সম্মুখ সমরের ডাক
অনুষ্টুপ , শুক্রবার, মার্চ ০১, ২০১৩



এরপর আর কিছু লেখা যায় কিনা জানি না। এই যে সময়টা কম্পিউটারের স্ক্রিনে বসে কাটাচ্ছি, এটা স্রেফ অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। জাতীয় পতাকা যখন পুড়িয়ে ফেলা হয়, শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক পায়ে দলে নৃত্য করা হয়, স্লোগান দেয়া হয় ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে- তখন এই তত্ত্ব কপচানো নিরর্থক। কেউ তার মায়ের শ্লীলতাহানি দেখে নিশ্চয়ই বইয়ের পাতা ওল্টায় না। আজ যারা আমার লেখাটা পড়ছেন, আমি আপনাদের সবিনয় ধিক্কার জানাই। এখন লেখাপড়ার সময় নয়। এখন মায়ের সম্ভ্রম রক্ষার সময়। এখন সময় সম্মুখ সমরের। দেশ তো মা-ই, না কি বলেন!
এমন সময় মহাকালের পরিক্রমায় খুব একটা আসে না। তখন পুরনো সব হিসাব নিকাশ চুকিয়ে নতুন করে শুরু করতে হয়। জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রবল আক্রোশে সব ভেঙেচুরে গড়ে নিতে হয় নতুন করে । আর যারা পারে না তাদের ইতিহাস হয় করুণার। তাদের ইতিহাস হয় পদানতের।

পৃথিবীর প্রায় সব বড়ো জাতির ইতিহাসে এমন সময় এসেছে একাধিকবার। আমাদেরও এলো দ্বিতীয়বারের মতো। এই সময় সাদা কালো পৃথক করে নিতে হয়। করে নিতে হয় চূড়ান্ত ফয়সালা। যারা জিতবে তারাই শেষমেশ টিকে থাকবে। আর পরাজিতের টেকার কোন অধিকার নেই। ১৯৭১ এ এই মীমাংসা আমরা করতে পারিনি। জয়ী এবং পরাজয়ীকে একই জয়মাল্য দিয়ে আমরা বরণ করার চেষ্টা করেছি। সংহতির নামে আমরা সাপ পুষেছি দুধ দিয়ে। এর ফলাফল হয়েছে চমৎকার (!)। যে লোকগুলোর এ দেশে থাকার অধিকার ছিল না, তারাই শেষমেশ পেল জাতীয় পতাকা। যারা হওয়ার কথা ছিল সমাজচ্যুত, তারা আজ গোষ্ঠীপতি। যাদের হাত থেকে রক্তের দাগ মুছে যায়নি, তারাই এখন শান্তির ধর্ম ইসলামের ‘সোল এজেন্ট’।
এবারও ‘যদি’ ‘তব’ ‘কিন্তু’ করে আমরা এই পশুদের ছেড়ে দেই তাহলে আর কোন কালেও বাঙালি জাতি হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। জয় বাংলা আর জিন্দাবাদের যুদ্ধ চলবে অনন্তকাল।

গত সপ্তাহে পুরোটাই আমি শাহবাগে ছিলাম। পড়ন্ত যৌবন। তাই আর আগের মতো স্লোগান দিতে পারি না। মৃদু স্বরে কণ্ঠ মিলাই। মনে হয় মহাকালের গর্জনে আমি সুর মিলাচ্ছি। ১৭ ফেব্রুয়ারি ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছিল। কাদা জলে প্যাঁচপ্যাঁচে শাহবাগ। গা কাটা দেয়া ঠাণ্ডা বাতাস। অল্প কজন তরুণ স্লোগান দিচ্ছে। টিভিতে যে জনারণ্য দেখা যায় তার কিছুই নেই। এক বৃদ্ধকে পেলাম। সুদূর সৌদি আরব থেকে ছুটে এসেছেন। বাড়ি ঝিনাইদহ। তিনি আন্দোলন করতে আসেননি, এসেছেন যুদ্ধ করতে। তিনি জানেন এই আন্দোলনের পরিণতি যুদ্ধ।
২২ ফেব্রুয়ারি বারবার সেই বৃদ্ধের কথা মনে পড়ছিল। ভদ্রলোক তো দারুণ বলেছেন। আমরা ভাবছি আমাদের অহিংস আন্দোলন দেখে ঘাতকরা ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাবে। গণজাগরণে তারা সন্ত্রস্ত হবে। কিন্তু তার উল্টাটাও তো হতে পারে। গত ৪২ বছর ধরে পুঞ্জিভূত শক্তি তারা এখন উগড়ে দেবে। যতই জনসমর্থনের কথা বলুন না কেন রাজনীতির কূটচালে অনেক সময় অনেক কিছুই হয়ে যায়। ১৯৩৬ এ স্পেনে যা হয়েছিল। বিপুল ভোটে নির্বাচিত বামপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে জেনারেল ফ্রাংকো যুদ্ধ ঘোষণা করেন। হিটলারের সমর্থন নিয়ে সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে চালায় নির্বিচার গণহত্যা। এর প্রতিবাদে সারা স্পেনবাসী জেগে উঠেছিল। ফ্রান্স ছেড়ে ছুটে এসেছিলেন পিকাসো। তার বিখ্যাত ছবি গুয়ার্নিকা ঠিক সেই সময় আঁকা। কিন্তু লাভ কি হলো ৩ বছর পর ঠিকই ফ্রাংকো ক্ষমতায় এলো। ৩৬ বছর স্পেন শাসন করে তারপর মৃত্যুবরণ করল। ইতিহাসের উজ্জ্বল স্পেন সব দিক থেকে পিছিয়ে গেলো এই ৩৬ বছরে। আজও স্পেন সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারিনি।
তাই গণজাগরণই সব কথা নয়। দরকার নেতৃত্ব। দরকার প্রস্তুতি। দরকার পরিকল্পনা।

এই আন্দোলনে এই তিন দরকার যে কত করুণভাবে ফুটে উঠেছে তার প্রমাণ আমরা প্রতি পদক্ষেপে দেখতে পাচ্ছি। যেদিনই শাহবাগে অবস্থান দিন-রাতের পরিবর্তে ৭ ঘণ্টা করার ঘোষণা এলো সেদিনই রাজিব হত্যা। যে রাতে বলা হলো, চলো আমরা আপাতত ঘরে ফিরে যাই, পরদিন সকাল হতে না হতেই সারাদেশে তাণ্ডব। কিন্তু ২২ ফেব্রুয়ারি ১২ দলের কর্মসূচির ঘোষণা আগেই ছিল। তাহলে কেন মাঠ ছেড়ে দেয়া হলো ২২ ফেব্রুয়ারি?
আমার কেন জানি মনে হয় আমরা এখনো এই আন্দোলনের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত নই। শুরুতে অনেকেই ভেবেছেন এভাবে স্লোগান আর গানে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হয়ে যাবে। এই ধারণাটা যে কতটা ছেলেমানুষি তা একটু একটু করে প্রমাণ হতে যাচ্ছে। রোববার মানিকগঞ্জে জনতা জামায়েতকে প্রতিরোধ করেছে। রাজশাহীতে তারা দাঁড়াতে পারিনি। আবার উল্টোটাও হয়েছে কিছু জায়গায়। এ কিসের আলামত। হ্যাঁ, গৃহযুদ্ধ বলুন আর সম্মুখ সমর বলুন সেটা খুব দূরে নয়। একেকটা অজুহাতে জামায়েত মাঠ গরমের চেষ্টা করবে। উস্কে দেবে সংঘর্ষ। তখন কি আমরা ঘরে চূড়ি পরে থাকব। উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানে মহসিন হলকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি প্রতিরোধ বাহিনী গঠন করা না হতো, তাহলে ৭১এর জন্ম হতো না।
তাই জাগরণ মঞ্চের পাশাপাশি আমাদের লড়াকু বাহিনী তৈরি করতে হবে। যেখানেই জামায়েত সেখানেই প্রতিরোধ। এর মধ্যে আর কোন কথা নেই।

এই উত্তাল সময়ে কিছু হাইব্রিড বুদ্ধিজীবীর জন্ম হয়েছে। এরা কোকিল বুদ্ধিজীবী। চোখ বন্ধ করে কাকের ঘরে ডিম পেড়ে যায়। ভাবে আমি যেহেতু দেখছি না, অন্যরা কি আর দেখবে! তাদের যুক্তি আর মানবতাবোধের অন্ত নেই। একজন তো লিখেই ফেলেছেন, আওয়ামী লীগ এসে ৭১ এর পরাজিত শক্তি হিসেবে জামায়েতের বিচার করছে, জামায়েত যদি অনুরূপ ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগের বিচার করে তখন কি হবে!
কী স্পর্ধা একবার লক্ষ করুন, ৭১ এর পরাজিত শক্তিকে কথার ধুম্রজালে ঠিকই ক্ষমতায় তারা বসিয়ে দিচ্ছে। চ্যালেঞ্জ করছে এদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব। পৃথিবীর অনেক দেশে এমন আইন আছে দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কথা বললে ফাঁসি। দুর্ভাগ্য এদেশে সে ধরনের আইন নেই। তাই মাকে বেশ্যা বললে মাথা নিচু করে শুনে যাওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না।
অনেকে বলছেন বিচারের কি দরকার, শাহবাগের দাবি মোতাবেক ফাঁসি দিয়ে দেয়া হোক। ট্রাইব্যুনাল বন্ধ হয়ে যাক। কি চমৎকার কৌশল বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়ার।
আরেকদল ধর্মাবতার কতগুলো পশুকে মানুষের সার্টিফিকেট দিয়ে তাদের ফাঁসি ঠেকানোর তালে আছে। এদের কুম্ভীরাশ্রু দেখে গা জ্বালা করে। হাজার হাজার মানুষ যারা হত্যা করে এখনো নির্বিকারে পান চিবোয়, তারা আবার মানুষ হয় কি করে? তাদের আবার মানবাধিকার কি?
সেদিন টিভিতে জাসদের এক নেতা চমৎকার বলেছিলেন। তিনি বলেন, আজ ধরুন মুক্তিযুদ্ধ চলছে। আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে হাতেনাতে ধরা পড়লাম। আমাকে বিচারে তোলা হলো। বিচারক বাঙালি ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক। তারপরও বিচারের রায়ে আমার ফাঁসি হতো।
এটাই হচ্ছে একটা যুদ্ধের বাস্তবতা। একজন সাধারণ খুনিকে যদি একজন যুদ্ধাপরাধীর সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা হয়, সেটা হবে হয় বোকামি নয়ত সচেতন চালাকি।

এখন এসব শৃগাল ও রাজনৈতিক বেশ্যাদের মুখের উপর একটা কথা বলার সময় এসেছে, প্লিজ যুক্তি দেখাবেন না, আমাদের যুক্তির নাম জনতা।
৬৯ এর আগরতলা মামলা মিথ্যা ছিল না। প্রায় প্রমাণ করে ফেলেছিল আদালত। তারপরও জনরায়ের মুখে ৩৪ আসামীকে বেকসুর খালাস দিতে হয়েছিল। আদালত অবমাননার সেটা ছিল চূড়ান্ত উদাহরণ। এমনকি বিচারপতির বাসায়ও আগুন দেয়া হয়েছিল। তাই জনতার বিচারের ওপর আর কোন বিচার নেই। যুক্তিও নেই।
এখন দেখবেন শাহবাগের এই আন্দোলনকে লঘু করে দেয়ার জন্য দুদিন পর পর একেকটা ইস্যু উঠবে। এর মধ্যে মহানবীকে অবমাননার অভিযোগ উঠেছে। তাও আবার ব্লগে। এটা প্রচার করেছে বিএনপির একটি পত্রিকা। এর আগে ব্লগ সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়া যাক। ব্লগ হচ্ছে এমন কিছু ওয়েব সাইট যেখানে স্বাধীনভাবে নিজের মত দেয়া যায়। যে কোন কেউ নিজের বা ছদ্মনামে কোন লেখা প্রকাশ করতে পারেন। এটা এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। কিন্তু এটাকেই একটা জাতীয় পত্রিকা খুব গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছে। আমার ধারণা মাঠ গরম করার জন্য কিছু কিছু মন্তব্য তাদের লোকজনই ব্লগে প্রকাশ করেছে ছদ্মনামে। একেবারে তুচ্ছ একটা বিষয়কে কিছু ধর্মান্ধ মানুষের কাছে বড়ো করে দেখানো হচ্ছে। এই সরলমতি মানুষগুলো পা ফেলছে জমাতি টোপে। আর তাদের এসব যাচাই বাছাই করারও ক্ষমতা নেই। এর হয়ত কোনদিন কম্পিউটার নামক যন্ত্রটিকে ছুঁইয়েও দেখেনি। ইন্টারনেট যন্ত্র না খাদ্য এই দ্বিধায় এখনও তারা নিমজ্জিত।

২৩ ফেব্রুয়ারি এটিএন বাংলার রাত ১০ টার খবরে প্রকাশ: ‘গতকাল কাঁটাবন মসজিদের সামনে জামাত-শিবির যে অরাজকতা চালিয়েছে, তার নেতৃত্ব দিয়েছে দুইজন পাকিস্তানি নাগরিক। বর্তমানে ডিবি পুলিশের অফিসে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে!’
আর কিছুদিন অপেক্ষা করলেই হয়ত দেখতে পাব আফগান মুজাহিদ, কাশ্মীরি জঙ্গি, চেচেন গেরিলারা এসে ভিড় জমিয়েছে ঢাকায়। এরা প্রশিক্ষিত, এরা হিংস্র। এই ভাড়াটে খুনিদের পোষার মতো প্রচুর অর্থ-সামর্থ্য আছে জামাতিদের। তখন আমরা কি করব? তাই এখনই সম্মুখ সমরের প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রতিটি হরতালে প্রতিরোধ চাই। আর পুলিশের বেস্টনিতে বসে স্লোগান আর গণসংগীত নয়। এখন নিজের হাতেই তুলে নিতে হবে নিজের নির্ভরতার ভার।