সরিয়ে নেয়ায় মহানগর গোধূলীর ৬ টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। ভাগ্যিস বড়ো ধরণের কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। আচ্ছা এই ট্রেনে কি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা ছিলেন? না সরকারের নীতিনির্ধারকরা ছিলেন? না শাহবাগের আন্দোলনকারীরা? এই ট্রেনে বড়ো ধরণের কোন দুর্ঘটনা ঘটলে কি জামায়াতের একজন ভোটারও মারা যেত না, তার কোন গ্যারেন্টি তারা দিতে পারে?
একই ঘটনা ঘটছে কক্সবাজারের পথে। কোন হরতাল নেই, অবরোধ নেই কিন্তু দেদারসে গাড়ি ভাঙা হচ্ছে। কক্সবাজারে বিদেশি পর্যটকরা গিয়ে থানায় আশ্রয় প্রার্থনা করছে। এই পর্যটক এই গাড়ি কি ভূমিকা রেখেছিল সাঈদীর রায়ের ব্যাপারে, সেই প্রশ্ন এখন জনগণের।
জামায়েতের আরেকটা টার্গেট হলো সংখ্যালঘুরা। এটা তাদের অভ্যাসবশত ক্রিয়া। ৭১ এ করেছে, ৯০ এ করেছে, ৯৬ এ করেছে, ২০০১ এ করেছে। এটা নিয়ে আসলে আমি মন্তব্য করতে চাই না। এরা যে আক্রান্ত হবে রায়ের আগে সবার আলোচনায় তা ছিল। সরকার এটাকে কেন গ্রাহ্যকরল না, সেই কৈফিয়ৎ একদিন ইতিহাসকে দিতে হবে।
যে দল একটা মানুষের জন্য এমন তাণ্ডব করতে পারে সেই দল তো হিটলারের নাৎসি কিংবা মুসোলিনের ফ্যাসিস্টদের থেকে কম নয়। অনেকেই এদের মৃত্যু নিয়ে মায়াকান্না করেন। আচ্ছা গত ৫ দিনের তাণ্ডবে এমনকি একটাও নজির আছে পুলিশ বা সরকারি দলের লোক জামায়েত বা বিএনপির কোন কর্মীর গৃহে গিয়ে আক্রমণ করেছে। তাদের হত্যা করেছে। বরং উল্টোটা ঘটেছে। সরকারি দলের লোকজনের বাড়িতে আক্রমণ করে তাদের হত্যা করা হয়েছে। এমনকি বগুড়ায় সরকারি দলের জেলা সভাপতির বাসায় আক্রমণ করা হয়েছে! ২০০১ এর কথা কি আমরা ভুলে গেছি। সেই সব দিনগুলো স্মরণ করলে তো বলতে হয় সরকার এখন চূড়ান্ত সহনশীলতার পরিচয় দিচ্ছে।
যতগুলো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তার বেশির ভাগ পুলিশের থানা-ফাঁড়ি আক্রমণ করতে গিয়ে। যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র আক্রমণ করতে যায়, তারা কি এমন ভদ্দরলোক। তাদের মৃত্যু নিয়ে আমরা কেন মাথা ঘামাবো ? আদালতের ফয়সালা আদালতে হবে। এটা নিয়ে মাঠে কি?
শিবির-জামায়েত তো একটা পেশাদার খুনিদের দল। অন্য এলাকার মানুষের কথা বাদ দেই, চট্টগ্রামের লোকদের শিবির-জামায়েতের নৃশংসতার কথা মনে করিয়ে দেয়ার তো কিছু নেই। ৭১ অনেক আগের কথা। আমরা তরুণ প্রজন্ম তা দেখিনি। কিন্তু তবারককে কুপিয়ে হত্যা, পরীক্ষার আগের রাতে শাহদাতকে নিজ রুমে জবাই করা, হামিদের কাটা কব্জি নিয়ে মিছিল কিংবা এইট মার্ডার এগুলো তো আমরা দেখেছি। এসব দেখার পর কিভাবে শিবিরের প্রতি অনুকম্পা দেখাই।
একদল ডাকাত যদি পুলিশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের সঙ্গীকে উদ্ধারের জন্য তখন পুলিশ যদি তার দায়িত্বের খাতিরে গুলি ছুঁড়ে, তাতে কতজন ডাকাত মারা যায়- সেটা নিয়ে তো আফসোসের কিছু নেই। বরং সংখ্যা যত বেশি হয় পুলিশ তত প্রশংসিত হয়। মানবাধিকার আছে দস্যুাধিকার নেই। যারা গণহত্যা চালায়, যারা রগ কাটে, যারা ধর্মালয়ে আগুন দেয়, যারা চাপাতির চর্চা করে তাদের কোন অধিকার নেই। আইন আইনের গতিতে চলবে। এ নিয়ে কথা বলার অধিকার কারো নেই। তাই এখন মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিচলিত না হয়ে পুলিশের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের পবিত্র কর্তব্য।
তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য নৈরাজ্য। একাত্তর টিভিতে গেলো শনিবার গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য দিয়েছেন ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত। সাঈদীর রায় হবার পর কোর্টের হট্টগোলের মধ্যে তাকে নাকি আশ্বস্ত করে বলা হচ্ছিল, ’দেশে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি করা হবে যে এই সরকারও থাকবে না আর তাকেও (সাঈদীকে) সাজা ভোগ করতে হবে না’! এই লক্ষ্য নিয়েই তারা এখন মাঠে নেমেছে। তারা লাশের পরিমাণ বাড়াতে চায়। তা যে ভাবেই হোক। এজন্য তারা ট্রেনের কোচে আগুন দিচ্ছে, পাওয়ার স্টেশন পুড়িয়ে দিচ্ছে, পুলিশকে গুলি করতে বাধ্য করছে।
বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছে ঢাকাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এই আন্দোলনের উত্তাপ নেই ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো শহরে। কোথাকার কোন সুন্দরগঞ্জ কোন কোটচাঁদপুরে আন্দোলনের আগুন জ্বলছে। পাখির মতো মানুষ মরছে। কিন্তু ঢাকায় কিচ্ছু নেই। কারণ ঢাকায় তারা ধর্মের সুরসুরানি দিয়ে, চাঁদে সাঈদীর মুখ দেখা যাওয়ার আষাঢ়ী গল্প শুনিয়ে মানুষকে পথে নামাতে পারবে না। আর ঢাকা-চট্টগ্রামের মানুষও এতো বেকুব না একটা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর জন্য বুলেটের সামনে বুক পেতে দেবে। তারা যেনতেন ভাবে লাশ ফেলাতে চায়। যত লাশ পড়বে তত সরকারের ভিত নরম হবে। এখন আপনার ভূমিকা কি হবে আপনি বুঝে নিন।