কাল আজ কাল
কামরুল হাসান বাদল , শুক্রবার, মার্চ ০১, ২০১৩


একাত্তর ফিরেছে, তবে দুভাবেই
‘জয় বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা যমুনা’, ‘তুমি কে আমি কে বাঙালি বাঙালি’, গগনবিদারী এই স্লোগানে স্লোগানে শাহবাগ থেকে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব হয়ে একাত্তর ফিরে এসেছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই ব-দ্বীপ অববাহিকায় আমাদের পারিজাত প্রিয় বাংলাদেশে। বাঙালির রক্তে লেগেছে দোলা, চেতনায় হেনেছে টান। ঘরকুনো বাঙালিকে বড়শি গাঁথা মাছের মতো টেনে এনেছে শাহবাগে, গণজাগরণ মঞ্চে। তাদের বুকে একাত্তরের সাহস, স্বপ্ন আর উদ্দীপনা। চোখে তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ, অসাম্প্রাদায়িক বাংলাদেশ, একটি সত্যিকার আধুনিক বাংলাদেশ।
অনেকেই মনে করেছেন শাহবাগের এই গণজাগরণের নেপথ্যের কারিগর তথা ব্লগার তথা তরুণ প্রজন্ম হঠাৎই বুঝি এমন আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আসলে তা নয়। তরুণদের এই সাইবার যুদ্ধ পক্ষান্তরে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ বা আচমকা নয়। এই যুদ্ধ প্রস্তুতিহীনও নয়। গত প্রায় পাঁচ বছর থেকে আমাদের দেশের একদল দেশপ্রেমিক তরুণ ইন্টারনেটে তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে এই মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এই তরুণরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে অত্যন্ত মেধাবী, সৎ এবং তারা কঠিন ভাবে দেশপ্রেমিক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন দেশ তথা পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের ব্লগারদের অপপ্রচারের জবাব দিতে এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে তারা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সন্ধান করেছেন অধ্যয়ন করেছেন, নিজেদের ঋদ্ধ করেছে এবং অপপ্রচারের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন।
এঁরা কোনদিন রাজনীতি করবে বলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শেখেনি। শিখেছেন নিজ গরজে, দেশকে ভালবাসেন বলে। এরা কোনদিন ভাবেনি, এই জাতির ইতিহাসে, এই শতাব্দির ইতিহাসে বিশ্বের রাজনীতির ইতিহাসে তারা কোন দিন নায়কের আসনে বসবে। ৫ ফেব্রুয়ারি বিকেলে যখন মাত্র দু’টি ব্যানার নিয়ে ১৫/২০ জন তরুণ প্রতিবাদ জানাতে দাঁড়িয়েছিল শাহবাগের মোড়ে তখন কি তারা জানতো তারা এক গণসমুদ্রের উৎসধারা। এর আগে তারা এই যুদ্ধ চালিয়ে এসেছে ব্লগে, ফেসবুকে। কারণ বাংলাদেশ নিয়ে, এর জন্ম ইতিহাস নিয়ে তথ্য ও ইতিহাস বিকৃতি কখনো থেমে থাকেনি। পাকিস্তানি ব্লগারদের সাথে বরাবর যুক্ত থেকেছে এদেশেরই কিছু সন্তান যাদের পূর্বসূরিরা একাত্তরে এ জাতির জন্মক্ষণে বিরোধীতা করেছিল। যারা এখনো বাংলাদেশকে মেনে নেয়নি। যারা এখনো এই গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, আপত্তিজনক প্রচার চালাচ্ছে। এবং যাদের আক্রোসের বলি হয়েছে এই মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা স্থপতি, ব্লগার রাজিব হায়দার শোভন।
বাংলাদেশ যেখানে থাকার কথা যদি সেখানে থাকতো। বাংলাদেশের রাজনীতি যেভাবে চলার কথা যদি সেভাবে চলতো; বাংলাদেশের রাজনীতিকরা যদি সঠিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হতো তা হলে তরুণদের এই উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন পড়তো না। চেষ্টা করলেও তা সফল হতো না। তরুণদের এই উদ্যোগ নারী-পুরুষ, ধনী-গরীব, শিশু-কিশোর সাধারণ অসাধারণ সবার অংশ গ্রহণ প্রমাণ করে বাংলাদেশ এমন একটি আহবানের এমন একটি উদ্যোগের অপেক্ষায় ছিল। এই গণজাগরণের সাফল্য যদি তরুণদের হয় তবে ব্যর্থতা রাজনীতিবিদদের। কারণ তারা জনগণের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল। এরচেয়ে কম লোকসংখ্যার জনসভা সফল করতে প্রধান প্রধান দলগুলোকে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়। অথচ এখানে বিরতিহীন অর্ধ মাসে ভালবাসার টানেই এসেছে মানুষ সারা বাংলা থেকে নিজেদের উদ্যোগে। নিজেদের খরচে। খাবার সরবরাহ করছে স্বউদ্যোগে। চাঁদাহীন অর্থে।
অর্থ নয়, সম্পদ নয়, ক্ষমতার ভাগাভাগি নয়। পদ নয় পদবি নয়, হলের রুম নয়, টেন্ডারের ভাগ নয়, কাজের বখশিস নয়, উন্নয়নের চাঁদা নয়, এবঙ নতুন কোন দাবি দাওয়া বা মতবাদ নয়। তারা এসেছে স্রেফ মাটির টানে, প্রাণের টানে, দেশের টানে, ইতিহাসের টানে, মানবতা ও সত্যের টানে। একাত্তরের চেতনায় দেশকে জাগ্রত করার টানে। তারা সফল, তারা ফিরিয়ে এনেছে একাত্তর। তারা ফিরিয়ে এনেছে একাত্তরের বা বাঙালির দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের উজ্জীবনী স্লোগান জয় বাংলাকে। ফিরিয়ে এনেছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনাকে। তারা মনে করিয়ে দিয়েছে ‘আমি বাঙালি’।
গত পাঁচ তারিখ থেকে এ পর্যন্ত কোথায় কী কী ঘটেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ সমগ্র জাতির দৃষ্টি এখন শাহবাগ থেকে সমগ্র বাংলার গণজাগরণ মঞ্চের দিকে। কারণ একাত্তর জেগেছে। সত্যি একাত্তর জেগেছে আমাদের বুকে, হৃদয়ে আর শত্রুদের মস্তিষ্কের কুটিল রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
মৃত্যুর পরে যে সৎকার তা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে একটু অনন্য আধুনিক। যেমন নামাজে জানাজার আগে দায়িত্বশীল একজন এসে মৃতের পক্ষে উপস্থিত সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ইসলাম ধর্মমতে কর্জ পরিশোধ না করে কেউ মৃত্যুবরণ করলে এবং ঐ ঋণদাতা যদি ক্ষমা না করেন তাহলে ঋণগ্রহীতা বা কর্জদার কখনো জান্নাত বা বেহেস্তে যেতে পারেন না। তাই জানাজার আগে মৃতের পক্ষ থেকে তার পরিবারের দায়িত্বশীল কেউ তার কর্জ পরিশোধের দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। এ সময় মৌলানা বা পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয় ক্ষমা করেছেন কিনা- মুসুল্লিরা বলেন, জি হ্যাঁ করেছি। জানাজার পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলা হয়, ইমাম বলেন, লোকটি কেমন ছিলেন, মুসল্লিরা বলেন বড় ভাল ছিলেন। এই হচ্ছে ইসলামের রীতি। ক্ষমা ও মানবতার এক অপরূপ নিদর্শন।
শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা তরুণ ব্লগার স্থাপতি রাজীব হায়দার শোভনকে হত্যা করা হয় কয়েকদিন আগে। তাঁর পরিবার ও তাঁর বন্ধু-স্বজনদের মতে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য জামায়াত-শিবিরই দায়ী। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে। অথচ এরই মধ্যে জামাত শিবির সমর্থিত বিভিন্ন ব্লগে, টেলিভিশন ও পত্রিকায় রাজীবের চরিত্র হননে নগ্ন ভাবে মাঠে নেমেছে একদল কাপুরুষ যারা নিজেদের ইসলামী বা ইসলামের রক্ষক বলে দাবি করছেন। এরা রাজীবসহ তার সতীর্থদের ধর্ম বিরোধী, ইসলাম ও নবীজীর (দ.) বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্যকারী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টার ফাঁকে ফাঁকে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে নাস্তিকদের সমাবেশ ও আয়োজন বলে জনগণের মধ্যে ভুল ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছে। একজন মৃত মানুষের চরিত্র হনন করে এরা মূলত ইসলামের উদার, সার্বজনীন ও ক্ষমার আদর্শকে অপমান করছে। অথচ এরা মুখে বলে তারা ইসলামের সৈনিক।
আমি বলতে চেয়েছি একাত্তর জেগেছে তবে দু’পক্ষেই জেগেছে। বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ গৌরব আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। রাজাকার বা একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়। এ কাজ শুধু আওয়ামী লীগ বা সরকারের নয়। এ কাজ সমগ্র বাঙালি জাতির। আমাদের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিণতি আসতে পারে পরাজিত শক্তিকে নির্মূল করার মাধ্যমে। দ্রুততম সময়ে বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তি বিধানের মাধ্যমে। একাত্তরে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছিল তখন গোলাম আজম, নিজামী, ফজলুল কাদের, সালাউদ্দিন কাদের, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, আলীম, সাঈদী, বাচ্চু রাজাকার, শাহ আজিজদের মতো অনেকেই সেদিন আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ইসলাম বিরোধী, ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং এর নেতাদের নাস্তিক মুরতাদ আখ্যা দিয়েছিল। শুধু তাই নয় মুক্তিযুদ্ধ ঠেকাতে যা যা করার প্রয়োজন সেদিন তারা তা তা করেছিল। সে সব কারণে আজ তাদের বিচারের সম্মুখিন হতে হয়েছে। বিচার চলছে। এদের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার কাহিনী পাঠকদের জানা হয়ে গেছে এতদিনে।
আজ ৪২ বছর পরে একাত্তরের সে সব খুনি, ধর্ষক, লুণ্ঠনকারী ও অগ্নিসংযোগকারীদের বিচার চলছে। এই বিচার প্রক্রিয়ায় বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছে। জামাত নেতা কাদের মোল্লার দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন। এই রায়ে খুশী নয় তরুণ প্রজন্ম, সারা বাংলার জনগণ। এই বিচার প্রক্রিয়ায় সরকারের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন জেগেছে তরুণদের মনে। তাই তারা বিক্ষোভ করছে। দাবি জানাচ্ছে একাত্তরের ধর্ষক ও খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার। এই আন্দোলনের ফলে সরকারের ভেতর যে সংশয়, দোদুল্যমানতা কাজ করছিল তা দূরিভূত হয়েছে। তারা আরো সতর্ক হয়েছে বিচার প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিতে। সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের যে ক্ষোভ ছিল তাদের দাবি অতিসত্ত্বর মেনে নেওয়ার মাধ্যমে সরকার তরুণদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু মূল যে শক্তির বিরুদ্ধে এই আন্দোলন সেই একাত্তরের পরাজিত শক্তি একাত্তরের শকুনের মতো খামছে ধরেছে সকল ধরনের মানবতা, চক্ষুলজ্জা ভদ্রতা ও সভ্যতার চাদরকে। একাত্তরের তাদের পূর্বসূরিদের মতো এবারও তারা এই আন্দোলনকে নাস্তিকদের আন্দোলন, ইসলাম ও নবীজীর বিরুদ্ধে আন্দোলন বলে-ধর্মভীরু মানুষদের বোকা বানানোর চেষ্টা করছে। একাত্তরে জামাত, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামসহ তাদের মতাদর্শের দল ও ব্যক্তিরা মহান মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে কটাক্ষ করেছিল এর বিরুদ্ধে নগ্নভাবে যে ষড়যন্ত্র করেছিল ঠিক ৪২ বছর পরে শাহবাগ ও গণজাগরণ মঞ্চের নবীন মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধেও এমন কুৎসা রটাচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের কিছু সংবাদ মাধ্যম। এরা সাংবাদিক, ভাবতেও গা গুলিয়ে ওঠে। এই অপশক্তির দীর্ঘকালের মিত্র দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দলের এক প্রকার মুখপত্র হিসেবে পরিচিত পত্রিকাটির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতেও রুচি হয় না।
একাত্তরে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল দেশে, সে যুদ্ধ আজও বহমান। ফ্রন্ট, সেক্টর, চরিত্র, নেতৃত্ব ও সময় বদলেছে বিস্তর কিন্তু শত্রু বদলায়নি। বরং এর মাত্রা বেড়েছে বহুগুণে বহুরূপে। মনে রাখতে হবে একজন রাজাকার আজীবন রাজাকার কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা আজীবন মুক্তিযোদ্ধা নন। যেমন একজন নামকরা টাইগার এখন বিড়ালে পরিণত হয়ে ইঁদুরের খোঁজে নালা-নর্দমায় ছুটছেন।
তবে আশার কথা হচ্ছে, পৃথিবীর ইতিহাস বলে, সভ্যতার ইতিহাস বলে, ‘সত্যের জয়ই সুনিশ্চিত’। আঁধার ফুঁরে আলো আসবে ঠিকই। আমরা তো একাত্তরেও জয়লাভ করেছিলাম। এবারও জয় আমাদের সুনিশ্চিত। নিষ্পাপ তরুণের রক্ত এ বাংলায় কখনো বৃথা যায়নি। না বায়ান্নতে, না বাষট্টিতে, না ঊনসত্তরে, না একাত্তরে।
দুঃসময়ে বন্ধুর পরিচয়। বাংলা মায়ের আজ এক প্রকার দুঃসময়। শুধু তার সন্তান হিসেবে দুঃসময়ের বন্ধুদের চিনে রাখতে হবে। আর চিহ্নিত করতে হবে ঘাতকদের দোসর, বন্ধু রাজনৈতিক মিত্র আর মধ্যরাতে নিরপেক্ষ সেজে যারা এতদিন হেদায়েত করেছিলেন আমাদের/ তাদের চেহেরাকে।