ভূগোলের গোল
ডা. কিউ.এম. অহিদুল আলম , শুক্রবার, মার্চ ০১, ২০১৩


অবকাঠামো ও উন্নয়ন
পৃথিবীর অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে নগর, জনপদ সভ্যতা যদি সময়ের সাথে অগ্রসর না হয় তাহলে পিছিয়ে যায়, ধ্বংস হয় নগর, জনপদ, সভ্যতা, সমাজ পরিবর্তনের ডাইনামিজমে আজ এথেন্স, রোম অথবা বাগদাদ আজ মৃত এবং বিস্মৃতির পথে। আমাদের এই উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে দিল্লী, মুম্বাই বা চেন্নাইকে ছাড়িয়ে বিশ্ব বাণিজ্যে এবং প্রযুক্তিতে সামনে চলে আসে ব্যাঙ্গালোর। সারা বিশ্বের বিনোয়োগকারীরা ব্যাঙ্গালোরকে বেছে নেয়। প্রচণ্ড বিনিয়োগ আসে। কিন্তু বিদেশিরা মাত্র দশ বছর না যেতেই ব্যাংগালোর ছেড়ে চলে যায়। কারণ কি? ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগকারীদেরকে যথাযথ অবকাঠামোগত সার্ভিস নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রথমত বিদ্যুৎ, দ্বিতীয়ত আনুষাঙ্গিক সেবাদি পেতে উপমহাদেশীয় কায়দায় ‘স্পীড মানি’ বা ঘুষ, তৃতীয়ত যোগাযোগ। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ব্যাঙ্গালোর শহরে মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার বানানো হয়। কিন্তু ততদিন বিদেশিরা অপেক্ষা করেনি। সবাই চলে গেছে ভারতের ভিতর অন্যান্য জায়গায় অথবা ভারতের বাইরে, এমনকি ভারত থেকে শিল্প সরায়ে মাদাগাস্করে চলে গেছে। ব্যাঙ্গালোরের যানজটে কর্মস্থলে যেতে ৩-৪ ঘন্টা লেগে যেত। কোন বিনিয়োগকারী এমন অবকাঠামোতে অবস্থান করবে না।
শিক্ষা এবং অবকাঠামোতে বিনিয়োগ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের অবকাঠামোর অবস্থা কি? ঢাকা, চট্টগ্রামে যেখানে মূলতঃ বিনিয়োগকারীরা আছে-সেখানে গাড়িতে ট্রাফিক জ্যামে বসে থাকতে হয় দৈনিক ৪ থেকে ৮ ঘন্টা।
এই পরিবেশে দেশের মানুষ যারা পারে তারা তো দেশ ছাড়বেই বিদেশিরাও ব্যাঙ্গালোরের মত এদেশ ছেড়ে যেতে দেরি হবে না। তারা এখন কেবল সস্তা শ্রমের প্রলোভনে এখানে পড়ে আছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, ঘুষ-ইত্যাদি বিষয়ে যেহেতু সবাই অবহিত সে ব্যাপারে না গিয়ে আমি কেবল যোগাযোগের মধ্যেই অবকাঠামোগত আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব।
ঢাকা-চট্টগ্রামে যত বড় রাস্তা আছে পৃথিবীর বহু বড় শহরে অত বড় রাস্তা নেই। ইউরোপের অনেক শহরে শহরের কেন্দ্র ৩-৪ শ বছরেও কোন পরিবর্তন হয়নি। তবে ওখানে ট্রাফিক আইন কড়াকড়ি। ইউরোপের বিশেষ করে লন্ডন এবং রোমে বিশেষ বিশেষ রাস্তায় গাড়ি নিয়ে চলাচল করলে ‘যানজট চার্জ’ বা কনজেশান চার্জ দিতে হয়। ফলে অনেকে ঐ সব রাস্তায় যায় না। যানজট পরিহার করা সম্ভব হয়। ছোট্ট আয়তনে নগর রাষ্ট্র সিংগাপুরে নতুন গাড়ি রাস্তায় নামানোর উপর বিধি নিষেধ রাখা হয়েছে। ফলে নতুন গাড়ি এসে রাস্তায় জট হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আমাদের বড় দুটো নগরী ঢাকা ও চট্টগ্রামে যানজটের অন্যতম কারণ স্কুলগামী প্রাইভেট কার। সকালে উল্টা-সিধা-ডানে-বামে সামনে পশ্চাতে যেভাবে গাড়ি হর্ন বাজায়ে নেহায়েৎ পাগলের মুল্লুক ছাড়া অন্য কোন দেশে এ কারবার দেখেছেন কিনা গাড়ির মালিকদের কাছে সবিনয়ে এই প্রশ্ন। দুই চারশ স্কুলগামী ছাত্র ছাত্রী বহনকারী এই প্রাইভেট কারগুলো বিশ হাজার সাধারণ নাগরিকের চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়। এটা কি সুবিবেচনা প্রসূত পদ্ধতি। এত বিশাল সংখ্যক মানুষের নাগরিক অধিকার বঞ্চিত করে কিছু বিত্তশালী লোকের মনের খায়েস মিটানো-এটা কোন ট্রাফিক আইন!
রাস্তায় নির্বিঘ্নে ও দ্রুত চলাচল করতে হলে স্কুলগামী কার বন্ধ করে বাধ্যতামূলক স্কুল-বাস চালু করতে হবে। ৫০ জন কারের যাত্রী এক বাসে ধারণ হবে। সকালে বাচ্চারা সহপাঠির সাথে গল্প গুজব করলে শিশু মনও সতেজ হবে। গাড়ি করে স্কুলে যেতে হবে এই মানসিক প্রেষ্টিজ ষ্ট্যাটাস সময়ের প্রেক্ষিতে এবং প্রয়োজনে পরিহার করতে হবে। অফিসকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে গাড়ি চালাতে হলে কন্‌জেশান চার্জ চালু করতে হবে। রাস্তায় বেশি সংখ্যক বাস চালু করতে হবে। ঢাকার আশে পাশেও চট্টগ্রামের আশে পাশে যেখানে রেল যোগাযোগ আছে সেখানে ১৫ মিনিট পর পর সার্কুলার ট্রেন চালু করতে হবে।
শুধু ট্রাফিক জামের কারণে ভারত, নাইজেরিয়া ও মেক্সিকো সিটি থেকে বিনিয়োগকারীরা অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় অনেক ব্যবসায়ীর কাছে পদ্মা সেতু থেকে ও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ, চার লাইন, ফ্লাইওভার ইত্যাদির নামে গত চল্লিশ বছরে অবকাঠামো গত উন্নয়নের প্রচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কার্যকরি কিছু হয়নি। অর্থাৎ সরকার আসলে সময়ের চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। মোবাইল, গণমাধ্যম, টেলিভিশন এই কয়েকটি শিল্পের বেসরকারীকরণ করার ফলে দেশে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন হয়েছে তা আমাদেরকে চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যোগাযোগ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সেক্টরে, বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা।
২০০১ সালে চীন সিদ্ধান্ত নেয় যে প্রতিদিন ৩০ কি. মি. নতুন রাস্তা বানাবে ২০০৬ সালে ভারত সিদ্ধান্ত নেয় যে প্রতিদিন ১০ কি.মি. রাস্তা বানাবে। অবকাঠামো সঠিকভাবে না থাকলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীও কোন কাজে আসবে না। যারা দেশ নিয়ে চিন্তা করে ওদের জন্য কিং মার্টিন লুথার এর একটি অবিস্মরণীয় উক্তি স্মরণ করছি-উড়ার আশা থাকতে হবে, তা যদি না পার তবে দৌড়াও, তা যদি না পার তবে হাট, তাও যদি না পার তবে হামাগুড়ি দাও, যাই কর সামনে এগুতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে খোলাচোখে সবার ভাবতে হবে আমাদের অগ্রগতি আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক তুলনায় কোন্‌ স্তরে আছে। আগামী দিনের নেতৃত্বকে গুরুত্বসহকারে বিষয়টি বিবেচনা করে সামনের দিকে এগুনোর কর্মসূচি থাকতে হবে-কথায় নয় কাজেও।