বাঁশি: ভালোবাসার প্রতীক
মহিউদ্দীন ইমন , শুক্রবার, মার্চ ০৮, ২০১৩


বাঁশি। দুই অক্ষরের এই ফুৎকার বাদ্যযন্ত্রটি একই সঙ্গে প্রেম ও প্রলয়, জীবন ও মৃত্যুর প্রতীক। যমুনার তীরে যেমন একজন মুরলি বাঁশিওয়ালা বসবাস করেন, যার বাঁশির শব্দে নর-নারীর হৃদয়ে প্রেম-বিরহের ঝড় উঠে, তেমনি অন্য একজন বাঁশিওয়ালা আছেন, যার বাঁশি বেজে উঠলে প্রলয় আতঙ্কে সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। তারপরও বাঁশি। বাঁশি বড় প্রিয়, বড় আদরের ধন। রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, চোর-সাধু এক কথায় সবার প্রিয় বাঁশি। সেই কবে কোন ইতিহাস অন্ধকার যুগে প্রথম বাঁশি বেজেছিল, তারপর মহাকালের পথ ধরে কত জানা-অজানা, শ্যাম-নীরুর হাত পেরিয়ে সে বাঁশি আজও বেজে চলছে প্রসাদে, জীর্ণ কুটিরে, রাজপথ, মেঠোপথে, সুরের জলসায়, মাঠে-ঘাটে, মানুষের জন্ম-মৃত্যু-বিবাহে, মেলা-পালা-পার্বণে। বাঁশি প্রসঙ্গে এলেই মনের পর্দায় ভেসে আসে তিনটি নাম। হ্যামিলনের বংশিবাদক, গ্রিসের অরফিউস এবং রাখাল রাজ শ্রীকৃষ্ণ। এদের বাঁশির সুর-মাধুর্য এত আকর্ষণীয় এবং চিত্তাকর্ষক যে, ঘরের চারদেয়ালে বন্দি মুগ্ধ শ্রোতাকে ঘরে আটকে রাখতে পারে না। হ্যামিলনের পুরো শহরে ইঁদুরের বাড়-বাড়ন্ত আর অত্যাচার এতই বেড়ে গিয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত এই মূষিকুলকে ঝাড়ে বংশে নির্মূল করার জন্য মেয়র পুরস্কার ঘোষণা করেন। বিচিত্র পোশাক পরিহিত বংশিবাদক তার বাঁশি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন শহরের মেয়রের কাছে। মেয়র পারিশ্রমিক দেয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করায় বংশিবাদক রাস্তায় এসে তার বাঁশিতে অপূর্ব মোহনীয় সুর বাঁজালো। যেখানে যত ইঁদুর ছিল, সব দলে দলে রাস্তায় নেমে এসেছিল এবং হ্যামেলিনের বংশিবাদক তাদের নদীতে ফেলে মেরে ছিল। হ্যামেলিনবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল; কিন্তু সেই নিঃশ্বাস বেশিদিন স্থায়ী হতে দেননি মেয়র। কারণ- উপযুক্ত পারিশ্রমিক সে বংশিবাদককে দিতে অস্বীকার করলো। ক্ষুব্ধ বংশিবাদক আবার বাঁশিতে সুর তুলল। তার বাঁশির সুর এতই পাগল করা ছিল যে, শেষ পর্যন্ত শহরের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা বংশিবাদকের পিছু পিছু ছুটতে লাগল এবং নদীর জলে ইঁদুরের মতো তাদের সলিল সমাধি হলো।
অরফিউস বংশিবাদক। তার বাঁশির সুরে প্রকৃতি স্তব্ধ হয়ে যেত, নদ-নদীর স্রোত থেকে যেত। সে অরফিউস বিয়ে করে এক সুন্দরী তরুণীকে। অসম্ভব ভালোবাসতো তাকে অরফিউস। একদিন তার স্ত্রী ইউরিডাউস সর্পাঘাতে মারা যায়। স্ত্রীবিহীন তার জীবন অসহ্য, অর্থহীন মনে হতে লাগলো। স্ত্রীকে পাবার জন্য সে যমরাজ প্লুটোর দরবারে হাজির হলো। সেই দিন অরফিউস যমরাজকে আনন্দ দিয়েছিল মনোমুগ্ধ বাঁশির সুর শুনিয়ে। বাঁশির সুরে মুগ্ধ দেবতা অরফিউসের স্ত্রীকে মর্তে ফিরিয়ে দেয়ার আবেদন মঞ্জুর করেন। প্লুটো বললেন, তোমার স্ত্রীকে তুমি ফিরে পাবে। কিন্তু শর্ত একটি, যমের দুয়ার পার না হওয়া পর্যন্ত তুমি পেছনে তাকাতে পারবে না। অরফিউস তার স্ত্রীর প্রতি এতই পাগল ছিল যে, যমের দুয়ার পার হওয়ার আগেই নিজেকে সামলাতে পারেনি। ভাবে পেছনে পেছনে আসতে তো ইউরিডাইস! মুহূর্তে ঘরে তাকালে শর্তভঙ্গের অপরাধে অদৃশ্য হয়ে যায় ইউরিডাইস। বুকভাঙ্গা আর্তনাদ নিয়ে ফিরে আসে অরফিউস। বেদনার এক অদৃশ্য বাঁশির সুর ঘিরে থাকে অরফিউসকে। শ্রী চৈতন্য ষোড়শ শতাব্দীতে যে ভাব বন্যার সৃষ্টি করেছিলেন তার অভিঘাত ঘটে চন্ডীদাসের লেখা ‘শ্রী কৃষ্ণ কীর্তন” গ্রন্থে। ওই গ্রন্থের ‘বংশি খণ্ড’টিতে চোখ রাখলেই মনে হয় শ্রীকৃষ্ণ ‘মহাভারত’ এর কালে বর্তমান ছিলেন। তিনিই বৃন্দাবনের রাখাল রাজা। ‘শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন’ এ বাঁশি সুরে আকুল হয় শরীর, বেকুল হয় মন, হরণ হয় প্রাণ। বাঁশির সুরে অঝোরে ঝরে রাখাল নয়নের জল। দাসী হয়ে বংশিবাদকের পায়ে নিজেকে সমর্পণ করতে চান তিনি। কৃষ্ণের মোহন বাঁশির সুরে বিমোহিত হয় জগত-সংসার, খণ্ডিত হয় সব আপদ-বিপদ। এ বাঁশির মায়াবতীর প্রতি ঈর্ষায় রাধা তা চুরি করলে কৃষ্ণ তা উদ্ধারে হয়ে উঠে পাগলপারা। ‘শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন’-এ লৌকিক জীবাত্মা প্রেমিকা রাধা এবং পরমাত্মা প্রেমিক শ্রীকৃষ্ণের রাগ-অনুরাগ, বিরহ-বিচ্ছেদের পালায় বাঁশিকে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির কথা ভাবলে মনে হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কথা। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির রবীন্দ্রনাথকে এতই অনুপ্রাণিত করেছিল যে, শেষ পর্যন্ত তিনি রচনা করেছিলেন বাঁশি, বাঁশিওয়ালা কবিতাসহ অসংখ্য বাঁশি সংক্রান্ত গান আর গদ্য রচনা। বাঁশি সংক্রান্ত যে ঐতিহ্য রবীন্দ্রনাথ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন, সে ঐতিহ্যকে তিনি তার নিজস্ব দর্শন, অনুভবের প্রতীকে পরিণত করেন। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি জীবনের অপূর্ণতাকে পূর্ণতার সমান্তরালে স্থাপন করে আমাকে। কবির উপলব্ধির মধ্য দিয়ে তার রচনা কবিতায়, গানে গদ্যে যে সত্য উদ্ভাবিত হয় তা আমাকে জীবন উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি লৌকিক এবং অলৌকিক অনুভবের আলো ছায়ায় সম্পৃক্ত করে আমাকে। তার রচনায় চোখ বুলালে দৃশ্যমান বাঁশির সুর শুনি, অনুক্ত উচ্চারণে সে সুর হৃদয় মাঝে জেগে ওঠে। তার বাঁশির সুর শুধু ব্যক্তিজীবনকে নয়, ভেঙে দেয় ব্যক্তিজীবনের গণ্ডিকে।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম অগ্নিবীণা কাব্যের উৎসর্গ পত্রে লিখেছিলেন- ‘সর্বনাশা বাঁশির’ কথা। তিনি লিখেছিলেন- ‘দুর্বাসা হে! রুদ্র তড়িৎ হানছিলে বৈশাখে/ হঠাৎ সে কার শুনলে বেণু কদম্বের ঐ শাকে/ বজ্রে তোর বাজল বাশী।’ নজরুলের কবিতা গানে উঠে এসেছে অরফিউসের বাঁশি, শ্যামের বাঁশি, কৃষ্ণের বাঁশি, সাঁওতালদের বাঁশি, বেদে-বেদেনিদের বাঁশির কথা। নজরুলের জীবনে বাঁশি কখনো এসেছে প্রেমের, কখনো মিলল, আবার কখনো সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে। তাই তো তিনি ব্যক্তিগত জীবনে বাঁশি বাজাতে ভালোবাসতেন। মোহন বাঁশি দিয়ে খেলা করতে গিয়ে তিনি স্বাদ গ্রহণ করেছেন ঝড়ের বাঁশি, সর্বনাশা বাঁশি, মধুর বাঁশির সাধ; কিন্তু বিষের বাঁশি তাকে আর বেঁচে থাকতে দেয়নি।
সৃষ্টির উৎস থেকে বাঁশি কান্নার কথা, তার বিরহের কথা বলে। বাঁশির সুর দিয়ে বেদনা এবং চেতনাকে একই ক্ষেত্রে গ্রন্থিত করা যায়। বাঁশির সুরের সঙ্গে বেদনার উপলব্ধি এবং চেতনার বহিঃপ্রকাশ দুয়ের কোনো তফাত নেই। বাঁশির সুর রূঢ় বাস্তবকে ভুলিয়ে দিতে পারে এবং এক স্বপ্নময়, ছায়াময়, মোহময় জগতে উত্তরণ ঘটাতে পারে। বাঁশির কান আছে, বুকের ভেতরের যে কথাটি অন্য কাউকে বলা যায় না তা বাঁশিকে বলা যায়, অর্থাৎ বাঁশির সুরে সেই না বলা কথা ফুটে ওঠে। এভাবে একটি ভাবনা থেকে আরেকটি ভাবনার সৃষ্টি হয়। মনে হয় বাঁশি নারীর প্রতিচ্ছবি হয়ে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আমাদের লোকজীবন এখন যন্ত্রদানবের চাকায় পিষ্ট, যমুনার ঘোলা বালিতে হারিয়েছে অঙ্গ-সৌরভ। প্রকৃতি আর ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রের অবিশ্বাস্য বিস্তারের ফলে বাঁশির সুমধুর ধ্বনি শোনার আর অবকাশ নেই। এ অবস্থায় কোনো বিরহী প্রেমিকের বাঁশির সুর নিঃসঙ্গ, যন্ত্রণাদগ্ধ কোনো প্রেমিকার মনের দুয়ারে না হোক কানের দুয়ারে প্রবেশ করবে না। তারপরও বলতে হয়, বাঁশির ভালোবসার প্রতীক, জীবনের আর্তি। পৃথিবীর সব জরাজীর্ণকে পেছনে ফেলে গাঁ গ্রামে, শহরে-বন্দরে, পথে-ঘাটে বেজে উঠুক বাঁশির সুমধুর সুর।