সাবাস নাজমা
রেহেনা বেগম রানু , শুক্রবার, মার্চ ০৮, ২০১৩


৫ই ফেব্রুয়ারি ২০১৩, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনাল-২ যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে ৭১ সালে তার কৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্যে বিচারপূর্বক দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিলে উক্ত রায় শুনে সমগ্র বাংলাদেশ স্তব্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের দাবি যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। অথচ বাংলার মানুষের প্রাণের এই দাবিটি উক্ত রায়ে প্রতিফলিত হয়নি। রায় ঘোষণা হওয়ার আগে এই প্রজন্মের বেশ কিছু তরুণ ব্লগারসহ ভেবেছিলেন কাদের মোল্লার ফাঁসির দণ্ডাদেশ হবে। তাঁরা সেই আনন্দে মিষ্টি বিতরণ করবে ঘরে ঘরে। কিন্তু তা আর হয়নি, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ ঘোষণার পর পরই এই প্রজন্মের তরুণ ব্লগারসহ অন্য তরুণরা প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ঢাকার শাহবাগ মোড়ে। সেই প্রতিবাদের ঝড় ছুঁয়ে যায় আবাল-বৃদ্ধ বণিতাসহ সকল দেশ প্রেমিক বাঙালির হৃদয়। ব্লগাররা সেই মিষ্টি বিতরণের আনন্দের পরিবর্তে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে দেয় শাহবাগ মোড় থেকে সারা বাংলাদেশে। সকল প্রজন্ম একাত্ম হয়ে ৫২, ৭১ এর ন্যায় একক বাঙালি জাতি সত্তায় একটি দাবিতে গর্জে উঠে “যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই” - “কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই”।
সুনির্দিষ্ট এই দাবিটি তারুণ্যের শক্তিকে সূর্যের আলোর ন্যায় উদ্ভাসিত করেছেন। রাতের অন্ধকার বলে কিছুই থাকে না রাত নাকি দিন বিষয়টি অতি গৌণ শাহবাগ মোড়ে জন্ম নেয়া প্রজন্ম চত্বরের কাছে।
প্রজন্ম চত্বরের তরুণ প্রজন্ম আজ সকল প্রজন্মকে জাগিয়েছে। সকল প্রজন্মের কণ্ঠে এক দাবি “যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই” যাদের বিবেক ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল তরুণ প্রজন্ম তাদের বিবেককে শান দিয়ে পুণরায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করেছে।
গত ১৫ই ফেব্রুয়ারির ২০১৩ইং বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার একটি শিরোনাম “যুদ্ধাপরাধী বাবার শাস্তি চাইলেন মেয়ে’ আমাকে দারুণভাবে আন্দোলিত করেছে- দায়বদ্ধতা অনুভব করেছি সৎ সাহসী নাজমাকে নিয়ে কিছু লিখার। শরীয়তপুরের এ্যাডভোকেট নাজমা সুলতানা শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চে এসে তাঁর যুদ্ধাপরাধী বাবা আনোয়ার হোসেন মাঝির বিচার চেয়েছেন, তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, “আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় ছোট ছিলাম, তখন আমার বাবা অনেক নারীকে ধর্ষণ করেছে, অনেক মানুষ খুন করেছে এখন আমি আমার বাবার বিচার চাই’ব।
নাজমা একজন যুদ্ধাপরাধীর সন্তান হয়েও পিতার অন্যায় অপরাধকে আশ্রয় প্রশ্রয় তো দেনইনি উপরন্তু গণজাগরণ মঞ্চের মত একটি ঐতিহাসিক প্লাটফর্ম এর প্রতিক্ষায় ছিল, যেখানে গিয়ে সন্তান-পিতার সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর যুদ্ধাপরাধী পিতার বিচার চেয়ে তিনি একজন প্রকৃত বিবেকবান মানুষের দায়িত্ব পালন করেছেন।
নাজমা একজন প্রকৃতই শিক্ষিত পরিপূর্ণ মানুষ। নাজমা নামের আলোর প্রদীপ সারা বাংলাদেশের অন্ধকারকে দূর করে আলো ছড়িয়ে দিয়েছে, সে আলো নিশ্চয়ই স্পর্শ করবে অন্য যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরেকেও। অন্য যুদ্ধাপরাধীর সন্তানরাও তাদের যুদ্ধাপরাধী পিতার বিচার চাইবে গণজাগরণ মঞ্চে এসে। যুদ্ধাপরাধী কারো জন্মদাতা হতে পারে- পিতা হতে পারে না, এই ধ্রুব সত্যকে নাজমা দেশবাসীর কাছে তুলে ধরে দেশ মাতৃকার যোগ্যসন্তান হিসাবে পবিত্র দায়িত্ব পালন করেছেন।
দেশের চরম সংকটময় মুহূর্তে আজ নাজমার মত দুঃসাহসী সন্তানের বড়ই প্রয়োজন। যারা যুদ্ধাপরাধী মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ১০ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়েছে, ৩০ লক্ষ শহীদের তাজা রক্তের বিনিময়ে ‘বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম ভূ-খণ্ডের সাথে যে লাল-সবুজ পতাকা পেয়েছি, সে পতাকা আজও শহীদের রক্তে ভেজা রয়েছে। প্রতিক্ষণ, প্রতিদিন সেই পতাকায় শহীদদের লাল বৃত্ত হৃদয় থেকে রক্ত ঝড়ছে তো ঝড়ছেই এতটুকু রক্ত যেন শুকায়নি স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও। শহীদের রক্ত আজও কথা বলে, “কবে যুদ্ধাপরাধী মুক্ত হবে দেশ, আমাদের আত্মা একটু শান্তি পাবে”। মুক্তিযোদ্ধাদের অপরিশোধ্য কঠিন ঋণ বহন করে চলেছি। এই ঋণের দায়বদ্ধতা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পেতে চায় এই প্রজন্মের সন্তানেরা। মুক্তিযোদ্ধাদের কিছুটা ঋণ শোধ করতে পারবে, এই তরুণ প্রজন্ম যে যুদ্ধাপরাধী মুক্ত যুদ্ধে নেমেছে সে যুদ্ধে জয়ী হয়ে। নাজমা রাজীব হায়দাররা তরুণ প্রজন্মের যুদ্ধাপরাধী মুক্ত যুদ্ধের অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় যেমনি করে সকল পদমর্যাদার কাছে অম্লান এক পরিচয় ঠিক তেমনিভাবে ‘নাজমা’ ব্লগার রাজীব হায়দাররা মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যায় অম্লান এক পরিচয়ের অধিকারী হবে।