মানসিক রোগ
ডা. মো. মিজানুর রহমান , শুক্রবার, মার্চ ০৮, ২০১৩



ভূমিকা : সুস্থ জাতি ও স্বনির্ভর দেশ গঠনের পূর্বশর্ত হল সুস্থ মানসিকতা ও সবার জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা। বিশ্বে বর্তমানে মানসিক রোগীর সংখ্যা ৪০ কোটি। উন্নত বিশ্বে প্রায় ৫০% মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা খুবই ভয়াবহ। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে মানসিক প্রতিবন্ধী ১ কোটি ২০ লাখ, মাদকাসক্ত ২০ লাখ। এইডস্ রোগীর সংখ্যা ৩০ হাজার অর্থাৎ বলা যেতে পারে ১ কোটি ৪০ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত।

বিভিন্ন সেমিনারে জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করার ঘোষণা দেওয়া হলেও দেশের এই বিরাট সংখ্যক মানসিক রোগীর কারণে কাক্সিক্ষত জাতীয় উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। কাজেই দেশের স্বার্থে জাতীয় রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, বিত্তবান, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক, চিকিৎসক, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধি, প্রিন্ট মিডিয়া ও জাতীয় সম্প্রচার কর্তৃপক্ষের উপর এ সমস্যা নিরসনে এবং গণসচেতনতার ক্ষেত্রে একটি বিরাট ভূমিকা আবশ্যক।

মানসিক রোগে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ : সারাবিশ্বে মানসিক ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে এবং এর উৎকর্ষ সাধনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জীবনযুদ্ধে নানা সংকটের মুখোমুখি হয়ে জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, জীবনাচরণ ও পরিবেশের উপর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উত্তেজনাসহ প্রতিহিংসা, নিপীড়ন, নির্যাতন, নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক অস্থিতিশীলতার কারণে দিন দিন মানসিক রোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে চলেছে।

এক্ষেত্রে মানসিক রোগীদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নয়, সমাজের সাথে সম্পৃক্ত করেই তাদের রোগ নিরাময়ে আন্তরিকতার সাথে সকলকে এগিয়ে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে অত্যাধুনিক গবেষণা চলছে। সাইকোড্রামা, সোসিওড্রামা, সোসিওমেট্রি, থিয়েটার থেরাপি, প্লে-বেক থিয়েটার, আর্ট থেরাপী, ড্যান্স থেরাপী ইত্যাদি কর্মকা- শুরু করেছে।

মানসিক রোগে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি : দেশে ১৭০ টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা সদর, ৪০৮ টি উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের কোন মানসিক হাসপাতালে মানসিক চিকিৎসক নেই, দেশের পাবনা জেলার হেমায়েতপুরে একটি মানসিক হাসপাতালসহ বিভাগীয় সদরে মানসিক চিকিৎসা দেয়া হয়। তথ্যমতে, মানসিক রোগী নিরাময়ের জন্য রোগী বিশেষজ্ঞ রয়েছেন ৫২ জন, বিজ্ঞানী রয়েছেন ২ জন ও নার্স ১০ জন, তবে ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সীমিত পর্যায়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইউনাইট থিয়েটার ফর সোস্যাল এ্যাকশন দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কার্যক্রম শুরু করেছে। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কার্যক্রম শুরু করেছে।

মানসিক রোগ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক মতামত : মানুষের শরীরে স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র বা অঁঃড়হড়সরপ হবৎাড়ঁং ংুংঃবস আছে।

১। সিম্পেথেটিক- রাসায়নিক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ ঘটায় যা হৃদযন্ত্র ফুসফুসসহ দেহের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে উদ্দীপনা তৈরি করে।

২। প্যারাসিম্পেথেটিক-উদ্দীপনার বিপরীত বা অবদমিত অথবা শ্লথ সৃষ্টি করে। এই দুটি পদ্ধতির মাঝে সার্বক্ষণিকভাবে লড়াই চলে।

মানসিক রোগীর প্রাথমিক পরিচায়ক লক্ষণ :

রোগীর ব্যবহারিক পরিবর্তন, তাতে যদি আশপাশের লোক কষ্ট পায় বা আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে কষ্ট পায় তবে বুঝতে হবে সে মানসিক রোগী। আচার আচারণের পরিবর্তনের ফলে যদি ব্যক্তির স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটে, কাজের ক্ষেত্রে অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়, আহার-নিদ্রার পরিবর্তন হয়, লোকজনের সঙ্গে মেলামেশায় ব্যাঘাত ঘটে সর্বোপরি সামাজিক ও পেশাগত ক্ষতিসাধনমূলক লক্ষণ প্রকাশ পায় তাহলে তাকে মানসিক রোগী বলে মনে করতে হবে। এছাড়া যদি কারো ঘন ঘন চিন্তার পরিবর্তন, আবেগের পরিবর্তন, স্মৃতিশক্তির পরিবর্তন, বিচার-বিবেচনার পরিবর্তন লক্ষ করা যায় তাহলে তাকে মানসিক রোগী বলে গণ্য করা যায়।

মানসিক রোগের শ্রেণীবিভাগ : ডিমেন্সিয়া প্রিকক্স (কল্পনাজগতে বাস), প্যারানইয়া (ভ্রান্ত ধারণা), ম্যানিয়াক, ডিপ্রেসিভ (বিষাদপূর্ণ জীবন), টেনশন, অবসেশন, হিস্টেরিয়া, স্ট্রেস, ডিপ্রেশন, মাইগ্রেন, সিজোফ্রেনিয়া, ডিসথাইমিয়া, ডিমেনশিয়া, মেনিয়া, মেলিনকোলিয়া, হাইপোমেনিয়া, আলজেইমারস, এপিলেপসি, এগোরাফোবিয়া, অটিজম, সাইকোড্রামা, শোনার হেলোসিনেশন ইত্যাদি।

মানসিক রোগের প্রকার : মানসিক রোগ সাধারণত সাত প্রকার : ১। উন্মাদ, ২। হিস্টিরিয়া, ৩। ব্যাধি কল্পনা, ৪। কম্পনযুক্ত প্রলাপ ৫। মস্তিস্কের অবসাদ, ৬। জলাতঙ্ক ও ৭। অনিদ্রা ও অস্থিরতা।

মানসিক রোগের সাধারণ কারণ: ১। মৃত্যুভীতি, ২। ঘুম সমস্যা, ৩। জনসমস্যা, ৪। ক্ষুধামন্দা, ৫। মাদকাসক্ত ৬। বমি, ৭। খিচুনি, ৮। চঞ্চলতা, ৯। উত্তেজনা, ১০। বিষণœতা, ১১। শোক, ১২। দুঃখ ১৩। মোহ, ১৪। তিক্ততা, ১৫। রাগ, ১৬। হিংসা, ১৭। লজ্জা, ১৮। উদ্বিগ্নতা ১৯। অপারগতা, ২০। অক্ষমতা, ২১। নিরাশা, ২২। হতাশা, ২৪। তাড়না, ২৫। শোক সংবাদ শ্রবণ, ২৬। ভয়ঙ্কর দৃশ্য অবলোকন ইত্যাদি।

মানসিক রোগ বিষয়ে হোমিওপ্যাথি দৃষ্টিভঙ্গি : অর্গাননের ২১০ থেকে ২৩০ সূত্রে মানসিক রোগ বিষয়ক বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। জেটিকেন্ট এমডি লিখিত “রেপার্টরি অব দি হোমিওপ্যাথিক মেটিরিয়া মেডিকা বইতে প্রায় সাড়ে পাঁচশত মানসিক রোগীর চিত্র আলোচিত হয়েছে।

স্যামুয়েল হ্যানিম্যান মানসিক রোগবিষয়ক মতামত : স্যামুয়েল হ্যানিম্যান মানসিক রোগের ৩টি স্তর উল্লেখ করেন-চেতন, অবচেতন, ও নির্জ্ঞান, তিনি বলেন, মন আর দেহ বিচ্ছিন্ন নয় একে অপরের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক রোগ সৃষ্টির মূলে রয়েছে বিশৃঙ্খলা। মন বিশৃঙ্খল না হলে দেহের কোন রোগ হতে পারে না। যে কোন ব্যধিতে প্রথমে মনকে আক্রমণ করে পরে দেহকে আক্রমণ করে। তিনি আরো বলেন, সোরা হতে মূলত মানসিক রোগের উৎপত্তি।

হ্যানিম্যানের মায়াজমের মনোলক্ষণ : ক) সোরা:- সোরার মানসিক লক্ষণ হল চঞ্চলতা ও ভয় সেই সাথে স্বার্থপরতা, ভ- দার্শনিকতা, নোংরামি, বকধার্মিকতা, মেজাজের পরিবর্তনশীলতা, নিম্নগামী মন, ঝগড়াটে, সবসময় যৌনবিষয়ক চিন্তা, অহংকারি, ইত্যাদি।

খ) সিফিলিস:- নৈরাশ্য, তিক্ততা, অজ্ঞতা, মূর্খতা, আত্মহত্যার ইচ্ছা, একগুয়েমী, উৎকণ্ঠা, বিমর্ষতা, নিষ্ঠুরতা, নেশা ইত্যাদি।

গ) সাইকোসিস:Ñ মিথ্যাবাদী, সন্দেহপূর্ণ মন, অপরের দোষ খুঁজে বেড়ানো, হিংসুটে মনোবৃত্তি, রাগী, স্বার্থপরতা, অধৈর্য, ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি, স্মৃতি শক্তির হ্রাস, অন্যমনস্কতা ইত্যাদি।

ঘ) টিউবারকোলোসিস:- নিত্য নতুন অভিরুচি, অসন্তুষ্ট মনোভাব, উদাসিনতা, উৎকণ্ঠা, অসহিষ্ণুতা, অত্যধিক চপলতা, উন্মত্ততা ইত্যাদি।

মানসিক রোগ নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ : হোমিওপ্যাথির ভা-ারে মানসিক রোগ নিরাময়ে অসংখ্য মহামূল্যবান ওষুধের রতœভা-ার বিদ্যমান। তন্মমধ্যে ৮৪টি ওষুধ বেশি কার্যকর।

উপসংহার : জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে মানসিক সুস্বাস্থ্য অর্জনে মানসিক রোগ নিরাময়কেন্দ্র ও দক্ষ মাইকো থেরাপিস্ট তৈরি করা দরকার। এক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিক মানসিক গবেষণাগার, মানসিক চিকিৎসক সৃষ্টি, প্রশিক্ষিত নার্স এবং হোমিওপ্যাথিক মানসিক বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা খুবই জরুরি। যাদের প্রচেষ্টায় অকর্মণ্য মানসিক রোগীদের নিরাময় করে কর্মক্ষম করা সম্ভব।