অতুলনীয় সুনীল ও হুমায়ূন
টোকিও -এইদেশ, সংগ্রহ , শুক্রবার, মার্চ ০৮, ২০১৩


হুমায়ূন আহমেদই বাংলাদেশের গণমানুষকে বই পড়া শিখিয়েছিলেন। কলকাতার গদ্যসাহিত্যের একচ্ছত্রাধিপত্যের বিপক্ষে তিনি একাই যেন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন। বাংলাদেশের মানুষ হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়েই আত্মচেতনা ও স্বরূপ উপলব্ধি করতে শিখেছে। হুমায়ূন আহমেদের লেখনীতে এমন অসাধারণ যাদু ও কৌশল ছিল, যার মাধ্যমে তিনি অতি সহজেই পাঠকের মনে প্রবেশ করতে পারতেন।

বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই বাংলা সাহিত্যের আরেক দিকপাল ও কিংবদন্তি কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মহাপ্রয়াণ ঘটে। হুমায়ূন আহমেদ মারা যাওয়ার পর সুনীল বলেছিলেন, জনপ্রিয়তার দিক থেকে হুমায়ূন আহমেদ শরৎচন্দ্রকেও ছাড়িয়ে গেছেন। সুনীল কি জানতেন তিনি এত তাড়াতাড়ি হুমায়ূন আহমেদের পথ ধরবেন? তাঁদের দুজনের মধ্যেও প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল, তাই হয়ত বন্ধুর কাছে তিনি চলে যেতে চেয়েছিলেন। এই দুই বরেণ্য সাহিত্যিকের চলে যাওয়া বাংলা সাহিত্যকে সত্যিই শূন্য করে দিয়েছে। যে শূন্যতা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তবে এটা ঠিক যে, তাঁরা দুজন পরিণত সময়েই অন্তিম যাত্রা করেছেন। বাংলা সাহিত্যের সবুজ-শ্যামল জমিনকে সোনার ফসলে ভরপুর করে দিয়ে গেছেন। হুমায়ূন আহমেদই বাংলাদেশের গণমানুষকে বই পড়া শিখিয়েছিলেন। কলকাতার গদ্যসাহিত্যের একচ্ছত্রাধিপত্যের বিপক্ষে তিনি একাই যেন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন। বাংলাদেশের মানুষ হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়েই আত্মচেতনা ও স্বরূপ উপলব্ধি করতে শিখেছে। হুমায়ূন আহমেদের লেখনীতে এমন অসাধারণ যাদু ও কৌশল ছিল, যার মাধ্যমে তিনি অতি সহজেই পাঠকের মনে প্রবেশ করতে পারতেন। অথচ সেই হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর সংবাদ কলকাতার পত্রপত্রিকা ও মিডিয়াপাড়ায় অসৌজন্যমূলকভাবে তেমন গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয়নি। অতি সচেতনভাবেই যে সেটি করা হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর খবর শুধু গুরুত্বপূর্ণভাবেই নয়, হাই প্রোফাইলিং করা হয়েছে। এতে দোষের কিছু নেই। তবে আমরা ওদেরকে বুঝিয়ে দিলাম যে, প্রতিবেশীর সঙ্গে আমরা সাম্প্রদায়িকতা ও প্রতিহিংসার পরিবর্তে উদারনৈতিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেই বেশি আগ্রহবোধ করি। প্রতিবেশী বন্ধুকে যথার্থ শ্রদ্ধা ও মর্যাদা দিতে আমরা মোটেও কার্পণ্যবোধ করি না। আর তাছাড়া সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলাদেশের অকপট বন্ধু ছিলেন। বিগত ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় সুনীল বলেছিলেন, বাংলাদেশ যা চায় তা-ই দিয়ে দেওয়া হোক। প্রকৃত বন্ধুর ব্যবহার ও আচরণ তো এমনই মধুর ও শিষ্ট হয়। হুমায়ূন আহমেদসহ বাংলাদেশের অনেক কবি ও সাহিত্যিকের সাথে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সুসম্পর্ক ছিল।

যাই হোক, এবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যজীবন নিয়ে কিছু বলি। কবিতার বাইরে কখনো অমরত্ব চাননি সুনীল। তাঁর বন্ধুত্বের পরিধি যেমন ছিল বিশাল, লিখিত গ্রন্থও প্রায় তিন শতাধিক। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের পর সুনীলই ছিলেন অসাধারণ ও বৈচিত্র্যময় প্রতিভার অধিকারী এবং সব্যসাচী লেখক। যদিও কবি হওয়াই একান্ত বাসনা ছিল তাঁর, কিন্তু নিজের গদ্যসত্তার কাছে চাপা পড়ে গিয়েছিলেন ‘কবি সুনীল’। তাঁর গদ্যসত্তা এতই প্রভাবশালী যে, সেটার সমকক্ষ হওয়াও অনেকের পক্ষে কার্যত অসম্ভব। তাঁর কবিসত্তাও কম প্রতাপশালী ছিল যে তা নয়, তবে তাঁর কবিসত্তার চেয়েও ক্রমে প্রধান ও প্রণিধানযোগ্য হয়ে উঠেছিল তাঁর গদ্যসত্তা।

প্রতিষ্ঠানবিরোধী সুনীল কিন্তু শেষপর্যন্ত নিজেই হয়ে উঠেছিলেন একটা প্রতিষ্ঠান। কলকাতার উদ্দাম যৌবনকালে শক্তি-সুনীল-সন্দীপনরাই তো শাসন করে গিয়েছেন। সাহিত্যের সব শাখাতেই তিনি ছিলেন সাবলীল। ১৯৬০-এ ‘আত্মপ্রকাশ’ দিয়েই তাঁর উপন্যাসের সূচনা। তাঁর ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’, ‘রাণুভানু’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’ যেমন স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তেমনি আবার অনেক আবোল-তাবোল লেখাও লিখেছেন প্রচুর। বেশি লিখলে হয়ত এমন হয়।

বুদ্ধদেব বসুর মতো প্রথম দিকে তিনি ছিলেন ঘোর ‘রবীন্দ্র-বিরোধী’, আবার পরে অক্লান্ত রবীন্দ্র-অনুরাগী। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন, মনে হয় যেন একজন পূর্বসূরি আর অন্যজন উত্তরসূরি। রবীন্দ্রনাথের কোনো কবিতাই পছন্দের ছিল না সুনীলের; বরং তুলনায় ছোটগল্পগুলোকে বলতেন মন্দের ভালো। এ ধরনের বিরোধিতার নজির তো সব কালেই দেখা যায়, বুদ্ধদেব বসুর কবিতাকে অপাঠ্য বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তেমনি বুদ্ধদেব বসু সুনীলের কবিতাকে বলেছিলেন দুর্বোধ্য। উগ্র বিরোধিতাই পরবর্তীকালে মোড় নেয় অনুরাগে। সুনীলও ক্রমে হয়ে ওঠেন রবি-অনুরাগী। রবিগানের প্রেমিক। রবীন্দ্রনাথের কবিতা অপছন্দ হলেও গান ভালবাসতেন, আপন মনেও গাইতেন।

জীবনানন্দের ‘বনলতা’ আর সুনীলের ছিল ‘নীরা’। ভালোবাসার মানুষ চলে গেলেও এদের কিন্তু বয়স বাড়ে না, তারা অনন্ত যৌবনা। জীবনানন্দ দাশ বনলতার আংশিক উৎসের সন্ধান দিলেও সুনীলের নীরা কিন্তু অ্যাবস্ট্রাক্ট। সুনীল কিন্তু তাঁর যৌবনে একদল লেখককে নিয়ে একটা বৃত্ত তৈরি করেছিলেন। যাঁরা ছিলেন ‘কৃত্তিবাস’-এর অশ্বারোহী। শক্তি-শরৎ-তারাপদ-সন্দীপন-আনন্দ বাগচীসহ এই কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর মধ্যমণি ছিলেন সুনীল। কৃত্তিবাসে ছাপা হতো তরুণ কবিদের কবিতা এবং প্রবীণদের গদ্য। নিঃসন্দেহে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় খুব খোলা মনের সাহসী কবি। দিলখোলা, পরিশ্রমী ও আড্ডাবাজ ছিলেন তিনি। তাঁর ‘তিন জোড়া লাথির ঘায়ে রবীন্দ্র রচনাবলী লুটোয় পাপোষে’ পঙক্তি নিয়ে একসময় খুব হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। আসলে তিন বন্ধু শুয়েছিল খাটে, ঘুমন্ত তিনজনের পায়ের আঘাতে রবীন্দ্র রচনাবলীই পড়ে গিয়েছিল মাটিতে। অথচ তিনিই শেষ বয়সে লিখেছেন, ‘কয়েকদিন ধরে মনটা ভারি আনন্দে ভরে আছে। শুধু রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ছি’। অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে তাঁর ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে পরিচয় ঘটেছিল। তখন তরুণ কবিদের সর্দার সুনীল। হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে যুক্ত। শৈলেশ্বর ঘোষ, মলয় রায়চৌধুরী, সমীর রায়চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরীসহ অনেক তরুণই ওই আন্দোলনের পথিক। ‘হাউল’ দিয়ে জগৎসংসার মাতিয়ে গিন্সবার্গ তখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন কলকাতা-বারানসী, মিলেমিশে গিয়েছেন ‘কৃত্তিবাস’-এর কবিদলের সঙ্গে। অ্যালেনের মূলভাষ্য ছিল, যা কিছু তুমি অনুভব করো তাকে ঠিকঠাক বলে যাওয়াটাই হলো কবিতার কাজÑ যেখানে ধরা পড়বে তুমি ঠিক কেমন। ‘একা এবং কয়েকজন’-এর কবি সুনীল তাই হয়ে উঠলেন ‘আমি কী রকম বেঁচে আছি’-র কাহিনিকার। সুনীলের কবিতা তাঁর বেঁচে থাকার যেন ধারাভাষ্য। তিনি কি বামপন্থী, নাস্তিক নাকি হাংরিÑএসব বাহ্য বিষয়; কিন্তু তাঁর কবিতা আর কিছু নয়, তাঁরই আত্মস্বীকারোক্তি। এটাই স্বাভাবিক। তাঁর এই বেঁচে থাকা তো একার বেঁচে থাকা নয়, চারপাশের মানুষজন এবং চারপাশের পৃথিবীকে নিয়েই বেঁচে থাকা। ঘুরেছেন দেশ-বিদেশ। আমেরিকার ‘আইওয়া’ শহরে এক বছর প্রবাসজীবন কাটিয়ে যখন ফিরে এসেছেন তখন গাঢ় পরিচয় ঘটেছে সমসাময়িক বিশ্ব কবিতার সঙ্গে। অনুবাদ গ্রন্থ বের হয়েছে ‘অন্যদেশের কবিতা’। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পল এঙ্গেলের আমন্ত্রণে আন্তর্জাতিক লেখক কর্মশালায় যোগ দিয়েছিলেন সুনীল। তখনই সালভাদর দালির সঙ্গে পরিচয় তাঁর। ফেরার পথে ব্রিটিশ সরকারের আমন্ত্রণে বিলেত। স্টিফেন স্পেন্ডার এবং টি এস এলিয়টের সঙ্গে পরিচয়, ফরাসি বান্ধবী মার্গারেটের সঙ্গে প্যারিস ভ্রমণ। লিরিকের পথে নয়Ñ গদ্যপন্থায়, কখনো কাহিনী কখনো নাটকীয়তায় চলেছে তাঁর কবিতা। তিনি চিহ্নিত হয়ে উঠেছিলেন ব্যক্তিকেন্দ্রিক, রবীন্দ্রবিদ্বেষী ও অতিযৌনকাতর কবি হিসেবে। ক্ষুৎকাতর কবিগোষ্ঠীর সঙ্গে পরে তাঁর অনেকটা যেন স্বার্থপর দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। যৌনতা তাঁর কবিতার প্রধান ভরকেন্দ্র হলেও তাঁর কবিতায় নিবিড়ভাবে তাকালে ভেসে ওঠে এক আর্ত-মুখচ্ছবি। সুনীলের কবিতার ছত্রে ছত্রে তো ভালবাসার কথাই ছড়ানো। অর্থাৎ ‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি’। আসলে তাঁর বিদ্রোহ তো রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে নয়, ছিল তথাকথিত রাবীন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে। মধ্যবিত্তসুলভ কূপম-ুকতা তাঁর মধ্যে বিরল। জাহাজের খালাসি হওয়ার স্বপ্ন ছিল ছোটবেলায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিণত মননের নীললোহিতকে আমরা পেয়েছি। যিনি ছিলেন দিকশূন্যপুরের যাত্রী। বইপড়ার নেশা তাকে ধরিয়েছিলেন মা, মীরা দেবী।

ডি-কের পরামর্শ ও সহযোগিতায় যখন সুনীল সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ (শ্রাবণ ১৩৬০) প্রকাশিত হয়, কলকাতার রাজনৈতিক আবহাওয়া তখন উত্তাল। কৃত্তিবাসের তরুণ ব্রিগেডই তখন দাপিয়ে বেড়াতো মধ্যরাতের কলকাতায়। ওই তরুণ কবিদের বহু পঙক্তি তখন যেন প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’। এরপর বের হয় ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, প্রতিদ্বন্দ্বী’। আশির দশকে লেখা বৃহৎ উপন্যাস ‘সেই সময়’। ক্রমান্বয়ে ‘পূর্ব পশ্চিম’ থেকে ‘প্রথম আলো’। তাঁর ভাষা সুখপাঠ্য, ঘরোয়া, কথনভঙ্গি জনপ্রিয়। কবিতা এবং গদ্যের ভাষায় ছিল নিখাদ তফাত। কবিতার জন্য তিনিই পারেন অমরত্বকে তাচ্ছিল্য করতে। তাঁর লেখা কালের রাখাল হবে কি-না তিনি ভাবতেন না, সমকালের পাঠক যদি পড়ে আনন্দ পায় ও ভাবে, তাহলেই তিনি খুশি। তিনটি ছদ্মনামের আড়ালে তিনি বিচিত্র স্বাদেরÑ নীললোহিত, নীল উপাধ্যায় ও সনাতন পাঠক। বাংলাদেশে হুমায়ূন আহমেদের তুলনা যেমন হুমায়ূন আহমেদ নিজেই, তেমনি ওপার বাংলাতেও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের তুলনা সুনীল নিজেই।