পুলিশের কর্তব্য পালনে বাধাদান এবং পুলিশ কর্তৃক নির্যাতন দু’টোই বে-আইনী
এ.এম জিয়া হাবীব আহসান , শুক্রবার, মার্চ ০৮, ২০১৩


যিনি গ্রেপ্তার করবেন তিনি বিচার করবেন না। তিনি আদালতের নিকট অভিযুক্তকে সোপর্দ করবেন। গ্রেপ্তারকারী (পুলিশ/র‌্যাব) কোন অভিযুক্তকে নির্যাতন করলে তিনিও আইনের আওতায় আসবেন। অপরদিকে, সরকারী কর্মচারীকে তার কর্তব্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। সরকারী কর্মচারী কর্তৃক কৃত বা উদ্যোগ গৃহীত কোন কাজের জন্য তাকে আক্রমণ বা তার উপর বলপ্রয়োগ করলে দন্ডবিধির ৩৫৩ ধারায় অপরাধ হয়। দন্ডবিধির ৩৫৩ ধারা হলো, সরকারী কর্মচারীকে তার কর্তব্য পালনে বাধাদানের নিমিত্ত আক্রমণ ও অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ এ ধারায় বলা হয়েছে। যে ব্যক্তি, কোন সরকারী কর্মচারীকে অনুরূপ সরকারি কর্মচারী হিসেবে তার কর্তব্য সম্পাদনের ব্যাপারে, অথবা উক্ত ব্যক্তিকে অনুরূপ সরকারী কর্মচারী হিসেবে তার কর্তব্য পালন হতে বিরত করার বা বাধা প্রদান করার অভিপ্রায়ে অথবা অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক অনুরূপ সরকারি কর্মচারী হিসেবে কৃত বা করার জন্যে উদ্যোগী কোন কিছুর কারণে তাকে আক্রমণ করে বা তার প্রতি বলপ্রয়োগ করে, সেই ব্যক্তি যে কোন বর্ণনার কারাদন্ডে-যার মেয়াদ তিন বৎসর পর্যন্ত হতে পারে, অথবা অর্থদন্ডে বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হইবে। এ ধারায় দুইটি মূল উপাদান রয়েছে:-
(১) আক্রমণ বা বলপ্রয়োগ থাকতে হবে। (২)এটা কোন সরকারী কর্মচারীর বিরুদ্ধে নিক্ষিপ্ত হবে। উক্ত সরকারি কর্মচারীকে আরো প্রমাণ করতে হবে যে, আক্রান্ত হওয়ার সময় তিনি সরকারি কর্মচারীরূপে কাজ করছিলেন অথবা তাকে তার কর্তব্য পালনে বাধা দেওয়ার জন্য আক্রমণ করা হয়েছিল। সরকারী কর্মচারীকে তার কর্তব্য পালনে বাধাদান করার জন্য স্বেচ্ছাকৃতভাবে আঘাতদান করা দন্ডবিধির ৩৩২ ও ৩৩৩ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দন্ডবিধির ৩৩২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘সরকারী কর্মচারীকে তাহার কর্তব্য পালনে বাধাদান করার জন্য স্বেচ্ছাকৃতভাবে আঘাত প্রদান করলে সেই ব্যক্তি যে কোন বর্ণনার কারাদন্ডে যার মেয়াদ তিন বৎসর পর্যন্ত হইতে পারে বা অর্থদন্ডে বা উভয়বিধ দন্ডে দন্ডিত হইতে পারে।’’
দন্ডবিধির ৩৩৩ ধারায় সরকারী কর্মচারীকে গুরুতর আঘাত প্রদান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারী কর্মচারীকে কর্তব্য কাজে বাধাদান করার জন্য স্বেচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর আঘাত প্রদান করলে আঘাত প্রদানকারী ব্যক্তি যে কোন বর্ণনার কারাদন্ডে যার মেয়াদ দশ বৎসর পর্যন্ত হতে পারে এবং অর্থদন্ডও হতে পারে। উপরোক্ত ধারায় অপরাধ আমলযোগ্য বিধায় পুলিশ অপরাধকারী ব্যক্তিকে ফৌজদারী কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৫৪, ৫৫, ৫৭ এবং ১৫১ ধারা মতে বিনাপরোয়ানায় অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারে। ফৌজদারী কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৬১ ধারা মতে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেট- এর নিকট হাজির করতে হয়। কিন্তু তার পরিবর্তে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে নির্যাতন চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। বাস্তবিক অর্থে কতজন মানুষ নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া মুশকিল। নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা মর্যাদাহানিকর আচরণ বা শাস্তির বিরুদ্ধে ১৯৮৪ সালে ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত মতে গঠিত কনভেনশনের ধারা ১-এ ‘নির্যাতন’ শব্দটি সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ‘নির্যাতন’ শব্দটির অর্থ যে কোন কাজ যা দৈহিক বা মানসিক ব্যথা বা দুর্ভোগ বৃদ্ধি করে এবং যা অন্য কোন মানুষ বা তৃতীয় কারো কাছ থেকে কোন তথ্য বের করার কাজে বা স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা হয়; নির্যাতিত ব্যক্তি তৃতীয় কোন ব্যক্তিকে কোন অপরাধ করে থাকলে বা করেছে বলে সন্দেহবশত শাস্তি প্রদান করা হলে; অথবা ভয় দেখানোর জন্য বা মানবিক আতংক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোন সরকারী কর্মকর্তার নির্দেশে, সম্মতিক্রমে বা অন্য কোন পন্থায় এ ধরনের যন্ত্রণা ও দুর্ভোগ সৃষ্টিকারী নির্যাতন যে কোন যুক্তিতে বা যে কোন ধরনের বৈষম্যের কারণে চাপিয়ে দেয়া হয়। অবশ্য, আইনগতভাবে কার্যকর কোন দন্ডজনিত যন্ত্রণা বা দুর্ভোগ-এর আওতায় পড়বে না। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন-সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-‘কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দন্ড দেয়া যাবে না, কিংবা কারো সাথে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না।’ কিন্তু তা সত্ত্বেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর অমানবিক অথবা মর্যাদাহানিকর আচরণ বা শাস্তির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশে নির্যাতনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। দন্ডবিধির ৩৩০ এবং ৩৩১ ধারায় বল প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধের স্বীকারোক্তি আদায়কালে কাউকে আঘাত বা গুরুতর আঘাত করার জন্য সর্বোচ্চ ৭ এবং ১০ বছরের সাজা এবং অর্থদন্ডের বিধান থাকলেও কার্যত এর কোন প্রয়োগ নেই বললেই চলে। নির্যাতনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে আইন করা হয়নি বিধায় হরহামেশাই আমরা নির্যাতনের ঘটনা শুনতে পাই এবং এর বিরুদ্ধে কোন কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে দেখি না। ফলে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। ২০১২ সালে সারাদেশে ৭২ জন বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং এদের মধ্যে নির্যাতনের কারণে ৭ জন মারা গেছে। তাদের মধ্যে পুলিশের হাতে ৫৮ জন, র‌্যাবের হাতে ৫ জন, র‌্যাব-পুলিশের হাতে ৫ জন, বিজিবি’র হাতে ২ জন এবং জেল কর্তৃপক্ষের হাতে ২ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। পুলিশ জনগণের সেবক, তারা কোন দলের প্রাইভেট বাহিনী নয়, এ কথা তাদের সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে। উল্লেখ্য, পুলিশ অফিসার না হয়ে যদি সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তা বা কনস্টেবল পর্যায়ের হয়ে থাকে তখন ঝধহপঃরড়হ -এর প্রয়োজন হয় না। পুলিশ বা পুলিশ অফিসার কর্তৃক যে কোন ফৌজদারী অপরাধ সংঘটিত হলে তার বিরুদ্ধে একজন সাধারণ নাগরিক মামলা করতে পারে। এ ব্যাপারে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ করলে তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থাস্বরূপ ট্রান্সফার, সাসপেন্ড, ডিমোশন (পদাবনতি), এ.সি.আর রিপোর্টে ব্ল্যাক মার্কিং প্রভৃতি শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। প্রত্যেক নাগরিকের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আত্মরক্ষার নামে কাউকে নির্যাতন ও আঘাত করা যায় না। পুলিশ দায়িত্ব পালনের নামে কোন নিরীহ নাগরিককে নির্যাতন করতে পারে না। বাংলাদেশের সংবিধানে তো বটেই নির্যাতন নিপীড়ন আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে নির্যাতনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে অপরাধীকে শাস্তিদান এবং ভিকটিমকে ক্ষতিপূরণ পর্যন্ত প্রদান করা প্রয়োজন। নির্যাতন বিরোধী আইন প্রণয়ন ও জাতিসংঘের কনভেনশন বা ক্যাট (ঈঅঞ) নামক নির্যাতন বিষয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক কনভেনশন বাংলাদেশ-এর ১৪ অনুচ্ছেদ এর ব্যাপারে আপত্তি দিয়ে ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর একে অনুসমর্থন করে ১৪ অনুচ্ছেদ নির্যাতিতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ উক্ত কনভেনশন-এর অনুসমর্থনকারী হিসেবে এখনও পর্যন্ত নির্যাতন বন্ধে আইনী বাধ্যবাধকতা অনুসরণে কোন সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়নি। এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকার জন্য জাতীয় সংসদ সদস্যদের নিকট উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি। ২৬ জুন আন্তর্জাতিক নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস দেশব্যাপী গুরুত্বের সাথে পালন করা জরুরী। কেননা নির্যাতন বন্ধে জনসচেতনতা একটি বড় শক্তি। মানবাধিকারকে সমুন্নত রাখতে সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, এনজিও, মানবাধিকারকর্মী এবং মিডিয়া কর্মীদের সমন্বয় থাকা দরকার। মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন তথা সকল প্রকার নির্যাতন বন্ধে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকেও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। আসুন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধে সবাই যার যার অবস্থান থেকে জোরালো ভূমিকা রাখি।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী।